আনাড়ি মহিলার উচ্ছৃঙ্খলতা (ধারাবাহিক উপন্যাস, অষ্টম পর্ব) : দিলীপ রায় (+৯১ ৯৪৩৩৪৬২৮৫৪)।

0
414

তারপর ইতাস সিদ্ধান্ত নিলো, হকারির ব্যবসা ছেড়ে দেবে ।
গদাইয়ের চায়ের দোকানের বেচা-কেনা দেখে ইতাস অনুপ্রাণিত । গদাইয়ের দোকানে নিয়মিত যাতায়াতের জন্য চা বানানো থেকে খরিদ্দারের আনাগোনা, খরিদ্দারদের ব্যবহারিক চরিত্র, এলাকার মানুষের চা খাওয়ার রেওয়াজ, ইত্যাদি ইতাসের মোটামুটি রপ্ত । ফলে চায়ের দোকান খোলার সিদ্ধান্তে ইতাস মানসিকভাবে দৃঢ়বদ্ধ ।
ইতাস মনস্থির করলো রাস্তার পাশে অস্থায়ী ঘুপচি ঘর বানিয়ে চায়ের দোকান খোলার । কুসুমগ্রাম বাস স্ট্যান্ডে ঢোকার মুখে পরপর চারটি খাবারের দোকানে । প্রথমে পাঁউরুটি ঘুগনির দোকান । পরেরটা মুড়ি-খই-বাতাসার দোকান, তারপরেরটা ফলের দোকান । চার নম্বর দোকানটা কুলফি-মালাই-আইসক্রিমের দোকান । পাঁচ নম্বরে ফাঁকা জায়গায় চায়ের দোকান খুলবে ইতাস ।
প্রথমদিন প্রচন্ড ঝামেলা । দোকানের বাঁশ খুটি কিছুতেই বাঁধতে দিলেন না পাশাপাশি দোকানদারেরা । চায়ের দোকান খোলায় তাঁদের আপত্তি । কিন্তু ইতাস নাছোড়বান্দা । তাকে দোকান ঘর খুলতেই হবে । যেভাবে হোক স্বল্প পরিসরে ঘুপচির মতো ঘর বানিয়ে চায়ের দোকান চালু করা । ইতাস চায়ের দোকান চালু করতে পারলে, খরিদ্দার জোগাড় করা তার পক্ষে কষ্টসাধ্য হবে না । তার আত্মবিশ্বাস ষোলোআনা ।
আশপাশের দোকানদারদের বক্তব্য, বাস স্ট্যান্ড চত্বরে গদাইয়ের দোকান নিয়ে ছোট-বড় আটটা চায়ের দোকান । সুতরাং এইটুকু জায়গার মধ্যে আটটা এবং ইতাসের চায়ের দোকান ধরলে মোট নয়টা চায়ের দোকান । সুতরাং নয়টা চায়ের দোকান চলবে কিনা সন্দেহ ! অন্যান্য দোকানগুলি চালু রাখার কথা ভেবে ইতাসের চায়ের দোকান খোলা চলবে না । অবস্থা বেগতিক ভেবে ইতাস ও ইমলি আশে পাশের দোকানদের গদাইয়ের চায়ের দোকানে মিটিংয়ে ডাকলো । তাঁদের গদাই বোঝালো, “যেখানে আটটা চায়ের দোকান চলছে সেখানে অতিরিক্ত একটা দোকান চালু হলে বিক্রি-বাট্টায় ভাটা পড়বে না । তাছাড়া অন্য আটটি চায়ের দোকান দীর্ঘদিনের । তাঁদের খরিদ্দার নির্দ্দিষ্ট । সেখানে ইতাসদার মতো লোকের পক্ষে চায়ের দোকানে খরিদ্দার জোগাড় করা ভীষণ কষ্টসাধ্য । সুতরাং আপনারা ইতাসদার চায়ের দোকান খুলতে বাধা দেবেন না । সৎভাবে বেঁচে থাকতে গেলে উপার্জন দরকার । হকারি ছাড়া তার উপার্জনের বিকল্প পথ নেই । বড় ব্যবসা আরম্ভ করতে গেলে পুঁজির দরকার । ইতাসদার জমানো টাকাকড়ি বা সম্বল বলতে কিছুই নেই । চায়ের দোকান খোলার ক্ষেত্রে সামান্য কিছু পুঁজি হলেই যথেষ্ট । গত কয়েক মাস বাসে ঘুরে ঘুরে হকারির ব্যবসায় কিছুটা সঞ্চয় হয়েছে । সেটা দিয়ে রাস্তার উপর চায়ের দোকান খোলার ইচ্ছা । শারীরিকভাবে অনেকটাই দুর্বল । যার জন্য ঘুরে ঘুরে হকারি চালানো তার পক্ষে প্রচন্ড ধকল । আপনারা ইতাসদাকে সহযোগিতা না করলে বেচারা কীভাবে বাঁচবে । আপনাদের কাছে অনুরোধ, চায়ের দোকান খুলতে বাধা দিয়ে ইতাসদার পরিবারকে ভুখা রাখবেন না । পেটের জ্বলা বড় জ্বালা । সুতরাং তাকে সৎভাবে বাঁচতে সহযোগিতা করুন । নিশ্চয় আমি ইতাসদার বর্তমান পরিস্থিতি আপনাদের বোঝাতে পারলাম” ।
উপস্থিত ব্যবসায়ীরা তবুও গররাজী ।
শেষে গদাইয়ের পরামর্শে ইতাস কুসুমগ্রাম বাজার কমিটির শরণাপন্ন হল । বাজার কমিটির হস্তক্ষেপে ব্যাপারটার সুরাহা ঘটলো । বাজার কমিটির মতে, “সরকারি জায়গায় বিনা অনুমতিতে দোকান খোলাটা অন্যায় । তার উপর দোকানের স্থায়ীত্ব ধোঁয়াশাচ্ছন্ন । যে কোনো মুহূর্তে সরকারি কর্তাব্যক্তিরা অস্থায়ী দোকানগুলি ভেঙ্গে দিতে পারে । সেই সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার ক্ষমতা কারও নেই । সুতরাং খুপচি ঘরে চায়ের দোকান খুলে ইতাসের ব্যবসা করাটা হকারি ব্যবসার সামিল । ইতাসের দোকান খুলতে কারও বাধা দেওয়া উচিত নয় । পুলিশি ঝঞ্ঝাটে গেলে অস্থায়ী সমস্ত ব্যবসায়ীদের ভিত নড়ে যাবে । তখন হিতে বিপরীত ঘটতে বাধ্য । সেই কারণে বাজার কমিটির মতে, ইতাসের চায়ের দোকান খোলাতে কারও আপত্তি থাকাটা বাঞ্ছনীয় নয়” ।
বাজার কমিটির মধ্যস্থতায় ইতাসের দোকান খোলার সমস্যা মিটলো ।
বাস স্ট্যান্ডে খুপচি ঘর তুলে অস্থায়ীভাবে ইতাসের চায়ের দোকান শুরু । খুপচি ঘর জায়গা দখলের নামান্তর । দোকানের কাজকর্ম সমস্তটাই ঘরের বাইরে । ছোট একটা টেবিল । তাতে তিনটি বিস্কুটের বয়ম । একটিতে থিন বিস্কুট, অন্যটাতে নোনতা বিস্কুট এবং তৃতীয়টাতে স্থানীয় বেকারির লেরুয়া বিস্কুট । লেরুয়া বিস্কুট বিভিন্ন ধরনের হয় । তবে কুসুমগ্রাম অঞ্চলের মানুষের কাছে রোগা-লম্বাটে লেরুয়া বিস্কুট খুব জনপ্রিয় । টেবিলের পাশে ইট দিয়ে তৈরী কয়লার উনুন । উনুনের পাশে বড় একটা ডেকচি । তাতে গরুর দুধ রাখা । প্যাকেটের দুধের চেয়ে খরিদ্দারদের গরুর দুধের চা বেশী পছন্দের । তবে প্যাকেটের দুধ ক্রমশ বাজারে ঢুকছে, কিন্তু গুঁড়ো পাউডার দুধের প্যাকেট বাজারে যথারিতি রয়েছে । খরিদ্দারদের পছন্দ সেই গরুর দুধ । যার জন্য খরিদ্দারদের মনমতো চা বানাতে ইতাসের বেশীমাত্রায় ধ্যান । কেননা গরুর দুধ দিয়ে তৈরী চা রুচিসম্মত করা ঝকমারি । সেই ক্ষেত্রে নিজস্ব চিন্তা ভাবনার প্রয়োগ জরুরি । চায়ের কেটলি উনুনে বসানো । জল গরম হচ্ছে । আর একটা বড় কৌটায় চিনি রাখা । চিনির কৌটার মধ্যে একটা অ্যালুমিনিয়ামের চামচ রাখা । দুটো বয়মে দুই রকম চা । একটাতে চা-পাতা, অন্যটাতে সি-টি-সি চা অর্থাৎ গুঁড়ো চা । মাটির ভাঁড়ে চা খেতে স্থানীয় খরিদ্দারেরা অভ্যস্ত । টেবিলের নীচে ঝুড়িতে মাটির চায়ের ভাঁড় রাখা । দোকানের সামনে দুটো বেঞ্চ । খরিদ্দারেরা চায়ের অর্ডার দিয়ে বেঞ্চে গিয়ে বসেন । বেঞ্চের উপর বাংলা খবরের কাগজ রাখা । কিছু মানুষের চা খাওয়ার আগে খবরের কাগজের উপর চোখ বোলানো চিরাচরিত অভ্যাস ।
ইতাসের ব্যবহার আর পাঁচটা ব্যবসায়ীর মতো নয় । নিজস্ব ঢঙে খরিদ্দারদের সাথে মেলামেশা । তাঁদের সাথে ইতাসের ব্যবহার ভীষণ আন্তরিক । আপন মানুষজনের সাথে তার যেমন আন্তরিক ব্যবহার, সেইরকম আন্তরিকতা খরিদ্দারদের সাথে । মিষ্টি ব্যবহারের জন্যে এবং চায়ের গুণমান ইতিবাচক রাখার জন্যে অচিরে তার চায়ের দোকানের জনপ্রিয়তা তুঙ্গে । তাছাড়া হকারি করার ফলে, কিছু নিত্য যাত্রীদের সাথে ইতাসের ভাব ভালবাসা । বাসের ড্রাইভার, খালাসি, কন্ট্রাক্টর, চেনা থাকায় তাঁদের ইতাসের চায়ের দোকানে চা খাওয়ার জটলা । বাজারের রাস্তাঘাটে ঝাঁট দেওয়ার ঝাড়ুদারেরা ইতাসের চায়ের দোকানের নিয়মিত খরিদ্দার । অন্যদিকে লুঙ্গি-পাঞ্জাবী পরে বাজার করতে আসা কুসুমগ্রামের মানুষ প্রথমে ইতাসের দোকানে ঢোকেন । সেখান থেকে মাটির ভাঁড়ে এক কাপ চা খেয়ে তারপর বাজার সারেন । তাঁদের মাছের বাজারে বেশী দেরী । কেননা মাছ কাটতে মাছের ব্যবসায়ীরা প্রচন্ড সময় লাগায় । ছোট মৌরলা মাছ হলে মাছ কাটা ভীষণ কষ্টসাধ্য । সেই কারণে এক কাপ চা খেয়ে বাজারে ঢোকা । বাসের প্যাসেঞ্জারদের নির্দ্দিষ্ট বাস দেরীতে ঢুকলে ফাঁকা সময়ে ইতাসের দোকানে তাঁদের চা খেতে আনাগোনা ।
ইতাসের চা তৈরীর আর একটা বৈশিষ্ট্য, খরিদ্দারদের অর্ডার পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চা তৈরী । চা বানিয়ে কেটলিতে রাখা তার নীতি বিরূদ্ধ । বানানো চা বারংবার ফুটিয়ে খরিদ্দারদের খাওয়ানো তার আগাগোড়া না-পসন্দ । চা তৈরীর জন্য হ্যান্ডেলওয়ালা ছোট ডেকচির মতো পাত্র, সেটা উনুনে বসিয়ে তাতে কেটলিতে ফোটানো গরম জল, চিনি, চা, বড় ডেকচি থেকে পরিমান মতো জ্বাল দেওয়া গরম দুধ, একত্রে মিশিয়ে এত সুন্দরভাবে চা বানাবে যেটা খেলে খরিদ্দারের তুষ্টি ষোলোআনা । অনেক সময় জল, দুধ, চিনি, চা, এলাচের খোসা, লেবু পাতা, দারচিনি, আদা, ইত্যাদি মিশিয়ে খরিদ্দারদের চা পরিবেশন করে ইতাস । সেই চা খাওয়ার পর খরিদ্দারেরা দ্বিতীয়বার চা খাওয়ার জন্য ইতাসের দোকান খোঁজেন । এছাড়া আদা চা, তুলসী পাতা চা, খরিদ্দারদের অর্ডার মতো হরদম বানাতে হয় । ইতাস খরিদ্দারদের চা খাওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে চায়ের গুণগত মান ঠিক রাখে । চা বানাতে ইতাসের হাত যথেষ্ট পরিপক্ক । যার জন্য খরিদ্দারেরা ইতাসের চায়ের দোকানে চা খেতে ছোটেন । কয়েক মাসের মধ্যে ইতাসের চায়ের দোকান বাস স্ট্যান্ডে জনপ্রিয় হয়ে উঠলো ।
অন্যদিকে ইমলি ব্যাঙ্কের ক্যান্টিনে রান্না করার জন্য অল্প কিছু মাসোহারা পাচ্ছে । আর ইতাস চায়ের দোকান চালিয়ে দু-পয়সা আয়ের মুখ দেখছে । ফলে দুইজনের আয়ে তাদের সংসার ক্রমশ স্বচ্ছলতার দিকে ।
ঝাড়ুদার পদ থেকে সোরেন বাবু ব্যাঙ্কের নিয়মমতো ৬০বছর বয়সে অবসর গ্রহণ করলেন । তার অবসর নেওয়ার পর ঝাড়ুদার পোস্ট ফাঁকা ।
ম্যানেজার বাবু ইমলিকে ডাকলেন ।
তিনি ইমলি ম্যাডামকে বললেন, “পার্ট টাইম ঝাড়ুদার নিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যাঙ্কের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ব্রাঞ্চ ম্যানেজারকে পাওয়ার দিয়েছেন । নিয়ম মেনে আমরা আপনাকে ঝাড়ুদার পোস্টে নিয়োগ করতে চাই । আপনার আপত্তি না থাকলে আপনি সত্বর লিখিত আবেদন করুন । তারপর আপনার লিখিত আবেদনের উপর ভিত্তি করে নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হবে” । পরক্ষণেই ইমলি ম্যাডামের দিকে তাকিয়ে বললেন, “ব্যাপারটা আমি কি আপনাকে বোঝাতে পারলাম” ?
হ্যাঁ স্যার । আপনার অশেষ করুণা ! নতুবা এইরূপ সুযোগ পাওয়া ভাগ্যের দরকার !
রিতম বাবু বললেন, “আমি আপনার শিক্ষা-দীক্ষার একটুখানি মর্যাদা দেওয়ার চেষ্টা করছি” । তিনি আরও বললেন, “ ঐদেশে থাকলে আপনি আপনার শিক্ষার যথেষ্ট মর্যাদা পেতেন । কিন্তু এদেশে আপনাদের শিক্ষাগত যোগ্যতার কোনো দাম নেই । পরবর্তী সময়ে সুযোগ পেলে, আপনি প্রাইভেটে অন্তত মাধ্যমিক ডিগ্রিটা নিয়ে রাখবেন । শোনা যাচ্ছে, সমস্ত পার্ট টাইম ঝাড়ুদারদের ফুল টাইম করা হবে । এই দাবীটা স্বয়ং সাফাইকর্মচারীর জাতীয় কমিশন তুলেছে । যার জন্য সমস্ত রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাঙ্ক ঝাড়ুদারদের সর্বক্ষণের কর্মী হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া ইতিমধ্যে শুরু করে দিয়েছে । গ্রামীণ ব্যাঙ্কের বোর্ডে এখনও এই বিষয়টা উত্থাপন হয়নি । যদি কখনও ফুল টাইম স্যুঈপার হন, তখন আপনার প্রমোশনের সুযোগ আসবে । সেই সময়ের কথা ভেবে একটা পাশ দরকার । ভবিষ্যতের কথা ভেবে আপনাকে বলা, কোনো হাই স্কুলের পরামর্শ নিয়ে কীভাবে মাধ্যমিক পরীক্ষায় বসা যায় সেই ব্যাপারে সচেষ্ট হওয়া ।
ঠিক আছে স্যার । আপনার কথা আমার মনে থাকবে ।
সোরেনের অবসর নেওয়ার দুদিন পরেই ইমলি একটা সাদা কাগজে ঝাড়ুদার পোস্টের জন্য আবেদন জানিয়ে রাখলো । যদিও নিয়োগের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে দুই-তিন মাস সময় লাগবে । এই গ্যাপ পিরিয়ডে ইমলি বদলী ঝাড়ুদার হিসাবে কাজ চালিয়ে যাবে । বদলী ঝাড়ুদার হিসাবে ব্রাঞ্চের ম্যানেজার বাবু ইমলিকে একটি চিঠি দিলেন ।
ইমলির এখন দুটো দায়িত্ব । পার্ট টাইম স্যুঈপারের কাজ ও ক্যান্টিনে রান্নার কাজ । দুটো দায়িত্ব সামলাতে ইমলির হিমশিম অবস্থা । পরিশ্রমে ইমলির কষ্ট নেই । তার সবচেয়ে বড় আনন্দ, ব্যাঙ্ক তাকে যথাযথ মর্যদা দিয়েছে । ব্রাঞ্চ কর্তৃপক্ষ তাকে অফিসিয়াল প্যাডে বদলী ঝাড়ুদার হিসাবে চিঠি দিয়েছে । ইমলি খুব উৎফুল্ল, কেননা এই দেশে নিজেদের অনুকূলে অন্তত একটা সরকারি সিলমোহর জুটেছে । চিঠিটাতে অ্যাড্রেস করা হয়েছে, প্রথমে ইমলি তারপর প্রযত্নে ইতাস । সুতরাং চিঠিটা ভারতের মতো বিশাল দেশের মানুষ হিসাবে স্বীকৃতি ।
ইমলিকে খুব ভোরে উঠতে হচ্ছে । বাইরের উঠোন, বারান্দা, সাইকেল স্ট্যান্ড ঝাঁট দিয়ে তাকে ছুটতে হয় বাজারে । ব্যাঙ্কের বাবুদের রান্নার রসনায় তৃপ্ত করার জন্য ভেবেচিন্তে ইমলিকে বাজার করতে হয় । নিত্য এক ধরনের রান্না ইমলির ধাঁচে নেই । নিত্য নতুন স্বাদে রান্নায় সে সাবলিল । ইমলি ব্রাঞ্চের স্টাফদের খাওয়ার রুচি সম্বন্ধে এখন সম্পূর্ণভাবে ওয়াকিবহাল । যার জন্য সবার কথা ভেবে বাজার করা, মাছ কেনা । সপ্তাহে একদিন মাংস এবং একদিন ডিম । তবে দেশী মুরগির মাংস বাবুদের পছন্দ, অন্যদিকে দেশী হাসের ডিমের ঝোল পছন্দ । অন্যান্যদিন মাছ অবশ্যাম্ভাবী । বাজারে বিভিন্ন রকমের মাছের প্রাচুর্য দেখে ইমলি খুশী । যার জন্য মাছ বাছাইতে বেশী ভুগতে হয় না । পুকুরের মাছের প্রাচুর্যতা বাজারে চোখে পড়ার মতো । কারণ কাছাকাছি নদী নেই । সেই কাটোয়ার কাছে ভাগীরথী গঙ্গা, অন্যদিকে বর্দ্ধমানের কাছে দামোদর । বর্দ্ধমানের ব্যাপারে কথিত আছে, বর্দ্ধমানের পূবে “দামোদর”, পশ্চিমে “অজয়” এবং উত্তরে “বরাকর” নদী । বর্দ্ধমান শহর তিনটি নদী দিয়ে ঘেরা । কিন্তু কুসুমগ্রামের সন্নিকট গ্রামগুলিতে বড় বড় ঘাটবাঁধানো পুকুর । পুকুরে অবশ্য মাছের চাষ জনপ্রিয় । পুকুরে বিভিন্ন ধরনের মাছ চাষ শোনা যায় । বাসের যোগাযোগের ব্যবস্থা ভাল থাকার জন্য অজয় ও দামোদর নদীতে ধরা মাছও বাজারে ওঠে । ঠিক আটটার মধ্যে বাজার থেকে ইমলিকে ফেরা চাই । তারপর ব্যাঙ্কের দরজা খুলে শুরু সাফাই অভিযান । মাছগুলি ও বাজারের ব্যাগ ক্যান্টিন রুমে রেখে ঝাঁট দেওয়া শুরু । মেঝেতে প্রথমে ঝাঁট, তারপর বালতি ভরে জল নিয়ে ছেঁড়া কাপড় দিয়ে ঘর মোছা । তার ঘর মোছাতেই কষ্ট । বাড়িতে কোনোদিন ঘর মোছেনি । তার উপর ইমলি এখন পোয়াতি । খুব সাবধানে তাকে উপুর হয়ে ঘর মোছার কাজ করতে হচ্ছে । প্রত্যেকটা চেয়ার টেবিল ঝাড়ু দিয়ে ঝাঁট দেওয়ার পর ভিজে ন্যাকরা দিয়ে মোছা । ঝাঁট দেওয়া আবর্জনাগুলি ইমলি একটি নির্দ্দিষ্ট জায়গায় রাখে । ইতাস ঘরে ঢুকলে সেই আবর্জনা ডাস্টবিনে অর্থাৎ নোংরা ফেলার জায়গায় ফেলে দিয়ে আসে । ঘর-দোর পরিষ্কার হয়ে গেলে বাথ রুম । পায়খানার প্যান ঠিকভাবে ধোওয়া । বেসিন পরিষ্কার করা । গোটা বাথ রুম জল দিয়ে ধোওয়া । সোজা কথা বাথ রুম ঝা চকচকে না থাকলে ঘরে ঢুকলেই ইমলির কেমন গা বমি বমি অবস্থা । সেই কারণে ইমলি নিজের মতো বাথ রুম সাফাই করে ।
দারুন গরম । সাফাই করতে করতে গরমে অস্থির হয়ে ওঠে ইমলি । ঘেমে নেয়ে নাস্তানাবুদ । তবে যেভাবে হোক ইমলি বাথ রুম পরিষ্কার করার পর তার স্নান সেরে নেয় । যাতে দশটায় অফিসের বাবুরা ঢুকলে তাঁদের চা বানিয়ে দিতে কোনো অসুবিধা না হয় ।
সেদিন বুধবার । রিতম বাবু সাধারণত একটু আগে ঢোকেন অফিসে । সেই কারণে ম্যানেজার বাবুর চেম্বার ইমলি প্রথমে পরিষ্কার পরিছন্ন করে রেডি রাখে । কিন্তু বুধবার ম্যানেজার বাবু অনেকটাই সকালে ঢুকলেন । তিনি চেম্বারে ঢুকে একটি ধূপকাঠি জ্বালাবেন । এটা তাঁর নিত্যদিনের রুটিন । রিতম বাবুর সামনের বড় সেক্রেটারিয়েট টেবিলের উপর কাঁচের নীচে মায়ের মূর্তির ছবি । ধূপকাঠি জ্বালানোর পর তিনি সেই মায়ের ছবির উপর ধূপকাঠি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে প্রণাম করবেন । তারপর তাঁর ব্রাঞ্চের অন্যান্য কাজে মনোযোগ । বুধবারদিন তার ব্যতিক্রম ঘটলো না । মাকে প্রণাম সেরে তিনি চেম্বার থেকে বেরিয়ে এসে ইমলিকে ডাকলেন, “আজ ক্যান্টিনে কি হচ্ছে” ?
স্যার, ডাটা চচ্চড়ি, ডাটা ও উচ্ছে দিয়ে মুসরির ডাল এবং কই মাছের পাতুরি । সেই সঙ্গে টমাটো ও খেজুরের চাটনি ।
খাওয়ার মেনুর কথা শুনে রিতম বাবু খুব খুশী । তাই তিনি বললেন, “আপনি কই মাছের পাতুরি রাঁধতে জানেন, আমার জানা ছিল না” ।
সেইজন্য সকালবেলায় ইতাসকে দিয়ে কলা পাতা সংগ্রহ করেছি । কলা পাতায় মুড়ে অল্প আঁচে পাতুরি বানাবো ঠিক করেছি স্যার । আপনারা এতকাল ভেটকি মাছের পাতুরি খেয়েছেন । আজ নতুন স্বাদে জ্যান্ত কই মাছের পাতুরি খেয়ে আলাদা অনুভূতি অনুভব করতে পারবেন । আপনাদের সারপ্রাইজ দেবো বলেই কই মাছের পাতুরির ব্যবস্থা !
কিন্তু ম্যাডাম, আমি একটি সমস্যায় পড়েছি ?
স্যার, আপনি কি পাতুরি খাবেন না ?
আমি পাতুরি খাবো, সেবিষয়ে দ্বিমত নেই ।
তাহলে সমস্যাটা কি স্যার ?
আজ আমাদের শাখায় ব্যাঙ্কের হেড অফিস থেকে জেনারেল ম্যানেজার সাহেব আসছেন । সম্ভবত তিনি আমাদের সঙ্গে দুপুরে খাবেন । যতদূর জানি তিনি একাই আসবেন । সুতরাং তাঁর জন্য অতিরিক্ত খাবার বানাতে হবে । দরকার হলে আমার মাছটা জেনারেল ম্যানেজার সাহেবকে দেবেন ।
ছি ! ছি ! স্যার । তা হয় নাকি ? সব ব্যবস্থা হয়ে যাবে । আপনি একদম চিন্তা করবেন না । আপনি জানিয়েছেন, এতেই আমি খুশী । আমার কর্তব্য, জেনারেল ম্যানেজার স্যারকে তাঁর সন্তুষ্টমতো খাওয়ানো ।
রিতম বাবু আবার বললেন, “সম্ভব হলে ডিমের অম্‌লেট ব্যবস্থা করবেন । চায়ের বদলে আজ কফি । সবাইকে কফি খাওয়ান । জি-এম স্যার, একটু আগেই সকালে আমাকে জানিয়েছেন ব্রাঞ্চ ভিজিটের কথা । সেই সময় আপনার বাজার শেষ হয়ে যাওয়ার কথা । সেই কারণে আপনাকে জানাতে আমি আসিনি । প্লিজ, জি-এম স্যারের আপ্যায়নে যেন ত্রুটি না হয়” !
ঠিক আছে স্যার । আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন । আমি সব ব্যবস্থা করছি ।
আবার ম্যানেজার বাবুর দিকে তাকিয়ে ইমলি জিজ্ঞাসা করলো, “স্যার, আমি একটা কথা ভাবছিলাম । সাহস পাচ্ছি না আপনাকে জিজ্ঞাসা করতে” ?
আপনি ইতস্তত করছেন কেন ? আপনি আমাদের শাখার একজন কর্মী । যেকোনো ভাল-মন্দের অংশীদার আপনিও । সুতরাং দ্বিধা না করে খুলে বলুন ।
স্যার আমি কিছু রসগোল্লা কিনে আনছি । আপনি অনুমতি দিলে খাওয়ার পরে পাতে দুটো করে রসগোল্লা দেবো ।
অতি উত্তম প্রস্তাব । খাওয়ানোর ব্যাপারে কোনো কার্পণ্য করবেন না । আপনাকে বলা রইলো, যেটা ভাল বুঝবেন সেটাই করবেন । আমি এবার চলি ।
পেছনে ডেকে ইমলি জিজ্ঞাসা করলো, “হঠাৎ জি-এম স্যার কেন” ?
ব্যাপারটা বোঝা যাচ্ছে না । তবে এইটুকু জানা গেছে, তিনি একটি অভিযোগ পেয়েছেন । কুসুমগ্রামের কোনো একজন মানুষ অভিযোগটি করেছেন । অভিযোগ যাই থাক তিনি ব্রাঞ্চে এলে অভিযোগ সম্বন্ধে আমরা জানতে পারবো । আপনি আপনার কাজে মনোযোগ দেন । আমি ভিতরটা সামলাই । জি-এম স্যার তাড়াতাড়ি ব্রাঞ্চে পৌঁছে যাবেন ।
ইমলি মোটামুটি কই মাছ কেটে বাছাই করে আগেই ঠিক করে রেখেছে । বাজার থেকে ফিরে পাতুরির জন্য মশলা শিল নোড়ায় বেটে থালায় রাখা । কই মাছের পাতুরির জন্য বাটা-কাটা শেষ । ডাটা চচ্চড়ির জন্য সাদা শর্ষে ও পোস্ত বেটে রেখে দিয়েছে যাতে রান্নার সময় তালগোল পাকিয়ে না যায় । বলা চলে ব্যঞ্জনাদি সুস্বাদু করার সমস্ত উপকরণ রেডি ।
ব্রাঞ্চে জেনারেল ম্যানেজার আসছেন রিতম বাবুর কাছে জানার পর ব্রাঞ্চ থেকে দেওয়া শাড়িটা পরলো ইমলি । শত হলেও উপরের সাহেব বলে কথা ।
ভাঁড়ে চুমুক দিয়ে কাউন্টারে বসা গোপাল বাবু বললেন, বৌদি আজ কি আমরা কফি খাচ্ছি ? হঠাৎ কফি বানানোর ধুম ?
মাঝে মাঝে কফি খাওয়া ভাল ।
উঁহু বৌদি । কফি খাচ্ছি, কিন্তু কোনো খুশীর খবরের গন্ধ পাচ্ছি ।
ক্যাশ কাউন্টার থেকে চিৎকার করে ক্যাশিয়ার বাবু বললেন, “চুপ করুন গোপাল বাবু । স্যার এসে গেছেন । ম্যানেজার বাবুর চেম্বারে ঢুকেছেন” ।
স্যার’টা কে বলবেন তো ?
আস্তে কথা বলুন গোপাল বাবু । হেড অফিস থেকে জি-এম স্যার !
গোপাল বাবু তখন একদম চুপ ।
ব্রাঞ্চে তখন সমস্ত স্টাফের কাজে মনোযোগ । নিজের নিজের জায়গায় বসে সকল স্টাফ চুপচাপ । ব্যাঙ্কে গ্রাহক সংখ্যা খুব কম । সকালের দিক ভিড় সাধারণত কম থাকে । কুসুমগ্রাম এলাকায় চাষি সম্প্রদায়ের মানুষ সংখ্যাধিক্য । ক্ষেতি জমিতে চাষের কাজ সেরে ব্যাঙ্কে আসেন টাকা তুলতে নতুবা টাকা জমা দিতে । ব্যবসায়ীদের ভিড় ঠিক বেলা একটার পর থেকে । বেচাকেনার পর বাড়িতে দুপুরের খেতে যাওয়ার আগে বিক্রি-বাট্টার টাকা ব্যাঙ্কে জমা রেখে তাঁরা ঘরে ঢোকেন । পেনশনের টাকা তোলার জন্য পেনশনারেরা সকালের দিকে ভিড় করেন । তাঁরা মাসের কোনো একটা দিন বেছে নেন টাকা তোলার জন্য । সেই দিন ঠিক দশটার সময় ব্যাঙ্কে হাজির । তুলনামূলকভাবে বুধবারদিন গ্রাহকদের উপচে পড়ার মতো ভিড় ছিল না বললেই চলে ।
জি-এম স্যার চেম্বার থেকে রিতম বাবুর সাথে বেরিয়ে এলেন ব্রাঞ্চের সকল স্টাফের সঙ্গে পরিচিত হতে । রিতম বাবু একে একে সকলের সাথে আলাপ করিয়ে দিলেন । জি-এম স্যার প্রতিটা স্টাফের সাথে করমর্দন করলেন । হেসে হেসে তিনি স্টাফদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করলেন । সবার শেষে ইমলির পালা । রিতম বাবু ইমলিকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন, “স্যার, ইনি ইমলি ম্যাডাম । এই অফিসের বদলী ঝাড়ুদার আর ক্যান্টিনের রান্নার মাসি” ।
“কতদিন হল এখানে কাজ করছেন” ?
এক বছর হয়নি স্যার ।
আপনি কোথায় থাকেন ?
ইমলি তখন চুপ । রিতম বাবু তখন বললেন, “স্যার, ম্যাডাম তার স্বামীর সাথে থাকেন” ।
“আপনি ভাল কফি বানিয়েছেন । এইজন্য ধন্যবাদ । আর এক কাপ কফি নিয়ে আপনি চেম্বারে আসুন । আপনার বিরূদ্ধেই কমপ্লেন । সেই প্রসঙ্গে আপনার সঙ্গে আমার অনেক কথা আছে “। বলেই জি-এম স্যার ম্যানেজার বাবুর চেম্বারে ঢুকলেন ।
 ( চলবে )

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here