কিরণবালার উঠোন (দ্বিতীয় অধ্যায়;অষ্টম পর্ব): প্রদীপ গুপ্ত।

Spread the love

” সুমনার কথা “

মায়েরা সম্ভবত প্রাকৃতিক নিয়মেই একটু বেশি অনুভূতিশীল হন। এ ছাড়া আমিও বোধহয় অকারণেই একটু বেশী উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠছিলাম। বেদব্রতদের বাড়ি থেকে কাজ করে ফিরে এসে গা হাত পা ধুচ্ছি, গুনগুন করে খুব সম্ভব দু এক কলি গানও করছিলাম। বারান্দায় টাঙানো দড়িতে যখন গামছাটাকে মেলে দিচ্ছি, এমন সময় মা তুলসীতলায় প্রদীপ দেখিয়ে দাওয়ায় এসে আমার কাঁধে হাত রাখলেন।
–” কিরে! মনে এতো আনন্দ কিসের তোর! “
–” কই! কিছু না তো! “
–” আমি কিছুদিন ধরেই লক্ষ্য করছি, ওই নতুন ছেলেটার বাড়ি থেকে ফিরেই যেন তুই অন্যরকম হয়ে যাস। সেই চেনা সুমিকে কেমন যেন অচেনা লাগে। সুমিতের সাথে দেখা হয় না আর আজকাল? “
–” হ্যাঁ দেখা হয় তো! সুমিতদা যখন বেদাদার বাড়িতে কাজকর্মের খোঁজ নিতে আসেন, তখন দেখা হয়। “
–” ব্যাস? “
–” না, এছাড়াও আমি যখন কাজ থেকে ফিরে পার্টি অফিসে যাই, তখনও দেখা হয়। “
–” দেখ্ সুমি, একটা কথা বলি, সুমিতকে আমি বেশ বুঝতে পারি। অনেকটা যেন আমাদের ঘরের ছেলের মতোই, ওর চালচলন, কথাবার্তা, সবকিছু –“
–” তো “
–” না, তাই বলছিলাম আর কি। ওই নতুন ছেলেটা –“
–” মা, একটা কথা বলবে? “
–” বল্ “
–” তুমি কি মনে করো যে, ভালোবাসাটা একটা খেলার মতো! ইচ্ছে হলে এর সাথে খেললাম, না হলে ওর সাথে! মা, ওদের দুজনের কারো সাথেই আমার কিছুই হয় নি। তবে দুজনেই আমার খুব ভালো দাদা। একদম নিজের দাদার মতোই। “
–” আমি মুখ্যুসুখ্যু মানুষ, আমি কি আর অতশত কিছু বুঝি বল্ ? তবে তোর মধ্যে এ’ কদিন ধরে কিছু পালটে যাওয়া দেখছি, তাই —
সে কথা থাক, আয় দেখি, তোর চুলটা বেঁধে দিই। ইস্ চুলগুলোর কি অবস্থা করেছিস্ রে সুমি! বলি, চুলে কি তেল টেল কিছু দিস্ না নাকি? “
মায়ের হাত থেকে ছাড়া পেতেই মন চেপে ধরলো আমায়। আমি কি মাকে সত্যি কথা বললাম, না কি? বেদাদার ওপর কি আমার এতোটুকুও — যদি সেটা নাই হবে, তাহলে ওর সাথে এতোটুকু সময় কাটাতেও আমার ভালো লাগে কেন? সারাটা দিন মনটা কেন পড়ে থাকে ওর সাথে একটু কথা বলার জন্য?
–” হ্যাঁরে সুমি, ঠাকুরপো কি তোকে বলে গেছে, কবে ফিরবে আবার? “
–” আমাকে কেন বলে যাবে বৌদিমণি ! “
–” দ্যাখ্ বোন, মায়েদের না একটা অন্য চোখ থাকে। অন্যরকম অনুভূতির চোখ, সেই চোখ দিয়ে আমরা মায়েরা আমাদের ভালোবাসার মানুষগুলির মনের ভেতরটা দেখতে পাই।
এ’কদিন তোদের চোখের অবস্থা, একজনকে সামনে দেখলে অন্যজনার মুহূর্তে চোখমুখের চেহারা বদলে যাওয়া দেখেও কি আমি কিছু বুঝতে পারি না, বলতে চাইছিস? “
এ কথার কী উত্তর দেবো, বুঝে উঠতে পারি না। চুপ করে মুখ নীচু করে দাঁড়িয়ে থাকি। বৌদিমণি ঘরের তোরঙ্গ খুলে তার ভেতর থেকে একটা খাম বের করে আমার হাতে এনে গুঁজে দেন।
–” এই নে, এটা রাখ্ মুখপুড়ি, যখন ঠাকুরপোকে খুব দেখার ইচ্ছে করবে, তখন এটা দেখে দেখে কথা বলিস। “
খামটা খুলে দেখি, ওর ভেতর বেদাদার একটা পাসপোর্ট সাইজের ছবি। আমার যেন দু’চোখ বেয়ে কান্না আসবে। আমি কী করবো, বুঝে উঠতে পারছি না। আমার চোখের সামনে বেদাদা মিটিমিটি হাসছে। আমি বৌদিমণির দিকে মুখ তুলে চাইলাম। বৌদিমণি আমার কাঁধে হাত রেখে বলে উঠলেন —
–” কিচ্ছুটি মনে করিস না বোন, যখন যা মনে আসবে, আনন্দ — দুঃখ, সব কিছু এসে আমায় বলিস্ । একা একা ভেবে কষ্ট পাস্ না যেন, বুঝলি? “
আমি কোনোক্রমে বৌদিমণির কাছ থেকে ছাড়া পেয়ে রাস্তায় এসে পড়লাম। তখনই আমার মনে এই ভাবনাটা ফের এলো, যে মায়েরা কি সত্যিই তাহলে একটু বেশীই অনুভূতিশীল হন!
সুমিতদা আমার খুব ভালো বন্ধু। এমনকি ওর সাথে আমি নিশ্চিন্তে একঘরে রাতও কাটাতে পারি। এতোটাই নির্ভর আর বিশ্বাস করি সুমিতদাকে। কিন্তু বেদাদাকে দেখার পর থেকেই আমার মনে হচ্ছিলো যে, ভালোবাসা আর বন্ধুত্বের মধ্যে একটা সুক্ষ্ম তারকাঁটার বেড়া আছে। কিন্তু পার্থক্যটা ঠিক কোথায়, সেটা আমি এখনও বুঝে উঠতে পারছি না। যেটুকে বুঝতে পারছি, সেটা হলো বন্ধুর দীর্ঘ অদর্শনও সহ্য করা যায়, কিন্তু ভালোবাসার মানুষকে –, হ্যাঁ আমি এটা বেশ বুঝতে পারছি বেদাদাকে আমি মন থেকে ভালোবেসে ফেলেছি। নইলে এই মাত্র দিন তিনেকের অদর্শনেই আমার মন ব্যাকুল হয়ে উঠছে কেন? রাস্তার ওই আলো অন্ধকারেই আমি বৌদিমণির দেওয়া খামটা একটু ফাঁক করে বেদাদার মুখটা দেখে নিলাম। লোকটা কেমন মুচকি মুচকি হাসছে। খুব রাগ হলো মানুষটার ওপর। আমি এদিকে কষ্ট পাচ্ছি আর তিনি হয়তো ইউনিভার্সিটির সুন্দর সুন্দর মেয়েদের সাথে —
কথাটা মনে হবার সাথে সাথেই সুমিতদার মুখটা ভেসে ওঠে। সুমিতদা সেদিন আমায় এ কথাটা বলেছিলেন। কিন্তু কেন? সুমিতদারও কি মনে হয়েছে যে, আমি বেদাদাকে ভালোবেসে ফেলেছি? যদি ভেবেও থাকেন, তাহলেও বা এ কথা কেন বলবেন? মা তার অনুভূতি দিয়ে কি এটাও বুঝেছিলেন যে, সুমিতদার আমার ওপর —
তাহলে তো মা নিশ্চয়ই এটাও বুঝেছেন যে, আমি সুমিতদাকে বন্ধু হিসেবে নির্ভর করি কিন্তু ভালোবাসার মানুষ হিসেবে না। তাহলে মা আমাকে বারবার সুমিতদার পক্ষে কথা বলে ওর ওপরে আমার মনটাকে কেন বেঁধে দিতে চাইছেন? সম্ভবতঃ এ কারণেই মা এটা চাইছেন যে, মা ওর উচ্চশিক্ষার জন্য ওকে কাছে নিতে ভয় পাচ্ছেন। কিন্তু মা তো একদিনও বেদাদার সাথে দুটো কথাও বলেন নি। বললে বুঝতে পারতেন, কতো সহজভাবে বেদাদা কতো গভীর কথাকে বুঝিয়ে বলতে পারেন। এই যেমন, সেদিন আমাকে বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার সময়, সাহিত্য সংস্কৃতি নিয়ে আলোচনার প্রসঙ্গে, বেদাদা বলেছিলেন —
–” জানো সুমি! সমস্ত মানুষের মনের মধ্যেই একজন সাহিত্যিক বাস করেন। তার মনে তার সমাজ, সংসার, তার বেঁচে থাকার সংগ্রাম, তার ভাবভালোবাসা, তার স্নেহ,প্রীতি, আনন্দ – দুঃখ, হাসি- কান্না — সবকিছু দিয়েই আমরা আমাদের মনের মধ্যে সাহিত্য সৃষ্টি করে চলেছি। কবি সাহিত্যিকদের কাজ হলো মানুষের সাথে মিশে সেই ভাবগুলোকে একটা সুতোয় বেঁধে খাতার পাতায় লিখে রাখা। যদি সেটার মধ্যে মানবিক গুণগুলো থাকে, তাহলে সেটা সুসাহিত্য আর যদি কেউ শুধুমাত্র ব্যবসায়িক কারণে সেটা করেন, কোনো মানবিক দায়বদ্ধতা তার মধ্যে না থাকে, তাহলে সেটা অপসাহিত্য।”
কথাগুলো এখনো আমার মনের মধ্যে গেঁথে আছে।
সুমিতদাও খুব সুন্দরভাবে রাজনৈতিক অবস্থান, নীতি আদর্শ — এসব বোঝান, কিন্তু সাহিত্যকে খুব একটা আমল দেন বলে আমার মনে হয় না।
দুবেদা কিন্তু আমায় বলেছিলেন,
— ” দ্যাখ্ বিটিয়া, যে কমিউনিস্টের মধ্যে সাহিত্যের প্রতি একটা আন্তরিক টান না থাকবে, তিনি কোনোদিনই সার্থকভাবে কমিউনিস্ট জীবনধারার অনুসারী হতে পারবেন না। …..( ক্রমশ)


Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *