অন্তরালে (ধারাবাহিক গোয়েন্দা গল্প, অষ্টম পর্ব) : রুমা ব্যানার্জী।

0
340

রাতে বিছানায় শুয়ে,ছাদের দিকে তাকিয়ে ভাবছিল সুরুচি।ময়নাতদন্তে জানা গেছে,অতিরিক্ত ঘুমের ওষুধ প্রয়োগের কারনে মৃত্যু হয়েছে অমিতবাবুর।ওষুধের নামটাও জানা গেছে,বেশ কড়া ডোজের ওষুধ।আসলে সন্ধের পর থেকে অনেক কিছুই ঘটে গেছে ,যার জন্য হয়তো সুরুচিও ঠিক প্রস্তত ছিলনা মনে মনে।

অহনাদির চোখ দুটো এখনো ভাসছে ওর চোখের সামনে।এখানে আসার আগেই ও অনলকে জানিয়ে এসেছিল।অনল ওর বন্ধু।আগেও ওর অনেক কেসে ওকে সাহায্য করেছে।ও লালবাজারে বেশ উঁচু পোস্টেই কাজ করে।ও এখানের থানায় ফোন করে দিলেই ওর আর পুলিশের কাছে নিজের পরিচয় গোপন করার কোন প্রয়োজন হতো না।কিন্তু ইচ্ছা করেই ও এই ব্যাপারে অনলকে কিছু বলেনি।ভেবেছিল সেরকম হলে পরে দেখা যাবে।আজ বিনয়বাবুই ওকে সন্ধেবেলা ফোন করে খবর দেন যে,পুলিশ অমিতবাবুর ময়না তদন্তের রিপোর্ট ওনাকে ফোন করে জানিয়েছে, সেই সঙ্গে আরো জানিয়েছে যে আর কিছুক্ষনের মধ্যেই ওনারা রিসর্টে আসছেন অহনাদেবীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য।

তার কিছুক্ষনের মধ্যেই ওসি সাহেব স্বয়ং এসে পৌঁছেছিলেন।না খুব বেশি জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন হয়নি,অহনাদি স্বীকার করেছিল,ঘুমের ওষুধটা ওরই ছিল।অমিতবাবুর কোন ঘুমের ওষুধের প্রয়োজন হতোনা।আর তারপরেই পুলিশ গ্রেপ্তার করেছিল অহনাদিকে।সেই সময়ের অহনাদির অসহায় চেহারা,বারবার পুলিশের কাছে কাকুতিমিনতি খুবই অস্বস্তিতে ফেলে দিয়েছিল সুরুচিকে।মনে মনে খুব অবাক হয়েছিল ও,শুধুমাত্র এই কারনের জন্য কী একজনকে গ্রেপ্তার করা যায়? ঘুমের ওষুধটা অহনাদি ব্যবহার করে বলেই যে সেই তার বরকে তা দিয়েছে,তা কী হতে পারে? যে খুন করবে সে কী এতো বোকামি করবে ? আর তাছাড়া অমিতবাবু নিজেই যে ঘুমের ওষুধ তার ড্রিঙ্কের মধ্যে মিশিয়ে নেননি তারই বা কী প্রমান আছে? হতেই পারে এটা আত্মহত্যার ঘটনা।পুলিশ এতো তাড়াহুড়োই বা করছে কেন?

না।কিছুতেই যেন হিসেবগুলো মিলছে না সুরুচির।
অহনাদি।অহনাদি খুন করতে পারে তার বরকে ?সেই অহনাদি,যে ওদের সঙ্গে গান গাইতো,মজা করতো,পেয়ারা পেড়ে দিতো,তাকে যেন খুনি হিসাবে কিছুতেই মানতে পারে না সুরুচি।আবার এটাও তো সত্যি ,এই অহনাদির জন্যই হয়তো একটা পরিবার শেষ হয়ে গিয়েছিল,একটা জলজ্যান্ত মানুষ নিজেকে শেষ করে দিয়েছিল,কত মন টুকরো টুকরো হয়ে গিয়েছিল,কই তার কোন প্রভাব তো অহনাদির জীবনে পড়েনি।সে তো দিব্যি সুখেই ছিল এতগুলো বছর ।কিন্তু সত্যিই কী সুখে ছিল? যদি তাই হবে তাহলে আজকের দিনটা এলো কেন?হয়তো পুলিশ যা ভাবছে সেটাই ঠিক,সুরুচির ছোটবেলার দেখা সেই মেয়েটা তো কবেই হারিয়ে গেছে।

আজ আর ঘুম আসবে না।সুরুচি বিছানা ছেড়ে ঘরের দরজা খুলে বাইরে এলো।রিসর্টটা খুব সুন্দর লাগছে দেখতে।আজ নাকি একটা বড়ো বুকিং ছিল কিন্তু পুলিশের আদেশে ক্যানসেল করা হয়েছে।তাই চারিপাশ শুনশান।বেশ ভালো হাওয়া দিচ্ছে,ঠান্ডা হাওয়া।বারান্দার চেয়ারটা টেনে ও বসে পড়লো।কালকেই ও কোলকাতা ফিরে যাবে।এই কেসটা ও আর ঘাঁটবে না।অহনাদি যদি তার স্বামীর খুনি নাও হয়ে থাকে তবেও ওর শাস্তি পাওয়ায় এমন কিছু অন্যায় হবে না কারন অনেকদিন আগেই হয়তো ওর এই শাস্তিটা পাওয়া উচিত ছিল।হাওয়ায় বসে কখন যে চোখে ঘুম এসে গিয়েছিল সুরুচির খেয়াল নেই কিন্তু একটা গাড়ীর আওয়াজে ওর ঘুম ভেঙে গেলো।রিসর্টের একদম ভিতরে এসে দাঁড়ালো গাড়িটা।আর সঙ্গে সঙ্গেই কোথা থেকে যেন ছুটে এলো তাজু,টগরের বর,এই রিসর্টেরই কর্মী।নড়েচড়ে বসে সুরুচি দেখলো একটা ছোট্ট ব্যাগ হাতে একটি লোক গাড়ী থেকে নামতেই,তাজু তার হাত থেকে ব্যাগটা নিয়ে হাসলো একমুখ,লোকটিও কোনদিকে না তাকিয়েই গটগট করে হেঁটে চলে গেলো,ম্যানেজারের রুমের দিকে।আচ্ছা এই লোকটিই কি নতুন ম্যানেজার,যার জ্বর আসায় বাড়ী চলে যায়,যদি তাই হয়,তাহলে অসুস্থ শরীরে এতো রাতে কেন ফিরলেন? আর চলার ভঙ্গিমায় অসুস্থতার কোন লক্ষন দেখা গেলো না যদিও,তাহলে কী অন্য কেউ ? যেই হোক।সে যে এই রিসর্টে বেশ পরিচিত তা ভালোই বোঝা যাচ্ছে।এখন অবশ্য এ সসম্পর্কে জানার কন উপায় নেই ,তাই কাল সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতেই হবে।
ক্রমশ…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here