ত্রিপুরা ও রবীন্দ্রনাথ : কামনা দেব।

0
215

ভারতের একটি ছোট্ট পাহাড়ি রাজ্য ত্রিপুরা। এই ত্রিপুরা সুপ্রাচীন কাল হতেই সংস্কৃতিসম্পন্ন।ত্রিপুরার রাজবংশ ও সংস্কৃতির সাথে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাম ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ত্রিপুরার সম্পর্ক হৃদয়ের আত্মিক সম্পর্ক। আজো ত্রিপুরাবাসীর বুকের ভিতরে গর্বের আসনে অধিষ্ঠিত কবিগুরু।
১৩০৬ বঙ্গাব্দে সর্বপ্রথম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ত্রিপুরার বর্তমান রাজধানী আগরতলায় আসেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরিবারের সাথে ত্রিপুরার রাজবংশের এক ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। রবীন্দ্রনাথের পিতামহ দ্বারকানাথ ঠাকুর ছিলেন ত্রিপুরার মহারাজ কৃষ্ণকিশোর মাণিক্যের খুবই ঘনিষ্ঠ বন্ধু। মহারাজ বীরচন্দ্র মানিক্যের সময়কাল হতেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে ত্রিপুরার যোগাযোগ ছিল। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই পার্বত্য ত্রিপুরার বুকে সাতবার পদার্পণ করেন। ত্রিপুরার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও রাজপরিবারের গভীর আত্মীক সম্পর্ক বরাবর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ত্রিপুরাতে আসার জন্য টানত।

ত্রিপুরার মহারাজ বীরচন্দ্রমানিক্য, রাধাকিশোর মানিক্য, বীরেন্দ্রকিশোর মানিক্য এবং বীরবিক্রম মানিক্যের সঙ্গে কবিগুরুর এক গভীর নিবিড়তম সম্পর্ক ছিল। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন তৎকালীন মহারাজদের শিক্ষা-সংস্কৃতি,সংগীত, নৃত্যকলা প্রসারে এক শুভ ও সৎ পরামর্শ দাতা।

সেই সময় তরুণ কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচিত একটি কাব্যগ্রন্থ সদ্য পত্নীহারা ত্রিপুরার রাজার শোকাহত হৃদয়কে এক শান্তির পরশ বুলিয়ে দেয়।
তখন জোড়াসাঁকোর ঐ তরুণ কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ত্রিপুরার রাজ দরবারের সভাকবি করার প্রস্তাব দিয়ে মহারাজা বীরচন্দ্র মাণিক্যের রাজসভার প্রধানমন্ত্রী রাধারমণ ঘোষ হাজির হয়েছিলেন বিশ্বকবির বাড়িতে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তখন রাজি হন নি, কিন্তু ত্রিপুরার রাজ পরিবারের সঙ্গে তাঁর মিত্রতার সেটাই ছিল শুভারম্ভ। এরপর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ত্রিপুরায় এসেছিলেন রাজ পরিবারের অতিথি হয়ে। এরপর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একাধিকবার ত্রিপুরার আগরতলা এসেছেন এবং মহারাজার আনুগত্যও পেয়েছিলেন।

ত্রিপুরার রাজপরিবারের শুধুমাত্র একজন মহারাজা নয়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পরপর তিনজন ত্রিপুরার মহারাজাদের ভালবাসা এবং আন্তরিক আনুগত্য জয় করে নিয়েছিলেন।
১৮৬৯ হতে ১৮৯৯ সালে প্রথমে বীরচন্দ্র মাণিক্য এবং ১৮৯৯ হতে ১৯০৯ সাল পর্যন্ত তাঁর পুত্র রাধাকিশোর মাণিক্য এবং শেষ পর্বে তাঁর পুত্র বীরবিক্রম কিশোর দেববর্মণের আনুগত্য লাভ করেন। এঁদের পরিবারের আমন্ত্রনেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বার বার ত্রিপুরায় এসে বাস করেছেন এবং দুইটি স্থাপত্যকীর্তিতে নজর কাড়েন। এর একটি হলো, আগরতলা শহরের জয়ন্ত প্রাসাদ , অর্থাৎ বর্তমানের উজ্জয়ন্ত প্যালেস (রাজবাড়ী)।
অন্যটি ১৯২১ সালে রুদ্রসাগরের মাঝে তৈরি হওয়া নীরমহল প্রাসাদ, যা রাজস্থানের উদয়পুর ছাড়া ভারতের একমাত্র লেক প্যালেস। এছাড়াও বীরচন্দ্র মাণিক্যের পুরোনো প্রাসাদেও কবি থেকেছেন কিছুদিন।
আর এখানেই রবীন্দ্রনাথ আর ত্রিপুরার রাজ পরিবারের ইতিহাসের ইতি ঘটেনি।
অনেকরই হয়তোবা জানা নেই যে এই তিনটি রাজপ্রাসাদ ছাড়াও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ত্রিপুরার রাজপরিবারের আরও একটি বাসস্থানে একাধিক বার রাত কাটিয়ে গেছেন। বর্তমানে সেই একই রাজ প্রাসাদে অর্থের বিনিময়ে আজ যে কেউ সেখানে রাত কাটাতে পারবেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে রাজকীয় মেহগনি খাটে শুয়েছেন, সেই খাটে এখনো গড়াগড়ি খাওয়া যাবে। যেই লেখার টেবিলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বসে লেখালিখি করেছেন, ইচ্ছে করলে আজো সেখানে বসে লেখালিখি বা ল্যাপটপ চালিয়ে মনকে রবীন্দ্র পরশ দিতে পারা যাবে তাঁর নাম হলো “ত্রিপুরা ক্যাসেল।
আর এই “ত্রিপুরা ক্যাসেল”এর ব্যতিক্রম রুম নম্বর- ৩০২ এর খাট। এই সেই খাট, ঘর, যেখানে একাধিকবার রাত কাটিয়ে গেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। আজও এই ঘরে সযত্নে রাখা আছে কবিগুরুর ব্যবহৃত খাট এবং লেখার টেবিল। আর এই লেখার টেবিলটি ঊনবিংশ শতকের ইউরোপীয় আসবাবের ঘরানার এক অনবদ্য নিদর্শন। যাতে রয়েছে অসংখ্য ছোট ছোট দরজা ছাড়াও আটটি ছোট ছোট খোপ । আর সেই টেবিলের পাশে স্বগর্বে অধিষ্ঠিত একটি ঘোষণাপত্র। যা মনে করিয়ে দেয় ত্রিপুরার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এক দীর্ঘ সুসম্পর্ক ও মাণিক্য রাজবংশের পটভূমিতে লেখা তাঁর দুটি স্মরণীয় সৃষ্টি, ‘মুকুট’ ও ‘রাজর্ষি’।

সেখানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আরো দুটি ব্যবহৃত মেহগনি কাঠের পালঙ্ক আছে ত্রিপুরা ক্যাসেলের নতুন প্রাসাদে। যেই প্রাসাদ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সময় যদিও তৈরি হয় নাই। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ত্রিপুরা বিষয়ক বহু গ্রন্থাবলির মধ্যে কৈলাসচন্দ্র সিংহের সহযোগিতায় রবীন্দ্রনাথ ‘রাজর্ষি’, ‘মুকুট’ নামক ঐতিহাসিক উপাখ্যান রচনার সাথে সাথে ‘প্রেম মরীচিকা’, ‘আকাশ কুসুম’, ‘বিসর্জন উচ্ছ্বাস ও সোহাগী’ এবং ‘ভগ্নহৃদয়’ এর মত বিখ্যাত অধ্যায়ও রচনা করেন। বিসর্জন এমন একটি নাটক যা রক্তকরবী নাটকের পর শ্রেষ্ঠ হিসেবে বিবেচিত হয়।
তখন ১৯১৩ সাল। যখন কবিগুরুর সাহিত্যে শ্রেষ্ঠত্বের সাম্মানিক হিসেবে উনাকে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়। তখন মহারাজা বীরেন্দ্রকিশোর মানিক্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ত্রিপুরাতে এনে আগরতলার উমাকান্ত একাডেমীতে “কবি সম্বর্ধনা “ জ্ঞাপন করেন। ত্রিপুরার সর্বশেষ মহারাজ বীরবিক্রম কিশোর মাণিক্য কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে “ভারত ভাস্কর” উপাধিতেও ভূষিত করেন।
——‐-‐———-‐————————————-
(সংগৃহীত তথ্যনির্ভর তথ্যসংগ্রহে এ লেখার প্রয়াস)
©️ কামনা দেব ™️:- 28/04/2020 আগরতলা, পশ্চিমত্রিপুরা, ভারতবর্ষ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here