অপরাজিতার তিন ভুবন(চতুর্বিংশ পর্ব) : ডঃ অশোকা রায়।

Spread the love

সেদিনের সন্ধ্যাটা অপরাজিতার কাছে এক পরম প্রাপ্তি |তার জীবন পাত্র উছলিয়া মাধুরী দান করেছেন কণিকা বন্ধ্যোপাধ্যায়, শান্তিনিকেতনে কেন, সকলের কাছে পরিচিত তিনি মোহর বা মোহর দি নামে| অপরাজিতা দেখেছে তার ম্যাটিনি – আইডল কে | মোহরদির বলাতে অপরাজিতা গান শুনিয়েছে, ” দূরে কোথায় দূরে দূরে..” গান থেমেছে | মোহর দি স্তব্ধ | শান্তিরঞ্জনের উৎকন্ঠা, কি বলবে মোহর, অপরাজিতা সম্পর্কে? মোহর দি বলেছেন, ” বড়ো মিষ্টি গলা তোমার | সরস্বতী স্বয়ং সহায় তোমার | তবে নকল করে গেয়ো না | কিছুটা নিজস্বতা এনো| তবে রবীন্দ্র গানের স্বরলিপির অনুসরণে |” সারাজীবন মনে রেখেছে অপরাজিতা মোহরদির এই উপদেশ, “কারোর নকল করে গেয়ো না |” তাই আজ অপরাজিতা কণিকা বন্ধ্যোপাধ্যায়েরের ঘরানার ঢঙে গাইলেও, গানে তার নিজস্বতার ছাপ রয়েছে, তবে তা কখনোই স্বরলিপির বাইরে গিয়ে নয় | আজ অপরাজিতার ঘরের শো – কেসে সাজানো দৃশ্যমান ট্রফি, মেমোন্টো শংসাপত্রের থেকে মোহর দিরঅনেক দামী অফ রেকর্ড প্রশংসা | মৌ রবিতীর্থে গান শেখার সুবাদে সুচিত্রা মিত্রের ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে এসেছে | বড়ো যত্ন করে তাকে গান শিখিয়েছেন সুচিত্রাদি| সেটা কিছুটা মৌয়ের গায়কী ভঙ্গী, কিছুটা তার মিষ্টি মধুর স্বভাবের জন্য | সুচিত্রা মিত্র মৌ কে আর্শীবাদ করেছেন, ” আমার ঘরানা তুমি ধরে রাখবে |” আবার স্পষ্ট বক্তা মৌ যখন ফটফট কথা বলেছে, মৌয়ের কান মুলে দিয়েছেন সুচিত্রাদি | এ’ সব গল্প মৌয়ের কাছে শুনেছে অপরাজিতা |
রবীন্দ্র সদনে মৌ- অপরাজিতার গান শেষ হয়েছে | গ্রীনরুমে উদ্যোক্তাদের তরফে চা- মিষ্টি দেয়া হয়েছে | না না করেও অপরাজিতা – মৌ তার সদ্ব্যবহারে ব্যস্ত, অবশ্যই নিজেদের পেটের খিদে বুঝতে না দেয়ার টেকনিক বজায় রেখে, চামচ দিয়ে মিষ্টি ছোট ছোট করে কেটে, ছোট্ট মুখের হাঁয়ের মধ্যে চালান করছে | ছোট্ট চুমুক বাহারীচায়ের কাপে | অপরাজিতা হঠাৎ নজর করেছে গ্রীনরুমে বসে থাকা একটি ছেলের দিকে, কত আর বয়েস? আন্দাজ, ত্রিশের কোঠায় পৌঁছয় নি এখনো | ধারে পারে ঘুরপাক খাচ্ছে | অপরাজিতার চেনা – চেনা মনে হয়, কিন্তু মনে করতে পারে না| মৌ কে কনুইের ছোট্ট ঠ্যালা, ইঙ্গিতে জিজ্ঞেস করে ছেলেটির পরিচয়| মৌ কানে কানে বলে রূপায়ণ সেন| অপরাজিতার মনে পড়েছে | রূপায়ণ সেন | উঠতি শিল্পী | রবীন্দ্র সঙ্গীত শুধু নয়, নজরুল, অতুলপ্রসাদীও গায় | দু-একটা অনুষ্ঠানে দেখা হয়েছে, গানও শুনেছে, কিন্তু কথা হয় নি কখনো | তাই মনে পড়েনি সঙ্গে সঙ্গে | রূপায়ণ চেয়ে আছে, তার দিকে একদৃষ্টে | অস্বস্তিকর অপরাজিতার পক্ষে | অপরাজিতা ভাবে, হয়তো বা তাদের গান ভালো লেগেছে, বলি বলি করে বলে উঠতে পার‌ছে না | তা বাপু বলে ফেলে চোখটা সরা না | তা নয় ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে আছে! মেয়েদের দিকে তাকিয়ে থাকা যে অশালীনতা, সে জ্ঞানটুকু নেই? কেমন ধারা পুরুষ! কেমন ধারা পুরুষ, অপরাজিতা জেনেছে পরে | মৌয়ের ডাকে হুঁশ ফেরে অপরাজিতার “বাড়ি যাবি না? ,” মৌয়ের কথা কানে গেছে এক উদ্যোক্তার | ছুটে আসে সে, ” দয়া করে ডিনার সেরে যান | রূপায়ণ সেনের গান শুনুন খেতে খেতে | রূপায়ণ তখন স্টেজে | অপরাজিতা বলে ফেলে,” আমার আর মৌয়ের দ্বৈত সঙ্গীতের ব্যবস্থা ছিল তো? ” অপরাজিতা সাধারণত এ’ ধরনের কথা বলে না | আজ সে বিরক্ত, রূপায়ণের ওপর |উদ্যোক্তা ছেলেটি বলে, ” একজন বিখ্যাত গাইয়ের সুপারিশে|” অপরাজিতা চুপ করে যায় | মৌ বলে, ” রাত হয়ে যাবে |” “গাড়ি ছেড়ে দিন, যদি অসুবিধা থাকে| আমাদের গাড়ি পৌঁছে দেবে |” মৌ বলে,” দরকার হবে না | নিজেদের গাড়িতে এসেছি যখন, তখন ওতেই ফিরতে পারব |তবে ডিনারের ব্যবস্থা তাড়াতাড়ি করলে ভালো হয় |” উদ্যোক্তা দৌড়ে যায় ডিনারের ব্যবস্থা করতে | অপরাজিতা বলে,
” একটু মিষ্টি করে বললে তো পারতিস |” ” আরে ছাড় তো |”

ডিনার খেতে খেতে অপরাজিতা উৎকর্ন হয়ে শোনে স্টেজে রূপায়ণ গান ধরেছে মাইক্রোফোনের সামনে, ” একা মোর গানের তরী ভাসিয়ে ছিলাম নয়ন জলে | সহসা কে এলে গো সে তরী বাইবে বলে”.. দরদীয়া গলায় অতুলপ্রসাদী | রূপায়ণের দ্বিতীয় গান নজরুল গীতি, ” শাওন রাতে যদি স্মরণে আসে মনে, বাহিরে ঝড় ঝরে, নয়নে বারি বহে |” বড্ড মর্মস্পর্শী গান | বাইরে বৃষ্টির ঝমঝমানিতে কোথাও থেকে কনক চাঁপার গন্ধ ভেসে আসে অপরাজিতার মনে | রবীন্দ্র সদনে কনকচাঁপার গাছ আছে বলে জানে না অপরাজিতা | কনকচাঁপার গন্ধ এসেছে তার মনে, গানের তরী বেয়ে | অপরাজিতার নারীমন বলছে, তার জীবনে আবার কিছু ঘটতে যাচ্ছে | অপরাজিতা স্হির প্রতিজ্ঞ, যদি তেমন কিছু হয়, তবে সে নিজের হাতে হৃদয়ের দরজা বন্ধ করে দেবে | কিন্তু কেউ যদি সেই দরজায় কড়া নেড়ে বলে, “আমি হাত দিয়ে দ্বার খুলব না গো, গান গেয়ে দ্বার খোলাব? ” অপরাজিতা কি করেছে সে পরিস্থিতিতে, সেটা পরের গল্প | আপাততঃ আমরা ফিরে আসি, রবীন্দ্র সদনের গ্রীনরুমে, অনুষ্ঠানের সেই রাতে | দেরি হয়ে যাচ্ছে, মৌয়ের তাড়া | ঝিমলিটা কি করছে কে জানে! অপরাজিতা – মৌ বেরিয়ে দেখে করিডোরে রূপায়ণ| অপরাজিতাকে সরাসরি বলেছে,” আমি যদি আপনার বাড়ি যাই, আপত্তি আছে? ” অভাবিত প্রস্তাব | কিন্তু অসভ্যতায় অভ্যস্ত নয় অপরাজিতা | দু মুহুর্তের ভাবনা, ” নিজের বাড়িতে রূপায়ণ খেয়ে তো ফেলবে না তাকে | দেখাই যাক না, কি বলে রূপায়ণ? হয়তো গানের জগতে দাঁড়ানোর জন্য অপরাজিতার মত সেলিব্রিটির সাহায্য চাইবে |এরকম সাহায্য তো অনেকই করেছে অপরাজিতা | রূপায়ণের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হবে কেন? মুখে পেশাদারী হাসি নিয়ে অপরাজিতা বলে, ” নিশ্চয়ই আসবেন, তবে ফোন করে |” রূপায়ণ বলে, ” নিশ্চয়ই | আপনার মত সেলিব্রিটির সময়ের অভাব,.. জানি আমি| আচ্ছা আসি | নমস্কার |” মৌ তাড়া দেয় “চল |” অপরাজিতা যেতে যেতে বলে রূপায়ণকে “উদ্যোক্তাদের কাছে আমার ঠিকানা আছে |” রূপায়ণের উত্তর ” আপনার মত সেলিব্রিটির ঠিকানা জানতে হয় নাকি? ” মৌ বলে, ” মরণ|” অবশ্য আস্তে।

রাত বারোটা | মৌয়ের দাদুর গ্র্যান্ড ফাদার ক্লক জানিয়েছে আওয়াজ করছে | অপরাজিতা তাকায় ঘড়িটার দিকে পেন্ডুলামটা দুলছে| অপরাজিতার আজ সকাল থেকে ডান চোখের পাতায় কাঁপন| ভালো লক্ষণ নয় এটা| অপরাজিতার উত্তরণ ঘটেছে সাফল্যের পথে, কিন্তু এসব ব্যাপারে কুসংস্কার যায় নি | সেলিব্রিটিরাও তো সংস্কার, কুসংস্কার মিলিয়ে একটা মানুষ, এসবের ঊর্দ্ধে কোন দেব- দেবী নয় | অপরাজিতা মানবী| তাই তার মনে হয়, তার অগোচরে জীবনটা অগোছালো হয়ে যেতে বসছে না তো? সায়ন বা চয়নের কিছু হয় নি তো? অনামিকা তো মারা গেছেন মারাত্মক ভাবে বাস চাপা পড়ে | অপরাজিতা খবর পায় নি | সে সময় সে দিল্লিতে | পরে যখন কার একটা মুখে শুনেছে, তখন যাওয়ার তাগিদ বোধ করেনি | কি জানি, অনামিকা মারা যাওয়ার সময়ে যদি অপরাজিতা কলকাতায় থাকত, তবে যেত কিনা দুবার ভাবত | না, মূলতঃ অনামিকার জন্যে তার প্রথম ভুবনের আলো নিভেছে, গান থেমেছে বলে নয়, অস্বস্তি হত যেতে | কি করত গিয়ে সে? খানিকটা সময় নষ্ট, আর লোকজনের মুখরোচক আলোচনার খোরাক হওয়া | মারা গেলে দুষ্টু জনেরাও শহীদ হয়ে যায় | অনামিকা মারা গেছে, আর অপরাজিতা বেঁচে আছে | সহানুভূতির পাল্লা তখন ভারী অনামিকার দিকে | অপরাজিতা এসব ভাবতে ভাবতে নিজের ঘরে ঢোকে | ‌এককোণে রাখা দুজনের মত বসার সোফায় গা’ এলিয়ে দেয় | ক্লান্তির সাথে মনের শ্রান্তি আর অস্বস্তি | বেল বাজে | রাতের আগন্তুক | অপরাজিতার কেন জানি না মনে হয়, এসেছে দুঃসংবাদ | সায়ন- চয়নের সাথে তাহলে এখনও বাঁধন তার পুরোপুরি ছেঁড়েনি!! সায়নের জন্যে অনুকম্পা হয়, কিন্তু চয়নের জন্যে অনুক্ষণ অপরাজিতার মনে বয়ে যায় স্নেহের চোরা স্রোত, অদর্শনের চোরা বালির তলায় লুকিয়ে থেকে | বিন্দিয়া দরজা খুলে দিয়েছে আগন্তুক কে | কিরণময়ীকে খুঁজতে কেউ আসবে বলে মনে হয় না | যেই এসে থাকুক, প্রয়োজনে এসেছে এবং প্রয়োজন তার অপরাজিতার সঙ্গে |
অপরাজিতার ধারণা সত্যি, অপরাজিতার প্রিয়জনের অমঙ্গলের আশংকা ও সত্যি | বিন্দিয়া এসে খবর দেয়, “কোই বাবু আপকো সাথ ভেট করতে চাইছে |” অপরাজিতা বলে, ” নাম কি?” ” বাবুল সেন |” ” বাবুল সেন!!! বাবুল দা এসেছে!! তাহলে সায়ন বা চয়নের কিছু হয় নি | অপরাজিতা ও বাড়িতে থাকাকালীন তো সায়ন আর বাবুল দার মুখ দেখাদেখি বন্ধ অপরাজিতা কে কেন্দ্র করে | রেওয়াজ করাকে অবৈধ সম্পর্কের তকমা | অশ্লীলতার দায়ে বাবুল – অপরাজিতার অমলিন সম্পর্কে কাদার ছিটে | সে ছিটে দিয়েছে সায়ন | নিশ্চিত সায়নের পাশে বিপদে দাঁড়াবে না বাবুল সেন |তাই অপরাজিতা নিশ্চিন্ত | কিন্তু অপরাজিতার ভূল ভেঙেছে | বাবুল জানিয়েছে, চয়ন প্রচন্ড অসুস্থ | ডেঙ্গি হয়েছে | আর. জি. কর মেডিকেল হসপিটালে ভর্তি | চিকিৎসা হচ্ছে, কিন্তু উন্নতি তেমন চোখে পড়ছে না | অপরাজিতা নির্বাক | বাবুল বলেছে, ” যাবি তো তুই?” অপরাজিতা বলেছে, তুমি একটু দাঁড়াও আসছি আমি | ঘরে গিয়ে আলমারিতে যা ক্যাশ ছিল, ব্যাগে পুরেছে | ব্যাগেও কিছু টাকা আছে, আর আছে ক্রেডিট, ডেবিট কার্ড | কিরণময়ীকে সব জানিয়ে বাবুলের সাথে বেরিয়ে পড়ে অপরাজিতা, বাবুলের গাড়িতে | ব্রিজলাল তখন চলে গেছে | বাবুল ব্রিজলাল কে ডাকতে মানা করেছে | গাড়িতে অপরাজিতা বাবুলকে জিজ্ঞেস না করে পারে না, “বাবুল দা ওদের সাথে সম্পর্ক তোমার আবার জোড়া লেগেছে বুঝি?” পথের দিকে চোখ রেখে গাড়ির স্টিয়ারিং সাবধানে ঘোরাতে ঘোরাতে বাবুল বলে, ” সম্পর্ক তো আমার দিক থেকে ভাঙেনি বোন | বলেছিলাম তো সায়নকে সেসময়, সম্পদে পাবি না আমাকে, বিপদে পাবি | তাছাড়া আমার মনে হয়েছে চয়নের অসুখের ব্যাপার তোর জানা উচিত, তাই ছুটে এসেছি তোর কাছে |” অপরাজিতার মনে পড়ছে না, বাবুলদা আগে কি ওকে তুই বলত, না তুমি? তবে অপরাজিতা এটা বুঝতে পেরেছে, সায়ন বাবুল সেন কে চয়নের অসুখের খবর জানাতে বলেনি | অপরাজিতার আজ মনে হচ্ছে, সায়নের সাথে তার ডিভোর্সের সময় সে চয়নের কাস্টডি চাইতে পারত | মৌও তাই পরামর্শ দিয়েছিল |অপরাজিতা ক্ষমতা দেখায় নি, সায়ন কে ক্ষমা করে দিয়েছিল | অপরাজিতার তখন আর্থিক অবস্থা খারাপ নয় | অপরাজিতা তো নিজের জন্য খোরপোশটাও ছেড়ে দিয়েছিল | অপরাজিতা বাইরে তাকায় | শ্যামবাজার পাঁচ মাথার মোড়ের নেতাজির মূর্তি পেরিয়ে গাড়ি চলেছে আর. জি করের দিকে | আর একটু খানি পথ | আর জি করে পৌঁছে সায়ন – চয়নের মুখোমুখি হওয়ার পথটা অপরাজিতার কাছে দুর্গম লাগছে যে!……(ক্রমশ)


Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *