ট্রেকিং এর মজার এক টুকরো : শীলা পাল।

0
1301

জীবনের অনেকটা সময় অনেক গুলো বছর শুধু পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরে বেড়িয়েছি ।সবার ধারনা হয়েছিল এরা এরকম উড়ো খাই গোবিন্দায় নম করে জীবন টা কাটিয়ে দেবে।একটা ট্রেকিং শেষ করে আসার পথেই নেক্সট ট্রেকিং কবে কখন ভাবনা চিন্তা শুরু হয়ে যেতো।পাহাড়ী রোদ আর তীব্র হাওয়া আমাদের চেহারার জিওগ্রাফিই পাল্টে দিতো।ঘষামাজা করে একটু মানুষের মতো হতে হতেই আবার যাওয়ার সময় এসে যেতো।আমাদের পুরুষ সঙ্গী রা ওসবের তোয়াক্কা করতো না।কিন্তু আমরা দলে দু জন মেয়ে একটু মনখারাপ হতো।যতোই হোক রূপের জন্য একটু দুঃখ হতো।চামড়ার ভাঁজ গায়ের পোড়া রঙ সভ্য সমাজে যেতে একটু কুন্ঠা যে হতো না তা বললে মিথ্যে বলা হবে।কিন্তু যেই বাঁশি বাজতো আমরা সব ভুলে ট্রেকিং এর মোহে গা ভাসিয়ে দিতাম। আজ একটা ছোট্ট ঘটনা খুব মনে পড়ছে।আমরা ত্রিলোকনাথ দর্শন করে ফিরছি।লাহুল স্পিতি নাম শুনেছি।অনেক কাল আগে চল্লিশ বছর আগে তো হবেই ।তখন রাস্তা ভালো ছিল না। সড়ক পথ না ধরে টিউনী থেকে মোড়ি নদীর ধারে দিয়ে আসা ঠিক হলো।অপূর্ব সেই হাঁটাপথ।নদীর তীরের দৃশ্যাবলি বর্ণনা করার ভাষা আমার নেই।স্বর্গ দেখিনি নাহলে বলতে পারতাম কে বেশী সুন্দর । আমরা নাইটোয়ারে রাত্রিবাস করবো।প্রায় কুড়ি কিলোমিটার পথ হেঁটে আর পা যেন চলছে না।হাঁটাপথে এই মজা।প্রথম রাউন্ড খুব প্রকৃতির দৃশ্য দেখতে দেখতে কিচ্ছু খেয়াল থাকে না।যতো গন্তব্য স্থল কাছে আসে আর পা চলে না চলতে চায় না।আমার পা এতো বিট্রে করছে কেন কিছুতেই বুঝতে পারছি না। যাক্ ধুঁকতে ধুঁকতে এসে পৌঁছান গেলো।রাতে থাকার জন্য একটি PWD.র গোডাউন পাওয়া গেল।কোথায় ভাবলাম একটা রেস্ট হাউজ পাওয়া যাবে ।একটু আরাম করে শোয়া যাবে।খাওয়ার থেকে শোয়াটাই ফার্স্ট প্রেফারেন্স ছিল। লোহালক্কড়ের ডাঁই করা একপাশে একটি কাঠের চৌকী।তাও লেডিস বলে।আর বাকিরা মাটিতে ছুঁচো ইঁদুরের সঙ্গে ।যাক মাথায় টিনের ছাউনি আছে।
আমরা সবসময় ছয় জন। স্বপ্না আমি
গোবিন্দ আর আমার স্বামী মলয় আর অশোক দা আমাদের লিডার প্লাস গার্জেন ।
এবারের ডিউটি খাবার অনুসন্ধান ।একটু দূরে কুলিদের খাওয়া দাওয়ার জন্য একটি হোটেলের সন্ধান দিল আমাদের গাইড ।রুটি সবজি পাওয়া যাবে ।তখন তো সবার পেটেই ছুঁচো ডন মারছে।ছেলেরা আগে চলে গেল। আমরা দুজনে একটু রিল্যাক্স করে যাবো।আমার পাটা আগে দেখতে হবে এতো যন্ত্রণার কারণ কি।জুতো খুলে দেখি দুই বুড়ো আঙুলের পাশে ছোট্ট রবারের বলের মতো দুটি ফোস্ক।নদীর জলে বালিতে মাখামাখি হয়ে কী যে অবস্থা।জানি না নেক্সট ট্রেকিং হর কি দুন কি হবে।আমাদের একজন সঙ্গী ডাক্তার প্লাস কম্পাউন্ডার প্লাস নার্স এট সেটরা এট সেটরা।জানি তার শুশ্রূষা আমাকে ঠিক চাঙ্গা করে দেবে।
এদিকে এরা যে খেতে গেছে কেউ ফিরছে না।কতো খাচ্ছে রে বাবা। অনেক ক্ষণ পরে একজন আমাদের পোর্টার এসে ডাকলো বহিনজী চলিয়ে খানা তৈয়ার হো গিয়া।বাঁচালে বাপ্।আমরা দুজনে তার মধ্যে আমি খোঁড়াতে খোঁড়াতে সেই হোটেলে এসে পৌঁছালাম। এসে দেখি আমাদের বাবূরা খোস গল্পে মশগুল । আমাদের দুটো টিনের ডাব্বার ওপর চট বিছিয়ে কুর্শি বানিয়ে বসার জায়গা করে দিয়েছে ।খুব যত্ন করে স্টিলের থালায় গরম রুটি আর ভাজি।খিদের মুখে অমৃত মনে হলো।
কিন্তু আমাদের সাহেবদের কোনও ভ্রূক্ষেপ নেই।খুব রাগ হয়ে গেল ।দেখি হোটেলের কালো পাহাড়ী মালিকের অপূর্ব সুন্দরী নেপালি বউ।কেমন ভাবে ভেগে এসেছে দেশ থেকে সেই গল্প মনোযোগ সহকারে শুনছেন। সত্যিই তার রূপ চোখে পড়ার মতোই।এই রকম একটা জায়গায় হোটেল তাও খদ্দের রাস্তা তৈরির কুলিরা । একটা ঝুপড়ি সেটাই সংসার আবার হোটেলও। এতোক্ষণে আমাদের সাহেবদের হুঁশ ফিরেছে।ও তোমরা এসে গেছো।খেয়ে নাও দারুণ খাবার ।ভাবীর রান্না লা জবাব ।
আমার তো রাগে মাথা জ্বলে যাচ্ছে ।
মরছি পায়ের যন্ত্রণা তে আর তোমরা এখানে সুন্দরী ভাবীর সঙ্গে হাসি ঠাট্টা য় মজে আছো।আমাদের বয়োজ্যেষ্ঠ দাদা যিনি আমাদের লিডার তিনিও।আমি রেগে বলি অশোক দা আপনিও এই চ্যাঁড়াগুলোর মতো?আমরা দুজনে একা ওই টিমটিমে আলোর মধ্যে বসে বসে বোর হচ্ছি আর আপনারা আপনারা বলতে বলতে কেঁদেই ফেলি।
সবাই ধড়মড় করে উঠে পড়ে।আরে আমরা তো ডাকতে যাচ্ছিলাম রাম সিং বলল যাবে তাই কথা শেষ হওয়ার আগেই ওই সুন্দরী নেপালি বউ এসে দিদি থোড়া সা চায় পিয়ো।এতো স্নিগ্ধ এতো শান্ত এতো সুরেলা গলা আমি কেমন আবিষ্ট হয়ে গেলাম ।কেমন যেন যাদু মাখানো।আমার সব রাগ জল হুয়ে গেল। অত রাতে ওর দেওয়া চা খেয়ে আমরা ফিরে এলাম ।মনটা যেন আনন্দে ভরে গেল।
কাঠের চৌকি বেশ শক্ত লাগছে তবু ক্লান্তি তে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি।তার আগে আমাদের ডাক্তার বাবু সযত্নে
আমার ফোস্কার ট্রিটমেন্ট করে দিয়েছে ।সেই আরামে গভীর নিদ্রায় নিমগ্ন।নীচে ছেলেদের নাসিকা গর্জন শুরু হয়েছে।অন্ধকারে কিচ্ছু দেখা যাচ্ছে না ।হঠাৎ মাঝরাতে গোবিন্দর চীৎকার ওরে মলু আমার পায়ের আঙুলে কি একটা কামড়ালো ধড়মড় করে আমরা সবাই উঠে পড়লাম ।টর্চ জ্বালা হলো দু তিনটে।সত্যিই তো ওর ঘুমের ঘোরে গোডাউনের ইঁদুর অনেকদিন পর এমন মাংসালো কিছু পেয়ে মনে হয় লোভ সামলাতে পারে নি।আঙুল কেটে দিয়েছে।চেঁচামেচি শুনে গাইড পোর্টার সবাই এসে হাজির। এদিক ওদিক দেখতে দেখতে একটা নলের মুখে বিশাল একটা ধেড়ে ইঁদুর সড়াৎ করে বেরিয়ে গেলো।ওই তো ওই তো বলে সবাই যখন চেঁচিয়ে উঠল সে তখন পগার পার। আর কারো শোয়া হোলো না।ওষুধ পত্তর লাগানো হলো।দেখতে দেখতে ভোর হয়ে গেল। এখন হাসছি সেদিন সবাইকে কাঁদিয়ে ছেড়েছে ওই ইঁদুর। যাক্ বাবা অদ্যই শেষ রজনী।

পরের দিন সকালে ওদের ওখানে চা নাস্তা করে নাইটোয়ারের বাসে চড়লাম। এবারে হর কি দুনের পথে।
কতোদিনের পুরোনো কথা এখনও স্পষ্ট মনে আছে।শুধু মেয়েটির নাম টি ভুলে গেছি।আমার সঙ্গী যারা আছে একবার জিজ্ঞেস করবো।ওদের যদি মনে থাকে তাহলে আমার খুব আনন্দ হবে।জীবনের কতো কিছু হারিয়ে যায়।যেগুলো মনে থাকে এরকম হঠাৎ হঠাৎ চোখের সামনে এসে দাঁড়ায় ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here