কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য – প্রয়াণ দিবসে শ্রদ্ধাঞ্জলি :  দিলীপ রায়।।

0
22

“দৃঢ় সত্যের দিতে হবে খাঁটি দাম,
হে স্বদেশ, ফের সেই কথা জানলাম ।“
সুকান্ত  ভট্টাচার্য

প্রথমেই বলে রাখি, কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যকে বলা হয় গণমানুষের কবি । অসহায়-নিপীড়িত, নির্যাতিত, সর্বহারা মানুষের সুখ, দুঃখ তাঁর কবিতার মূল বিষয়। অবহেলিত মানুষের অধিকার আদায়ের স্বার্থে ধনী-মহাজন অত্যাচারী প্রভুদের বিরূদ্ধে সুকান্ত ভট্টাচার্যের কলম  ছিল সক্রিয় । তাঁর কবিতায় ফুটে উঠেছে  শোষণ-বঞ্চনার বিরূদ্ধে অভিব্যক্তি ।  তিনি চেষ্টা করেছেন কবিতার মাধ্যমে শ্রেণী বৈষম্য দূর করতে । সর্বক্ষণ তাঁর শ্যেন দৃষ্টি  ছিল মানবতার জয়ের দিকে ।  অসুস্থতা এমনকি অর্থাভাব তাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি । তাঁর মানবিক বোধ অবিস্মরণীয়  ।  মানুষের কল্যাণ করা ছিল তাঁর একমাত্র  ধ্যান-জ্ঞান ।  মানবিক চেতনায় উদ্‌বুদ্ধ হয়ে কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য বাংলা কাব্যধারার প্রচলিত প্রেক্ষাপটকে আমূল বদলে দিতে পেরেছিলেন । সেই কারণে আজও  আমাদের কাছে তিনি নমস্য কবি ।
সুকান্ত ভট্টাচার্যের জন্ম  ১৫আগস্ট, ১৯২৬  এবং মৃত্যু  ১৩ মে, ১৯৪৭ । তাঁর মৃত্যু হয়েছিল  ঠিক দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে ।  বাংলা সাহিত্যের নিরিখে তিনি ছিলেন তরুন কবি । তাঁর কবিতার পটভূমি মূলত  মার্কসবাদী ভাবধারার  এবং প্রগতিশীল চেতনার প্রেক্ষাপটে ।
বাবা ছিলেন নিবারন ভট্টাচার্য  এবং মা সুনীতি দেবী । কালীঘাটের  মহিম হালদার স্ট্রিটে মাতামহের বাড়িতে তাঁর জন্ম । তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিল অবিভক্ত  ফরিদপুর জেলার অর্থাৎ  বর্তমান গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়া উপজেলার, উনশিয়া গ্রামে । তিনি স্কুলে পড়ার সময়  ছাত্র আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন ।  আর তা ছাড়া  বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার কারণে  তাঁর  আনুষ্ঠানিক শিক্ষার  পরিসমাপ্তি  ঘটে ।  এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য,  সুকান্তের বাল্যবন্ধু ছিলেন কবি অরুণাচল বসু । তাঁর জীবনে বাল্যবন্ধু অরুণাচল বসুর প্রভাব অবর্ণনীয় ।  অরুণাচল বসুর মা কবি সরলা বসু  ।  তিনি সুকান্ত ভট্টাচার্যকে  পুত্রস্নেহে  ভালবাসতেন । সুকান্ত ছেলেবেলায় মাতৃহারা হলেও  সরলা বসু তাঁকে সেই অভাব কিছুটা পূরণ করে দিয়েছিলেন । কবির জীবনের বেশির ভাগ সময় কেটেছিল কলকাতার বেলেঘাটার ৩৪ হরমোহন ঘোষ লেনের বাড়িতে । সেই বাড়িটি এখনও অক্ষত আছে । শোনা যায়,  পাশের বাড়িটিতে এখনও বসবাস করেন সুকান্তের একমাত্র জীবিত ভাই  বিভাস ভট্টাচার্য।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, তেতাল্লিশের মম্বন্তর, ফ্যাসিবাদী আগ্রাসন, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রভৃতির বিরূদ্ধে  কলম ধরেন । ১৯৪৪ সালে তিনি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন । সেই বছর আকাল নামক একটি সংকলন গ্রন্থ তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়।
আট-নয় বছর বয়স থেকেই সুকান্ত লিখতে শুরু করেন । স্কুলের হাতে লেখা পত্রিকা  “সঞ্চয়ে”  একটি ছোট্ট হাসির গল্প দিয়ে প্রথম আত্মপ্রকাশ ।   তারপর কয়েকদিন পরে তাঁর লেখা বিবেকান্দের জীবনী প্রথম ছাপার মুখ দেখে বিজন গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘শিখা’ কাগজে । মাত্র এগারো বছর বয়সে ‘রাখাল ছেলে’ নামে একটি গীতিনাট্য রচনা করেন । এটি পরে  ‘হরতাল’ বইতে সংকলিত হয় । এখানে জানিয়ে রাখি,  পাঠশালাতে পড়ার সময়ে  ‘ধ্রুব’ নাটকের নাম ভূমিকায়‍  অভিনয় করেছিলেন সুকান্ত ভট্টাচার্য । সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় বাল্য বন্ধু লেখক অরুণাচল বসুর সঙ্গে মিলে আরেকটি হাতে লেখা কাগজ  ‘সপ্তমিকা’  সম্পাদনা করেন । সেই সময় হাতে লেখা দেওয়াল পত্রিকার প্রচলন ছিল চোখে পড়ার মতো । বেশীর ভাগ দেওয়াল পত্রিকা স্টেশনের প্লাটফর্মে সাটানো থাকত, যাতে বেশী মানুষ পড়তে পারেন ।  অরুণাচল বসু তাঁর আমৃত্যু বন্ধু ছিলেন ।
মার্কসবাদী চেতনায় আস্থাশীল কবি হিসেবে সুকান্ত ভট্টাচার্য  কবিতা লিখে বাংলা সাহিত্যে আলাদা জায়গা করে নিয়েছিলেন   । সুকান্ত ভট্টাচার্য  কমিউনিস্ট পার্টির পত্রিকা  “ দৈনিক স্বাধীনতার” (১৯৪৫) ‘কিশোর সভা’ বিভাগ সম্পাদনা করতেন । সুকান্ত ভট্টাচার্যের  কবিতায় অনাচার ও বৈষ্যমের বিরূদ্ধে  প্রতিবাদি কন্ঠস্বর ফুটে ওঠে ।  গণমানুষের প্রতি গভীর মমতা প্রকাশ পেয়েছে  তাঁর প্রত্যেকটি  কবিতায় । তাঁর রচনাবলির মধ্যে বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য:  ছাড়পত্র (১৯৪৭),  পূর্বাভাস (১৯৫০),  মিঠেকড়া (১৯৫১),  অভিযান (১৯৫৩),  ঘুম নেই (১৯৫৪),  হরতাল (১৯৬২),  গীতিগুচ্ছ (১৯৬৫) প্রভৃতি । পরবর্তী কালে উভয় বাংলা থেকে সুকান্ত সমগ্র নামে তাঁর রচনাবলি প্রকাশিত হয় ।
পার্টি ও সংগঠনের কাজে অত্যধিক পরিশ্রমের ফলে দুরারোগ্য ক্ষয়রোগে আক্রান্ত হন  এবং   ১৯৪৭ সালের ১৩ মে কলকাতায় মারা যান । মাত্র একুশ বৎসর বয়সে প্রতিভাধর কবির দেহাবসান ঘটে । স্বল্প বয়সে কবির দেহাবসান  ঘটলেও সামান্য কয়েকবছরে অত্যাশ্চর্য কবিত্ব শক্তির পরিচয় দিয়ে গেছেন যেটা আজও আমাদের মধ্যে অমলিন । (তথ্যসূত্র: সংগৃহীত)
কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের ৭৭তম প্রয়াণ দিবসে আমার শতকোটি প্রণাম ।