আশ্চর্য অলৌকিক লীলায় প্রভুপাদ প্রাণগোপাল গোস্বামী..(৫ম পর্ব) : রাধাবিনোদিনী বিন্তি বণিক।

0
456

(পূর্ব প্রকাশের পর)
……..শনিদেবকে ভক্তিপূর্ণ দন্ডবৎ প্রণাম জানালেন প্রভুপাদ। শনিদেব বললেন,”প্রাণগোপাল, তুমি ইদানীং খুব দুশ্চিন্তাগ্রস্ত থাকো , আমি জানি। তবে তুমি এও জেনো যে তোমার দুশ্চিন্তার কারণ কিন্তু আমিই।”
প্রভুপাদের মনে এক লহমায় ভাবের তরঙ্গ খেলে গেল যে , হ্যাঁ, একথা তো সত্যিই যে তিনি তাঁর অসুস্থ জ্যেষ্ঠা কন্যা গৌরভাবিনীকে নিয়ে মাঝে মধ্যেই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছেন। গৌরভাবিনী প্রাণ যায়-যায় অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে । মাঝে মধ্যেই তার শারীরিক অবনতির সংবাদ আসে নবদ্বীপ থেকে। এদিকে শনিদেব বলতে থাকলেন, “শোন , জানোতো ইক্ষুকে পেষণ করলেই তার মধ্য থেকে সুমিষ্ট রসটা বেড়িয়ে আসে ! তেমন আমিও তোমায় পেষণ করে তোমার থেকে আমার পূজা আদায় করতে চাই। তোমার কন্যার শারীরিক দুর্গতি আমার দৃষ্টিরই ফল। তুমি যদি আমায় পূজা দাও, তোমার ইষ্টদেবের ভোগ আমায় অর্পণ করো ,তবে দেখবে সে সুস্থ হয়ে গেছে । আর , না হলে কিন্তু তার প্রাণসংশয় হবে, এই আমি বলে দিলাম।”
শনিদেবের সাবধানবাণী শুনেও অকুতোভয় প্রভুপাদ বললেন, “কিন্তু, প্রভু আমি তো কেবলমাত্র রাধামাধবের উপাসক। আমি কী করে আপনার পূজা করি!”
শনিদেব বললেন, “তুমি একা নও গো, যুগল উপাসক তো আমরাও। তাই তো তোমার পূজা পাওয়ার অছিলায় তাঁদের প্রসাদ প্রাপ্ত হতে চাই। অধরামৃত আস্বাদ করতে চাই।” প্রভুপাদ কিন্তু তাও মৌন রইলেন । শনিদেব অনুধাবন করলেন , প্রভুপাদের মনের দ্বিধাগ্রস্ততাকে। তিনি আবার বলতে থাকলেন, “আচ্ছা, একটা কথা বলোতো ! উৎসবের প্রসাদ তো দরিদ্র-কাঙালি থেকে শুরু করে পাপী-তাপী সকলকে বিতরণ করো। তার বেলায় কোন সংকোচ নেই ! আর, আমাদের দেবতাদের বেলায় এত কার্পণ্য কেন! কেন এমন দ্বিচারিতা (!)?”
প্রভুপাদ ভেবে দেখলেন , এবার আর পূজায় না করা উচিত হবে না। আর , এই পূজা করলে শ্রীযুগলের চরণে তাঁর ভজন নিষ্ঠার কোন হানি হবার সম্ভবনা একবারেই নেই। তিনি তাই বললেন, “বেশ ,আমি আপনার পূজা করব আজই। কিন্তু, বুঝবো কি করে যে আপনি আমার পূজা গ্রহণ করেছেন ?”
শনিদেব বললেন,”দেখো আমি তো সকলের সামনে প্রকট হতে পারব না ,তবে তোমায় আমি বুঝিয়ে দেব আমি তোমার পূজা অঙ্গীকার করে শ্রীকৃষ্ণপ্রসাদ গ্রহণ করলাম যে সেকথা । আজ পূজার সময় আমার জায়গায় আমার বাহন আসবে প্রসাদ পেতে।”

প্রভুপাদ সেদিনই আদেশ দিয়ে শনি দেবের মূর্তি গড়াতে দিলেন এবং সন্ধ্যায় পূজার ব্যবস্থা করলেন । সকলকে উপস্থিত থাকতে বললেন। স্বয়ং প্রভুপাদ কিনা শনিদেবের পূজা করতে চলেছেন—একথা শুনে সকলে যেন মনে মনে আকাশ থেকে পড়লেন । এদিকে প্রভুপাদও জানতেন যে , সকলে অবাক হবে একথা জেনে । তাই তিনিও আগাম জানিয়ে দিলেন, যে , যাঁরাই উপস্থিত থাকবেন পূজায় ,তাঁরাই সেদিন সন্ধ্যায় শনিদেবকে না দেখতে পেলেও তার বাহনকে দেখতে পাবে। সকলে প্রভুপাদের এই অভিনব বার্তা পেয়ে অনুভব করলেন যে ,এ পূজার তবে নিশ্চিত কোন উদ্দেশ্য আছে।

সন্ধ্যায় পূজা শুরু হল । কুমারটুলি থেকে বিশেষ অর্ডার দিয়ে মূর্তি গড়িয়ে আনা হয়েছে । দিনের দিন মূর্তি তৈরী করে পূজা হচ্ছে বলে , মূর্তি তখনও একটু কাঁচা । উল্লেখ্য যে, সেদিন শনিবারই ছিল বলে প্রভুপাদ আর বিলম্ব না করে সেদিন সন্ধ্যাতেই পূজা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। শনিদেবের পূজা মন্দিরের মধ্যে হয় না। খোলা স্থানে করার নিয়ম । এক্ষেত্রেও সেই বিধিই মানা হল ।

সকলকে আশ্চর্য করে দিয়ে পূজার সময় দেখা গেল কোথা থেকে হাজির হল এক বিশাল আকার শকুন। বিগ্রহের পাশে প্রসাদের থালার সামনে সে এসে বসলো। সকলে ভীষণ হকচকিয়ে গেলেন , এমন হঠাৎ করে শকুনের আগমনে। প্রভুপাদ হাতের ইশারায় সকলকে আশ্বস্ত করলেন। পূজা চলাকালীন সময়ে শকুনটি স্থির ভাবে বসে থাকলো। আর ,পূজার শেষে প্রসাদ মুখে নিয়ে আচমকা উড়ে চলে গেল সকলের দৃষ্টির আড়ালে। শুধু তাই নয় , শকুনটি যেন একদম উবে গেল , উধাও হয়ে গেল হঠাৎ । সকলে প্রভুপাদের ভজন-প্রভাব দেখে আশ্চর্য হয়ে গেলেন। সেদিন থেকে প্রভুপাদ মালায় যত সংখ্যা রেখে জপ করতেন , তার এক গ্রন্থি বেশী করে জপ শুরু করলেন। কারণ , এটা শনিদেবের আদেশ ছিল তাঁর প্রতি। তিনি বলেছিলেন, “আমি হরিনাম খুব ভালোবাসি । তুমি আমার জন্য এক গ্রন্থি নাম বেশী করবে এবার থেকে। ”

শনিদেবের কৃপায় গৌরভাবিনী দেবীর অসুস্থতা দূর হয়ে গেল, তিনি বিপদমুক্ত হলেন। এরপর শ্রীধাম নবদ্বীপে মহাধুমধামে শনিপূজা করে শ্রীশ্রীরাধামদনমোহন দেবের প্রসাদ নিবেদন করা হল তাঁকে । এই ঘটনার দরুণ , সকলের মনে প্রভুপাদের মহিমা সম্পর্কে আরও বিশ্বাস বহুলাংশে বৃদ্ধি পেল । কারণ , যে শনিদেবের প্রকোপ সম্পর্কে সকলে ভীত থাকে, যে শনিদেবকে কিনা সকলেই আলাদা রকম দৃষ্টিতে সমীহ করে, সেই শনিদেব স্বয়ং এসে প্রভুপাদের পূজা যেচে আদায় করলেন ! আবার তাই শুধু নয়, মদনমোহনদেবের প্রসাদ পেতে চাইলেন(!) , নিজের বাহন শকুনকে পর্যন্ত পাঠিয়ে ঘটনার সত্যতার সাক্ষ্য রাখলেন—-এ তো কম কথা নয়! প্রভুপাদের ভজনক্ষমতাই এখানে জাজ্বল্যমান হয়ে আপন পরিচয়ের উন্মেষ ঘটায়। আবার , প্রভুপাদও সকলকে বললেন, “তোমরা দেখলে তো নামের প্রভাব কেমন হতে পারে ! শনিদেবও নাম ভালোবাসেন। নামের গুণে তাই শনিদেবের প্রভাব থেকে তোমরা মুক্ত হতে পারবে। তোমাদের সকল প্রকার অনর্থাদি দূরীভূত হবে নামের গুণেই। তাই তোমরা নাম কর যত পার ।”

তবে হ্যাঁ ,নানান অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও , প্রভুপাদ কিন্তু কখনো নিজেকে ভগবান বা ভগবানের অবতার বলে প্রচার করেননি। আমি বলতে চাইছি, পাঠকমহোদয়গণ , আপনারা লক্ষ্য করে দেখবেন যে , আধ্যাত্মিক পথে এমন অনেকজনই আছেন , যাঁরা নিজেদের তথাকথিত ভগবান বা ভগবানের অবতার বলে প্রচার পেয়ে বেশ সুখী হন। বলা ভালো আমাদেরই করা প্রশস্তিকে তাঁরা মেনে নেন , বা , ব্যাপারটাকে বেশ উপভোগ করতে থাকেন। কিন্তু, প্রভুপাদ প্রাণগোপাল গোস্বামী কখনো এসবে সায় দেন নি। তিরস্কার করে এধরণের প্রচার যাতে না হয় , তার ব্যবস্থা করেছেন। আসলে তাঁর জীবনে এমন-এমন অলৌকিক ঘটনা ঘটেছে যে ভক্তরা বিস্মিত হয়ে বলেছেন যে , তাঁর মধ্যে ভগবানের অবতারত্ব বিরাজ করছে । আর , প্রভুপাদ ততোধিক ক্রোধ করে বলেছেন যে , “সাবধান! একদম আমায় ভগবান বলতে আসবে না। জীব জীব হয় , আর , ভগবান ভগবানই। যদি ভুলেও আমায় ভগবান বলতে আসো , তবে নির্বংশ হবে এই আমি বলে দিলাম।” আসুন , সেই ঘটনাই এবার জানি আমরা।
বাংলাদেশের কুমিল্লা জেলা । প্রভুপাদ চলেছেন তাঁর এক শিষ্যবাড়ি। সে শিষ্য প্রতন্ত গ্রামের মধ্যে থাকে । কাঁচা পথে হাঁটা প্রায় দু’মাইল । দরিদ্র ভক্তটির আর্তি ভরা আমন্ত্রণ প্রভুপাদ উপেক্ষা করতে পারেননি। এখন ঘটনা হচ্ছে যে , তিনি যেখানেই যান, তাঁর সঙ্গে যান তাঁর বহু শিষ্যেরা । এবারেও তার ব্যতিক্রম হল না। প্রভুপাদ শিষ্যের অর্থনৈতিক অস্বচ্ছলতার কথা জানতেন বলে নিজে থেকেই ভক্তদের রসদের ব্যবস্থা করে নিয়ে যাচ্ছিলেন। গ্রীষ্মকাল তখন, প্রচন্ড দাবদাহ চলছে। হাঁটতে হাঁটতে ভক্তরা তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়লেন। প্রভুপাদ অনুভব করলেন শিষ্যদের কষ্ট । তিনি হঠাৎ বলে উঠলেন, “শোন তোমরা ,ওই যে বাঁশঝাড় দেখতে পাচ্ছো, ওখানে একটা ডোবা আছে ছোট , যাও গিয়ে সকলে জল পান করো গে ওখান থেকে।” কয়েকজন বেশ ছুটেই গেলেন । বাকি সকলে পিছু পিছু। কিন্তু, এ কী , এ যে পচা ডোবা! বাঁশ পাতা ও অন্যান্য পাতা পড়ে পচে ভরে আছে । ওই জল কী পান করা যায় নাকি! তাঁরা মন খারাপের সুরে বললেন সেখান থেকেই,”না প্রভু , পচা ডোবা! জল উপযুক্ত নয় পানের। হায়! দেখে তো আরও তৃষ্ণা বেড়ে গেল, প্রভু! ” প্রভুপাদ সেকথা শুনে নিজেই এলেন ডোবার ধারে। তিনি হঠাৎ ডোবার পাড়ের একটু উঁচু স্থানে বসে পড়লেন ।নামের মালা জপ করতে থাকলেন একই রকম ভাবে, যেমন হাতে নিয়ে করেন সর্বক্ষণ তেমন । আর বললেন, “ও্গো , আমি যে বললাম এই ডোবার জল পান করতে , করবে না তোমরা! বিশ্বাস নেই গুরুবাক্যে তোমাদের !” এমন কথা নিজ গুরুদেবের শ্রীমুখে শুনে এক নিষ্ঠাবান ভক্ত এগিয়ে এসে অঞ্জলি ভরে সেই পচা ডোবার দুর্গন্ধময় জলই উঠিয়ে নিয়ে মুখ লাগিয়ে পান করলেন। আর , পান করার সাথে সাথে তাঁর মন দিব্যানন্দে ভরে গেল । তিনি পরম প্রশান্তি ভরে “অমৃত , অমৃত” বলে উঠলেন। তাঁর দেখাদেখি অপর এক ভক্তও সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে এসে জল পান করলেন আর একই কথা বলে উঠলেন। প্রভুপাদ এদিকে মৃদু মৃদু হেসে তাঁদের দিকে চেয়ে । অপর ভক্তদের ততক্ষণে বুঝে নিতে অসুবিধা হল না যে, কিছু একটা অলৌকিক ঘটনা ঘটে গেছে ! সকলে এসে ডোবার জল হাতে করে উঠিয়ে পান করতে থাকলেন আর সুমিষ্ট ,শীতল জলে তৃষ্ণানিবারণের পরিতৃপ্তিতে ভরে যেতে থাকলেন। সেই গ্রামের মানুষদের মধ্যে সে খবর দখিনা বাতাসের মতই ছড়িয়ে গেল। সকলে এসে পান করতে থাকলেন , আর প্রভুপাদের গুণগান গাইতে থাকলেন। প্রভুপাদের ইচ্ছাশক্তির গুণেই যে এতবড় অলৌকিক ঘটনা ঘটে গেছে তা আর বলার অপেক্ষা রইলো না কারোকে।

সকলে নানান স্তুতি করেন । তবে ,প্রভুপাদ এসব নিয়ে নির্বিকার থাকেন । তাঁর এসবে কোন মাথাব্যথা বা আগ্রহ-আতিশয্য কিছুই নেই। কিন্তু, বিকার এল তখনই যখন এক ভক্ত হঠাৎ বলে বসলেন তাঁর সামনে তাঁর কাছেই—“প্রভু , আপনিই সাক্ষাৎ ভগবান। ভগবান তো দেখি নাই। এই আপনাতেই দর্শন হল। ভগবান না হলে কী এমন ক্ষমতা কোন মানুষে ধরে !” ব্যস্ শোনা মাত্র প্রভুপাদ প্রাণগোপাল গোস্বামীজী তীব্র হুঙ্কার করে বলে উঠলেন যে, তিনি ভগবান নন্। ভগবান ভগবানই হন। জীব হল জীবই। আর এও হুঁশিয়ারি দিয়ে দিলেন ভবিষ্যতে তাঁকে ভগবান বানাবার চেষ্টা করলে কিন্তু নির্বংশ হয়ে যাবে।

আমার ব্যক্তিগত ভাবে মনে হয় , প্রভুপাদ প্রাণগোপাল গোস্বামী প্রদত্ত এ এক চরম শিক্ষা আমাদের মত সাধারণ মানুষদের কাছে যেমন , তেমন আবার ভক্তিপথে প্রভুপাদ স্থানীয় যাঁরা আছেন , তাঁদের প্রত্যেকের কাছেও এ এক শিক্ষা , যাতে তাঁরা নিজেদেরকে ভগবান ভেবে না বসেন কোনভাবেই।

………..(ক্রমশঃ)

ভক্ত-কৃপাপ্রার্থিনী
রাধাবিনোদিনী বিন্তি বণিক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here