ধর্মীয় গোঁড়ামি — একটি পর্যালোচনা : দিলীপ রায় (+৯১ ৯৪৩৩৪৬২৮৫৪)।

0
689

পবিত্র ধর্মীয় গ্রন্থ গীতায় আছে “কর্মই ধর্ম” । আবার অন্যদিকে পবিত্র কোরান হচ্ছে মানব জাতির কল্যাণে আল্লাহ্‌র দেওয়া জীবন বিধান । যাই হোক ঈশ্বর, আল্লাহ্‌, সৃষ্টিকর্তার, আরাধনা করাটাও ধর্ম । কিছু বিদগ্ধ মানুষের মতে, ধর্ম হচ্ছে এক ধরনের বিশ্বাস । এই ধর্ম নিয়ে মতভেদ হরেক রকমের । তবুও আমরা বলব, “ধর্ম মানুষের জন্য, মানুষের কল্যাণের জন্য ।“ স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন, “জীবে প্রেম করে যেই জন সেইজন সেবিছে ঈশ্বর ।“ এখানে জীব সেবা একটা পরম ধর্ম । তিনি দেশ বিদেশে বারংবার প্রচার করেছিলেন, মানব সেবাই উৎকৃষ্ট ধর্ম । তাঁর ধর্ম মানুষ তৈরীর ধর্ম, দেশ গঠনের ধর্ম ও বিশ্ববোধের ধর্ম । আবার স্বামী বিবেকানন্দ এটাও বলেছেন, “মানুষকে হত্যা করে ধর্মকে রক্ষা করার চাইতে ধর্মকে হত্যা করে মানুষকে রক্ষা করা বেশি পুণ্যের কাজ ।“ এতেই স্পষ্ট, স্বামী বিবেকানন্দ মানব সেবার উপর বেশি গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন । সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিম চন্দ্রের কথায়, আত্ন- রক্ষার চেয়ে দেশরক্ষা শ্রেষ্ট ধর্ম এবং এইজন্য সহস্র ব্যক্তি আত্মবলিদান করে দেশ রক্ষায় নিজেকে সপে ছিলেন । এখানেও নিজের স্বার্থের চেয়ে দেশের স্বার্থ বড় । সুতরাং দেশের, সমাজের বৃহত্তর স্বার্থে করণীয় কাজই ধর্ম । আজও বিদ্যাসাগর বিশেষভাবে স্মরণীয় সমাজ সংস্কার ও শিক্ষা বিস্তারের কর্ম প্রচেষ্টার জন্য । সমাজ সংস্কারের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন নির্ভীক যোদ্ধা । বিদ্যাসাগরের জীবনের বৃহত্তম কীর্তি বিধবা বিবাহ প্রচলণ । সুতরাং এই মহৎ কাজ বাস্তবায়নে তাঁর নীতিগত ধর্মের সুফল লক্ষণীয় । সাহিত্য সৃষ্টির মাধ্যমে শরৎ চন্দ্র সহজ ও অনাড়ম্বরভাবে দেশের ঘরোয়া কাহিনী বিবৃত করেছেন । যেভাবে দেশের অবহেলিত, দরিদ্র, নিপীড়িত মানুষের আশা-আকাক্ষা, সুখ-দুঃখ, প্রেম-অপ্রেম, প্রতিহিংসার ছবি তাঁর লেখার মধ্যে দিয়ে এঁকেছেন তাতে এটাই সুস্পষ্ট যে, “শরৎ চন্দ্র মূলত একজন মানবপ্রেমিক ।“ তাহলে এখানে শরৎ চন্দ্রের মানব প্রেম একটা ধর্ম ।
রবীন্দ্র নাথ “ধূলামন্দির”-কবিতায় লিখেছেন, “নয়ন মেলে দেখ দেখি তুই চেয়ে / দেবতা নাই ঘরে” । একজন প্রগতিশীল ধর্মপ্রাণা গুরুজী বলেছেন, “কল্যাণ ধর্মই সত্য ধর্ম” । অর্থাৎ সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি মানুষ । সব মানুষ সমান । সকল ধর্মই মানব কল্যাণের কথা বলে । কবি কাজী নজরুল ইসলামের উক্তি, “মানব ধর্মই সবচেয়ে বড় ধর্ম ।“ মাদার টেরিজার প্রথম পরিচয় তিনি আর্তের সেবিকা । দরিদ্রদের দিয়েছেন নিরাপত্তা, আশ্রয়হীনকে আশ্বাস, মুমূর্ষুকে সান্ত্বনা । আবার এই মানব সেবার কারণেই ভারত থেকে প্রথম ক্যাথলিক “সন্ত” হলেন সিস্টার আলফান সো । অনেক মনীষী আবার ধর্ম-সাধনা মানে বলতে চেয়েছেন এটা কোনো ব্যক্তিগত বিশ্বাসের স্বীকৃতি নয় —- এখানে ধর্ম বলতে বোঝায় সত্যের পথে চলা । এখানে একটি কথা ভীষণ প্রাসঙ্গিক, “মনুষ্যতেবোধ জাগ্রত হতে পারলেই ধর্মের সত্য উন্মোচিত হবে । এক ধর্মের সঙ্গে অপর ধর্মের বিরোধ মিটে যাবে ।“
এবার বিভিন্ন ধর্মের মূল কথা নিয়ে আলোচনা করা যাকঃ-
ক) সনাতন ধর্ম হচ্ছে মানব কল্যাণের ধর্ম ।
খ) খ্রিষ্ট ধর্ম হচ্ছে একেশ্বরবাদী ধর্ম । যীশুর জীবন ও শিক্ষাকে কেন্দ্র করে এই ধর্ম বিকশিত । খ্রিষ্টানরা মনে করেন যীশুই মসীহ (মসীহ শব্দটির অর্থ সেভিওর বা যিনি রক্ষা করেন ) । খ্রিষ্টানরা বিশ্বাস করেন, যীশু হচ্ছে ঈশ্বরের পুত্র ।
গ) ইসলাম শব্দের অর্থ “আত্মসমর্পণ” বা একক স্রষ্টার কাছে নিজেকে সমর্পণ । মুসলমানেরা বিশ্বজগতের সৃষ্টিকর্তাকে আল্লাহ্‌ বলে সম্বোধন করেন । মুসলমানদের ধর্ম বিশ্বাসের মূল ভিত্তি আল্লাহ্‌র একাত্ববাদ ।
ঘ) বৌদ্ধ ধর্মের মূল নীতি হল অহিংসা, সাম্য, মৈত্রী, ও প্রীতির বন্ধনে সবাইকে আবদ্ধ করে শান্তি প্রতিষ্ঠিত করা ।
সুতরাং উপরোক্ত আলচনায় মানব ধর্মের কথাই পরিষ্কার ।
এবার আসছি ধর্মের নিরিখে মানুষের বাস্তব অবস্থানে । আমাদের দেশ ভারতবর্ষ, সর্ব ধর্ম সমন্বয়ের দেশ । নানান ধর্মের মানুষের বিচরণ । হিন্দু, মুসলমান, শিখ, জৈন, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ, ইত্যাদি ধর্মাবলম্বীয় মানুষ নিজ নিজ ধর্মীয় অনুশাসনে আবদ্ধ । সেখানে ধর্মীয় অনুশাসনের বিধিগুলি সুরক্ষিত । আবার কিছু দেশের ধর্ম এককভাবে নিজস্ব, যেমন পাকিস্তান ইসলাম ধর্মের দেশ, নেপাল হিন্দু ধর্মের দেশ, ইত্যাদি । শোনা যাচ্ছে, বাংলাদেশে মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও সেই দেশ ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র । আবার নেপালের ক্ষেত্রে শোনা যাচ্ছে, নেপাল রাষ্ট্র নাকি হিন্দু রাষ্ট্রের ৎকমা ক্রমশ হারাচ্ছে ।
আমরা বেদে কী দেখেছি — বেদের শিক্ষা মানুষকে অনুপ্রেরণা যোগায়, দেহচেতনার উর্ধ্বে ওঠার জন্য ঋকবেদ মানুষকে অনুপ্রেরণা দেয় । এগিয়ে এসো, পৃথিবীকে উন্নত করে তোলো, এগিয়ে চলো মহত্বের পথে, পূর্ণাঙ্গ-তার পথে, উৎকর্ষের পথে । বৈদিক যুগে ধর্মীয় ক্রিয়াকান্ড ছিলো সাধারণ জীবনের অঙ্গ । অনেকের মতে ঈশ্বরকে ভালবাসলে বলা চলে সকলকে ভালবাসার সম্ভাবনার দরজা উন্মুক্ত হয় । ফলে সমাজে প্রেম-প্রীতি, সহানুভূতি, সহমর্মিতা ও একে অপরকে জানার সম্ভাবনা বাড়ে । তা ছাড়া বলা চলে ঈশ্বর চিন্তায় মগ্ন থাকলে মনের মধ্যে হীনমন্যতাবোধ জাগে না বরং সৎ মানুষিকতার জাগরণ ঘটে, দূর হয় সংকীর্ণতা ও স্বার্থপরতা । যার ফলে ধর্মীয় অনুশাসনে থেকে মানুষের মধ্যে অপরের সেবা করার ইচ্ছার বহির্প্রকাশ ঘটে । এই অর্থে মানবজীবনে ধর্মের প্রাসঙ্গিকতা উল্লেখযোগ্য ।
পাটনার বাসিন্দা সাঁওতাল সম্প্রদায়ের শ্রী আশক টুডুর বক্তব্য এখানে প্রনিধানযোগ্য । মন্দিরে অবস্থিত পাথরের শিবলিঙ্গের সামনে ঘন্টার পর ঘন্টা পুজো করা এবং অনেক খরচ করে বালতি বালতি খাঁটী দুধ ঐ পাথরের শিবলিঙ্গের উপরে ঢালা এবং পুজোর উপাচারে মাত্রাতিরিক্ত খরচ করাটা মানব সেবার কোনো কাজেই লাগে না । যদি ঐ মূল্যবান সময়টা এবং খরচের পুরোটা অভূক্ত দরিদ্র ভারতবাসীর মধ্যে বিতরণ সম্ভব হত, তাহলে ধর্ম বাড়ত বই কমত না । আরও একধাপ এগিয়ে স্বামী বিবেকানন্দের দৃষ্টিভঙ্গিতে বলা যেত দরিদ্র মানুষদের সেবা অর্থাৎ জীব সেবাই হচ্ছে ঈশ্বর সেবা । তা ছাড়া দেশের দারিদ্র দূরীকরণে কিছুটা হলেও ঐ রাজকীয় খরচাটা কাজে লাগত । মুসলিম ধর্মে বখরি ঈদের সময় দেখা যায়, তাঁদের দান ধ্যানের উদারতা । এই দান বা জাকাত (অনেক জায়গায় “জাকাত” শব্দটা লেখে “যাকাত”) হচ্ছে ইসলাম ধর্মের অঙ্গ । অন্য কথায় মুসলমান সমাজে ধর্মীয় অনুশাসন । ধর্মীয় অনুশাসনের প্রেক্ষাপটে ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষদের জাকাত বা দান করার প্রক্রিয়াটা সত্যিই ইতিবাচক ।
আমাদের দেশে যেমন বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষের বসবাস, তেমনি বিভিন্ন ভাষার মানুষের বসবাস । ভাষা ভিত্তিক ধর্মীয় আচরণ এই কারণে পরিলক্ষিত । নাগাল্যান্ডের কোহিমাতে বা মেঘালয়ের শিলং-এ খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী মানুষের সংখ্যা বেশী । সেখানে ধর্মের মধ্যে বিভাজন, যেমন ব্যাপ্টিস্‌, ক্যাথলিক, ইত্যাদি । তাঁদের জীবনযাত্রা নিজস্ব খ্রিষ্টীয় ধর্মীয় অনুশাসনে পরিচালিত । অসমীয়া ভাষার মানুষদের কাছে গৌহাটির কামাক্ষা মন্দির সর্বশ্রেষ্ট । ভীষণ জাগ্রত ঠাকুর । ব্রহ্মপুত্রের উপর কামাক্ষা মন্দিরের জনপ্রিয়তা আজ বিশ্বব্যাপী । তদ্রূপ উড়িষ্যায় পুরীতে জগন্নাথ মন্দির উড়িয়া সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে পুণ্যতীর্থ । মারাঠা ভাষাভাষী মানুষদের গনেশ বন্দনা সর্বজনবিদিত । সেপ্টেম্বর মাসের গনেশ পুজা মহারাষ্ট্রে টানা দশ দিন ধরে চলে । মুম্বাইয়ের সিদ্ধি বিনায়ক মন্দির পবিত্র স্থান হিসাবে বিশ্বখ্যাত । তামিল ও তেলেগু ভাষাভাষী মানুষদের কাছে তিরুপতি মন্দিরের বালাজী অর্থাৎ শ্রী ভেঙ্কটেশ্বর ঠাকুর ভগবানের ন্যায় । আজমীর শরিফের মসজিদ দশবার দর্শণের পুণ্য ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষের কাছে মক্কা-মদিনার সঙ্গে তুলনীয় । লে-লাদাখ অধিবাসীরা অধিকাংশই বুদ্ধ ভক্ত । যার জন্য লে-লাদাখে কান পাতলেই শোনা যায় “বুদ্ধং শরণং গচ্ছামী” । সুতরাং ধর্মটাও ভাষাভাষী ভিত্তিক জনপ্রিয় এবং মানবজীবনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত ।
পরিশেষে বলা যায়, ধর্ম হচ্ছে একটা বিশ্বাস । আর মানব ধর্ম হচ্ছে সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্ম । সুতরাং ধর্মীয় গোঁড়ামির বাইরে বেরিয়ে এসে আমরা বলতে পারি — কর্মই ঈশ্বর, কর্মই ধর্ম । (তথ্যসূত্রঃ সংগৃহীত)
***********************************************