সকলেই মানুষ;সকলেই সমান- বিশ্ব মানবাধিকার দিবসের একটি পর্যবেক্ষণ : রুমা বন্দ্যোপাধ্যায়।

0
185

‘সকলেই মানুষ-সকলেই সমান ‘- এই বাক্যটি শুধুমাত্র আমাদের প্রবন্ধের শিরোনাম নয়,এটিই এই বছরের বিশ্ব মানবাধিকার দিবসের ‘ থিম’ বা মূল ভাবনা।
১৯৪৮ সালের ১০ই ডিসেম্বর ‘ইউনাইটেড নেশনস’ বা জাতিসংঘ বিশ্বে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে প্রনয়ন করে ‘সার্বজনীন মানব অধিকার সংক্রান্ত ঘোষনা’ কে।এখানে উল্লেখযোগ্য, বিশ্বের মোট পাঁচশোটি ভাষায় এই ঘোষনাপত্রটি অনূদিত হয়েছে। সেই দিনটিকে স্মরণে রেখেই ১৯৫০ সালে প্রথম জাতিসংঘ সাধারন পরিষদের ৩৭১তম পূর্ণ অধিবেশনে ৪২৩(৫) অনুচ্ছেদের মাধ্যমে তার সদস্যভুক্ত দেশগুলিকে ও অন্যান্য সকল আগ্রহী সংস্থাকে এই দিনটি পালনের আহ্বান জানান। উদ্দেশ্য সমস্ত বিশ্বকে ‘মানবাধিকার’ বিষয়ে সচেতন করা।প্রতি বছর এরজন্য বেছে নেওয়া হয় একটি করে বিশেষ থিম,যা কেন্দ্র করে চলে সারা বছরব্যাপী নানান সচেতনতা শিবির,প্রচারাভিযান ও আলাপ-আলোচনা।ঐতিহ্যগত ভাবে ১০ ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে প্রতি পাঁচ বৎসর অন্তর ‘রাষ্ট্রসংঘের মানব অধিকার ক্ষেত্র পুরস্কার’ প্রদান করা হয়। এ ছাড়া নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রদান কার্যক্রমও এ দিনেই হয়ে থাকে।

২০২০ সালে এই দিবসের মূলভাবনা বা ‘থিম’ ছিল, ‘রিকভার বেটার’।অতিমারী আক্রান্ত সমস্ত বিশ্ব তথা বিশ্ববাসীর নিরাময় লাভের ইচ্ছাই যে ছিল এই ‘থিমের’ উপজীব্য তা বলাই বাহুল্য।বিগত কিছু বছরে এইভাবেই বেছে নেওয়া হয়েছে নানান ‘থিম’ বা ভাবনা ।যেমন-২০১৯ এ যুব সমাজকে মানবাধিকারের বিষয়ে প্রবুদ্ধ করার লক্ষ্যে -‘youth standing up for Human Rights’ আবার ২০১৮ তে (UDHR) অর্থাৎ ‘সার্বজনীন মানবাধিকার সংক্রান্ত ঘোষনা’ র সত্তর বছরপূর্তি উপলক্ষ্যে -‘থিম’ ছিল ‘The Universal Declaration of Human Rights turns 70’ এমনকি ২০১৭ সালেও এই ভাবনাকেই স্মরণে রেখে বিশ্ব মানবাধিকার দিবসটি পালিত হয়।এইভাবেই জাতিসংঘ বারে বারে নানান ভাবনাকে কেন্দ্র করে বিশ্বে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার পথে এগিয়ে গেছে ধাপে ধাপে।

২০১৫ সালে জাতিসংঘ গ্রহন করেছে ‘ ‘Agenda 2030’- যার মূল উদ্দ্যেশ্য মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা এবং দারিদ্রদূরীকরন , জীবনের রক্ষা ও তার মানোন্নয়ন এবং স্থায়ী উন্নতি।কারন এইগুলি ছাড়া বিশ্বজুড়ে যে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করার স্বপ্ন জাতিসংঘ দেখছে, তা সফল করা অসম্ভব।এরজন্য মোট ১৫ বছর সময় নির্ধারন করেছে জাতিসংঘ।সেই লক্ষ্যে পৌঁছানোর মূল উপায় হল বিশ্ব মানবাধিকারের প্রতিষ্ঠা এবং তারজন্য প্রয়োজন সমতা রক্ষার।জাতি,ধর্ম, লিঙ্গ ,বর্ন নির্বিশেষে যদি সকল মানুষ সমান অধিকার লাভ করে তবে তা অবশ্যই আমাদের আলোর পথ দেখাবে।তাই বিশ্ব মানবাধিকার দিবস,২০২১ এর মূল স্লোগান- ‘সকলেই মানুষ -সকলেই সমান।’

বর্তমান বিশ্বে সব থেকে বেশী যদি কিছু বিপন্ন হয় তবে অবশ্যই তা- মানবাধিকার।এখন প্রশ্ন হচ্ছে অধিকার মানে কী? অধিকার মানে শুধুই যা ইচ্ছা তাই করবার ক্ষমতা নয়।অধিকার আসলে নিয়ন্ত্রিত ক্ষমতা,এমন কিছু সুযোগ -সুবিধা যা ব্যতিরেকে মানুষের বিকাশ সম্ভবপর নয়।অধ্যাপক লাস্কির ভাষায়-“অধিকার সমাজ বহির্ভূত বা সমাজ নিরপেক্ষ নয়, এটা সমাজভিত্তিক।”

পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে, এক দেশে যেটা অধিকার অন্য দেশে সেটাই আপত্তির কারণ। তাই জাতিসংঘ সকল দেশের কথা মাথায় রেখে, তিনটি অধিকারকে সার্বিকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে।যথা-সাংস্কৃতিক, সামাজিক এবং শারীরিক। জাতি,ধর্ম,বর্ণ লিঙ্গ ভেদে কেউ এই অধিকারকে অস্বীকার করতে পারে না।

অধিকারের সঙ্গে কর্তব্য কথাটি অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত।প্রখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হবস হাউস বলেছেন, ‘ধাক্কা না খেয়ে পথ চলার অধিকার যদি আমার থাকে,তাহলে তোমার কর্তব্য হল আমাকে প্রয়োজনমতো পথ ছেড়ে দেওয়া।’এখানে এই পথ ছেড়ে দেওয়ার কর্তব্যটি কে পালন করবে ?অবশ্যই রাষ্ট্র। রাষ্ট্রই পারে মানুষের অধিকার রক্ষা করতে ,তাকে সমতা দিতে।তাই বিশ্ব মানবাধিকার পালনে রাষ্ট্র ও জাতিসংঘের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

লক্ষণীয় বিষয়, এই অতিমারী আক্রান্ত বিশ্বে কিন্তু মানুষে মানুষে প্রভেদ ,অসাম্য ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে।ফলস্বরুপ মানুষের অধিকারও লঙ্ঘিত হচ্ছে নির্বিচারে।অর্থনৈতিকক্ষেত্র হোক বা শিক্ষা অথবা বাকস্বাধীনতা ,সবক্ষেত্রেই মানুষের অধিকার আজ বিশাল বড়ো প্রশ্নচিহ্নের মুখে।এই অবস্থায় ১০ই ডিসেম্বরের গুরুত্ব অপরিসীম।আজো আমাদের সমাজে এমন অনেক মানুষ আছেন,যাদের কাছে ‘অধিকার’ শব্দটি সম্পূর্ন অপরিচিত।তারা শুধুমাত্র নিজ কর্তব্য পালন করতেই অভ্যস্ত,নিজেদের অধিকার,দাবী তাঁদের কাছে কল্পলোকের গল্প।তাই যতদিন বিশ্ব মানবাধিকার দিবস শুধুমাত্র শহুরে মঞ্চের বক্তৃতায় আর সেমিনারে আবদ্ধ থাকবে ,ততদিন তার কার্যকারিতা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যাবে।

সভা-সমিতি,আলাপ-আলোচনার বাইরে গিয়ে, যেদিন আমরা প্রতিটি মানুষকে অধিকার শব্দটির অর্থ বোঝাতে পারব ,তাদের প্রাপ্য অধিকার তাদের হাতে তুলে দিতে পারব সেদিনই এই দিবস পালনের লক্ষ্যপূরন হবে।এরজন্য জাতিসংঘ এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনগুলিকে তো বটেই আমাদের সাধারণ মানুষকেও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে,মনে রাখতে হবে- ‘সকলেই মানুষ ;সকলেই সমান।’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here