নারী প্রগতি আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃত মহীয়সী কবি “সুফিয়া কামালের আজ ২১তম মৃত্যু বার্ষিকী : সুরভি জাহাঙ্গীর।

0
1830

নারী প্রগতি আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ কবি সুফিয়া কামালের আজ ২০ নভেম্বর ২১তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৯৯ সালের এই দিনে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁকে শ্রদ্ধাঞ্জলি। সুফিয়া কামাল ১৯১১ সালের ২০ জুন বরিশালের শায়েস্তাবাদে মামার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম সৈয়দ আব্দুল বারী এবং মাতার নাম সৈয়দা সাবেরা খাতুন। বাবা কুমিল্লার বাসিন্দা ছিলেন। যে সময়ে সুফিয়া কামালের জন্ম তখন বাঙালি মুসলিম নারীদের গৃহে বন্দীজীবন কাটাতে হতো। তখন না আ’লীগের স্কুল-কলেজে পড়ার কোন সুযোগ ছিল না। পরিবারে বাংলা ভাষার প্রবেশ একরকম নিষিদ্ধ ছিল। সেই প্রতিকূল পরিবেশে সুফিয়া কামাল প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ পাননি। তিনি পারিবারিক নানা উত্থান-পতনের মধ্যে স্বশিক্ষায় শিক্ষিত হয়েছেন।

১৯৩৮ সালে সুফিয়া কামালের বয়স যখন সাত বছর তখন তাঁর বাবা সাধকদের অনুসরণে নিরুদ্দেশ যাত্রা করেন। ফলে তাঁকে নিয়ে তাঁর মা সাবেরা খাতুন অনেকটা বাধ্য হয়ে বাবার বাড়িতে এসে আশ্রয় নেন। এ জন্য তাঁর শৈশব কেটেছে নানাবাড়িতে। যে পরিবারে সুফিয়া জন্মগ্রহণ করেন সেখানে নারীশিক্ষাকে প্রয়োজনীয় মনে করা হতো না। তাঁর মাতৃকূল ছিল শায়েস্তাবাদের নবাব পরিবারের এবং সেই পরিবারের কথ্য ভাষা ছিল উর্দু। এ জন্য অন্দরমহলে মেয়েদের আরবি, ফারসি শিক্ষার ব্যবস্থা থাকলেও বাংলা শেখানোর কোন ব্যবস্থা ছিল না। তিনি বাংলা শেখেন মূলত মায়ের কাছে। নানাবাড়িতে তাঁর বড় মামার একটি বিরাট গ্রন্থাগার ছিল। মায়ের উৎসাহ ও সহায়তায় এ লাইব্রেরির বই পড়ার সুযোগ ঘটেছিল তাঁর।

১৯২৪ সালে মাত্র ১৩ বছর বয়সে মামাতো ভাই সৈয়দ নেহাল হোসেনের সাথে সুফিয়ার বিয়ে হয়। নেহাল অপেক্ষাকৃত আধুনিকমনস্ক ছিলেন। তিনি সুফিয়াকে সমাজসেবা ও সাহিত্যচর্চায় উৎসাহিত করেন। সাহিত্য ও পত্র-পত্রিকার সঙ্গে সুফিয়ার যোগাযোগও ঘটিয়ে দেন তিনি। সুফিয়া কামাল সে সময়ের বাঙালি সাহিত্যিকদের লেখা পড়তে শুরু করেন। ১৯১৮ সালে কলকাতায় গিয়েছিলেন তিনি। সেখানে বেগম রোকেয়া সাখাওয়াতের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়েছিলো। সুফিয়া কামালের শিশুমনে বিশেষ জায়গা করে নিয়েছিলো বেগম রোকেয়ার কথা ও কাজ।

সাহিত্যপাঠের পাশাপাশি সুফিয়া কামাল সাহিত্য রচনা শুরু করেন। ১৯২৬ সালে তাঁর প্রথম কবিতা ‘বাসন্তী’ তখনকার প্রভাবশালী সাময়িকী সওগাতে প্রকাশিত হয়। ত্রিশের দশকে কলকাতায় থাকার সময়ে বাংলা সাহিত্যের উজ্জ্বল নক্ষত্র, যেমন- রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, শরৎচন্দ্র প্রমুখের কিছুটা সান্নিধ্য পান। মুসলিম নারীদের সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করার জন্য বেগম রোকেয়ার প্রতিষ্ঠিত সংগঠন ‘আঞ্জুমানে খাওয়াতিনে ইসলামে’ রোকেয়ার সঙ্গে সুফিয়া কামালের পরিচয় হয়। রোকেয়ার চিন্তাধারা ও প্রতিজ্ঞা তাঁর মধ্যেও সঞ্চারিত হয়‌ এবং যা তাঁর জীবনে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে।

নিজের সাহিত্য প্রয়াসের সূচনা প্রসঙ্গে তিনি এ ভাবে স্মৃতিচারণ করেছেন, ‘এমনি কোন বর্ষণমুখর দিনে মুসলমান সাহিত্য পত্রিকায় প্রকাশিত কাজী নজরুল ইসলামের লেখা হেনা পড়েছিলাম বানান করে। প্রেম, বিরহ, মিলন- এসবের মানে কি তখন বুঝি? তবু যে কী ভালো, কী ব্যথা লেগেছিল তা প্রকাশের ভাষা কি আজ আর আছে? গদ্য লেখার সেই নেশা। এরপর প্রবাসী পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা পড়তে পড়তে অদ্ভুত এক মোহগ্রস্ত ভাব এসে মনকে যে কোন্‌ অজানা রাজ্যে নিয়ে যেতো। এরপর দেখতাম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন, বেগম সারা তাইফুর লিখছেন। কবিতা লিখছেন বেগম মোতাহেরা বানু। মনে হলো ওরা লিখছেন আমিও কি লিখতে পারি না? শুরু হলো লেখা লেখা খেলা। কী গোপনে, কত কুণ্ঠায়, ভীষণ লজ্জার সেই হিজিবিজি লেখা ছড়া, গল্প। কিন্তু কোনোটাই কি মনের মতো হয়! কেউ জানবে, কেউ দেখে ফেলবে বলে ভয়ে ভাবনায় সে লেখা কত লুকিয়ে রেখে আবার দেখে দেখে নিজেই শরমে সংকুচিত হয়ে উঠি।’ ১৯৩৭ সালে তাঁর গল্পের সংকলন কেয়ার কাঁটা প্রকাশিত হয়। ১৯৩৮ সালে প্রকাশিত প্রথম কাব্যগ্রন্থ সাঁঝের মায়ার মুখবন্ধ লেখেন কাজী নজরুল ইসলাম। বইটি বিদগ্ধজনের প্রশংসা কুড়ায়, যাদের মাঝে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও ছিলেন।

১৯৩২ সালে তাঁর স্বামীর আকস্মিক মৃত্যু তাঁকে আর্থিক সমস্যায় নিপতিত করে। তিনি কলকাতা কর্পোরেশন স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন এবং ১৯৪২ সাল পর্যন্ত এ পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। এর মাঝে ১৯৩৯ সালে কামালউদ্দিন আহমেদের সাথে তাঁর দ্বিতীয় বিয়ে হয়। দেশ-ভাগের আগে কিছুকাল তিনি নারীদের জন্য প্রকাশিত সাময়িকী বেগম এর সম্পাদক ছিলেন। দেশভাগের পর ১৯৪৭ সালে সুফিয়া কামাল পরিবারসহ ঢাকায় চলে আসেন। ভাষা আন্দোলনে তিনি নিজে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন এবং এ আন্দোলনে তিনি নারীদের উদ্বুদ্ধ করেন।

১৯৫৬ সালে শিশুদের সংগঠন কচিকাঁচার মেলা প্রতিষ্ঠা করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মহিলা হোস্টেলকে ‘রোকেয়া হল’ নামকরণের দাবী জানান। ১৯৬১ সালে পাকিস্তান সরকার কর্তৃক রবীন্দ্রসঙ্গীত নিষিদ্ধের প্রতিবাদে সংগঠিত আন্দোলনে তিনি জড়িত ছিলেন। এ বছরে ছায়ানটের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ১৯৬৯ সালে মহিলা সংগ্রাম কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন, গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেন, পাকিস্তান সরকার কর্তৃক ইতোপূর্বে প্রদত্ত তমঘা-ই-ইমতিয়াজ পদক বর্জন করেন। ১৯৭০ সালে মহিলা পরিষদ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭১ সালের মার্চে অসহযোগ আন্দোলনে নারীদের মিছিলে নেতৃত্ব দেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর বাসভবন সংলগ্ন গোটা ধানমন্ডি এলাকা পাকিস্থানী বাহিনীর নিরাপত্তা হেফাজতে ছিল, আর এ সময় তিনি ধানমন্ডিতে নিজ বাসভবনে সপরিবারে নিরাপদে অবস্থান করেন।

স্বাধীন বাংলাদেশে নারীজাগরণ ও সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে সুফিয়া কামাল উজ্জ্বল ভূমিকা রেখে গেছেন। ১৯৯০ সালে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে শরিক হয়েছেন, কার্ফ্যু উপেক্ষা করে নীরব শোভাযাত্রা বের করেছেন। মুক্তবুদ্ধির পক্ষে এবং সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদের বিপক্ষে আমৃত্যু তিনি সংগ্রাম করেছেন। তিনি ১৯৯৯ সালের ২০ নভেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। তাঁকে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়। বাংলাদেশী নারীদের মধ্যে তিনিই প্রথম এই বিরল সম্মান লাভ করেন।

সুফিয়া কামাল অসংখ্য গ্রন্থ রচনা করেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- সাঁঝের মায়া (১৯৩৮), মায়া কাজল (১৯৫১), মন ও জীবন (১৯৫৭), প্রশস্তি ও প্রার্থনা (১৯৫৮), উদাত্ত পৃথিবী (১৯৬৪)
দিওয়ান (১৯৬৬), অভিযাত্রিক (১৯৬৯), মৃত্তিকার ঘ্রাণ (১৯৭০), মোর জাদুদের সমাধি পরে (১৯৭২), কেয়ার কাঁটা (১৯৩৭), সোভিয়েতে দিনগুলি (১৯৬৮), একাত্তরের ডায়েরি (১৯৮৯), একালে আমাদের কাল (১৯৮৮), ইতল বিতল (১৯৬৫)
নওল কিশোরের দরবারে (১৯৮১)।

সুফিয়া কামাল বিভিন্ন সময়ে অর্ধ-শতাধিক পুরস্কার লাভ করেছেন। এর মাঝে কয়েকটি হল-
পাকিস্তান সরকারের তমঘা-ই-ইমতিয়াজ (১৯৬১, কিন্তু তিনি প্রত্যাখান করেন ১৯৬৯ সালে), বাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৬২), সোভিয়েত লেনিন পদক (১৯৭০), একুশে পদক (১৯৭৬), নাসিরউদ্দিন স্বর্ণপদক (১৯৭৭), সংগ্রামী নারী পুরস্কার, চেকোশ্লোভাকিয়া (১৯৮১), মুক্তধারা পুরস্কার (১৯৮২), বেগম রোকেয়া পদক (১৯৯৬)
জাতীয় কবিতা পরিষদ পুরস্কার (১৯৯৫), দেশবন্ধু সি আর দাস গোল্ড মেডেল (১৯৯৬), স্বাধীনতা দিবস পদক (১৯৯৭)।

©️ সাহিত্যিক সুরভি জাহাঙ্গীর। বাংলাদেশ/ ঢাকা
———————————–
#তথ্যসূত্র :
——
০১। ‘Biography of Sufia Kamal’.
poemhunter.com (ইংরেজি ভাষায়)।
০২। ‘কামাল, বেগম সুফিয়া’ বাংলাপিডিয়া।
১৫ নভেম্বর, ২০১৯।
০৩। ‘আমাদের সুফিয়া কামাল’। আমাদের
বরিশাল.কম। ২১ জুন, ২০১৪।
০৪। ‘সুফিয়া কামালের রূপকথা’। ২৬-১১-২০১১।
bdnews24.com.
০৫। ‘Sufia Kamal’s 108th Birthday’.
www.google.com. ২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯।
০৬। উইকিপিডিয়া। ১৮ নভেম্বর, ২০২০।
———————————————————–
#ছবি : গুগল থেকে সংগৃহীত…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here