স্মৃতিপ্রদীপ—-নবদ্বীপ গৌড়ীয় বৈষ্ণব সমাজের পক্ষ থেকে।

“এই কথাটি মনে রেখো,
তোমাদের এই হাসি খেলায়,
আমি যে গান গেয়েছিলাম,
জীর্ণ পাতা ঝরার বেলায় ।
যখন আমায় ওপার থেকে গেল ডেকে, ভেসেছিলাম ভাঙা ভেলায়
আমি যে গান গেয়েছিলাম
জীর্ণ পাতা ঝরার বেলায় ।…….”

কোন কোন জন এমন হন যাঁদের কষ্ট করে মনে রাখতে হয় না । তাঁদের নিজস্ব স্বভাব গুণে, আচরণের গুণে, ব্যবহারের গুণে, সাহায্যকারী উদ্যোগের গুণে তাঁরা নিষ্কম্প প্রদীপ শিখার মতন আপনা থেকেই মনে থেকে যান আমাদের মানসপটে চিরটাকাল । তাঁদেরকে ভোলা যায় না। তাঁদের হাতছানি স্মৃতিলোক থেকেও যেন ফিরে ফিরে আসে , প্রতিদিনের জীবনে নিত্য উপস্থিতির জানান দেয়। একটু কান পাতলেই তাঁদের কন্ঠের স্বর যেন ইথার তরঙ্গে ভেসে এসে শ্রবণযোগ্য হয়। মনে হয় এইতো চোখের সামনে ভেসে বেড়াচ্ছে তাঁর হাসি মাখা মুখ, উজ্জ্বল নয়ন, শরীরের উজ্জ্বল উপস্থিতি। মনে হয় এই বুঝিবা ডাক দেবেন, প্রশ্ন করবেন, ফোন করবেন , বা ম্যাসেজ পাঠাবেন !

হ্যাঁ, নবদ্বীপবাসী শ্রীপ্রদীপ ভৌমিক মহাশয় ঠিক যেন এমনই একজন মানুষ ছিলেন। বিগত ১০ই এপ্রিল,২০২৪ তিনি এই মর্ত্যধামের সকল মায়ার বাঁধন ছিন্ন করে সকলকে ত্যাগ করে চলে গেছেন তাঁর মনোমত ধামে। চিরশান্তির দেশে এখন তিনি বিচরণ করছেন । আর তাঁকে প্রতক্ষ্য ভাবে আমরা পাব না। কিন্তু, মনে প্রশ্ন জাগে , যেখানে তিনি এখন আছেন সেখানে সত্যিই কী খুব সুখে আছেন , শান্তিতে আছেন ? নিজের পুজো করা বিগ্রহদের ছেড়ে পিতা-মাতা , পত্নী-পুত্র-কন্যা, জামাই নাতি, ভাই-বোন, আত্মীয়-পরিজন, বন্ধু-সহকর্মী এঁদের সকলকে সরিয়ে রেখে, প্রত্যেকের থেকে দূরে সরে গিয়ে তিনি কী আদৌ আনন্দে আছেন? তাঁর যে অনেক কাজ বাকি রয়ে গেছে । তাঁর তো আরও কথা বলার ছিল, আরও গান গাইবার ছিল , আরও প্রাণ দেবার ছিল অপরকে ! অবশ্য জানি মনের এ প্রশ্ন অবান্তর । কারণ , যিনি চলে যান তিনিই জানেন কত সুখ আপন ইষ্টের চরণতলে বরাবরের জন্য আশ্রয় পাবার , নিত্যসেবা পাবার অধিকারী হবার । কত শান্তি সেখানে। তখন তো থাকেনা কোন বেদনা, কোন হারাবার ভয়, না পাওয়ার গ্লানি, অদেখার কষ্ট, দূরে থাকার যন্ত্রণা বা প্রিয়জন হারাবার দুঃখ । তাই তো তা পিতার ভবন , অমৃতলোক, নিত্য আনন্দময় ধাম ইত্যাদি নানা নামে নামাঙ্কিত।

“দুলে রে দুলে অশ্রু দুলে রে,
আঘাত করিয়া বক্ষ কূলেরে।
অকূল আকুল শোক দুলে রে,
ধায় কোন দূর স্বর্ণ কুলে রে।”

আসলে প্রদীপ ভৌমিক মহাশয় তথা আমাদের সকলের প্রদীপদা বা মাস্টারমশাই— মানুষটাই এমন ছিলেন ! সদা হাসি মুখ , মিশুকে, প্রাণচঞ্চল আর কর্মতৎপর তিনি। তাঁর অকপটতা অবিস্মরণীয় । তাঁর জন্ম ১৯৬২ সালের ২২ শে আগস্ট নবদ্বীপের রানীর চড়া স্থানে । পিতা শ্রীমাখনলাল ভৌমিক, মাতা শ্রীমতী আলোরানী ভৌমিক, পত্নী মীনাক্ষীদেবী । এক পুত্র ও এক কন্যার জনক তিনি।

কর্মজীবনে বারুইডাঙ্গা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন প্রদীপদা। এই স্কুল ছিল তাঁর প্রাণ । এই স্কুলের উন্নয়নের জন্য তিনি যে কত ছোটাছুটি করেছেন তার ইয়াত্তা নেই । বস্তুতঃ, তিনি এই স্কুলে যোগদানের পর থেকেই স্কুলের বহুবিধ উন্নতি সাধিত হয়েছে , প্রভূত গঠনমূলক কাজ সম্পাদিত হয়েছে। শুধু কী তাই! স্কুলের অনেক পড়ুয়াকে পর্যন্ত পড়াশোনা চালানোর ব্যবস্থা করে দিয়েছেন নীরবে কাউকে জানতে না দিয়ে। এসবে আত্মপ্রচার তিনি কখনও চাননি । সাধ্যানুযায়ী চেষ্টা করে গিয়েছেন সবসময়।

নবদ্বীপ গৌড়ীয় বৈষ্ণব সমাজের মুখপাত্র ছিলেন শ্রদ্ধেয় প্রদীপদা। আর তাই নবদ্বীপ বৈষ্ণব সমাজের প্রতিটি অনুষ্ঠানের , প্রায় প্রতিটি কার্যকারিতার ভিডিও ডকুমেন্টেশন রাখতে তাঁর প্রচেষ্টার অন্ত ছিল না। তিনি ইউটিউবার ছিলেন। মনে হতে পারে নিজের চ্যানেলকে প্রমোট করতেই বুঝিবা তাঁর সেই সব উদ্যোগ, ব্যস্ততা ছিল । কিন্তু , আদপে তা নয়। আসলে , সেবা ব্যাপারটা এমনই যে তা বহুভাবে করা যায় । যে যেমন ভাবে পথ বেছে নিতে পারে ! তিনি মনে করতেন—- Youtube এর মাধ্যমে তিনি গৌড়ীয় বৈষ্ণব সমাজের প্রচার-প্রসার চালাচ্ছেন। বাস্তবিক এটা সত্য যে , আমরা যারা দূরে থাকি , সব অনুষ্ঠানে ইচ্ছা থাকলেও অংশগ্রহণ করতে পারি না , প্রতক্ষ্য ভাবে সশরীরে থেকে সাক্ষী থাকতে পারি না —- তাদের জন্য প্রদীপদাই ছিলেন ভরসা। ঘরে বসে সেইসব স্মরণীয় অনুষ্ঠানের দ্রষ্টা হতে পেরেছি আমরা প্রদীপদারই বদান্যতায় । আর , সকলকে দর্শনের এই সুযোগ করে দেবেন বলেই নিজে অনেক কষ্ট স্বীকার করেও ভিডিও করেছেন । কত বিদগ্ধ জনেদের প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে ইন্টারভিউ নিয়ে কত লাইভ করে বিভিন্ন প্রসঙ্গে তাঁদের মতামত জানতে চেয়েছেন । বিভিন্ন জটিল বিষয়ে সামাজিকদের অবস্থান কী হওয়া উচিত, সে ব্যাপারে দিশা দেখিয়েছেন । আবার , বিভিন্ন অনুষ্ঠানের ডকুমেন্টেশন রাখা তো ইতিহাসকে ধরে রাখা । তাই, সেটাও তো পরোক্ষভাবে এক ধরণের ভক্তসেবা তথা ভগবদ্ সেবা ।

“ধুলায় রাখিও পবিত্র করে,
তোমার চরণ ধুলিতে ।
ভুলায়ে রাখিও সংসারতলে,
তোমারে না দিও ভুলিতে।।”

শ্রদ্ধেয় প্রদীপ ভৌমিক দাদার এক বড় গুণ—–আন্তরিকতা, ছিল । তিনি যে কাজই করতেন , যা-ই বলতেন তাতে কোথাও কোন মেকী বা মনগড়া বা অতিরঞ্জিতকরণের ব্যাপার থাকতো না । সবটাই করতেন অন্তরের টান থেকে। সরলপ্রাণ, সদা হাসিমুখ একজন মানুষ ছিলেন । আর ছিল, সকলকে কাছে টেনে নেবার এক তাগিদ তাঁর মধ্যে । কী পরিচিত, কী অপরিচিত সকলের সঙ্গে যখন কথা বলতেন তখন নিজের উপস্থিতির চিরপরিচিত ভাবের প্রকাশ ঘটতো তাঁর ব্যবহারে । বিপরীতের মানুষটার যেন মনে হতো কতই না চেনা এই ভদ্রলোক !

প্রদীপ ভৌমিক দাদা দীক্ষিত ছিলেন নাথ সম্প্রদায়ে। এই সম্প্রদায়ের প্রচারপ্রসারকল্পে তাঁর প্রচেষ্টা ছিল অন্তহীন । পরম শ্রদ্ধেয় ডঃ রাধা গোবিন্দ নাথ —যিনি এই সম্প্রদায় শুধু নয় সমগ্র বৈষ্ণব জগতের উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক, যাঁর সম্পাদিত এবং লিখিত একাধিক বৈষ্ণব গ্রন্থ আমাদের মহামূল্য সম্পদ—– তাঁর জন্মস্থান বাংলাদেশের কোন স্থানে সে ব্যাপারে অনুসন্ধান করবার জন্য অনেক উদ্যমী হয়েছেন প্রদীপদা। জন্মস্থান নির্ধারণ হয়েছে একসময় । এ বৎসর তাঁর জন্মতিথিতে সেখানে উৎসব হয়েছে । কিন্তু, অসুস্থতার কারণে নিজে যেতে না পারলেও নবদ্বীপ থেকে পাঠিয়েছেন সুযোগ্য শ্রীকৃষ্ণেন্দু গোস্বামীকে।

আবার নবদ্বীপের চিন্তামণি কুঞ্জের ইতিহাসকে সর্বসমক্ষে আনতে বা বিভিন্ন শ্রীপাটের উন্নতির জন্যও প্রদীপদা বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছিলেন ।

অশীতিপর বৃদ্ধ অসুস্থ পিতা-মাতার প্রতি কর্তব্যপরায়ণতা, পরিবারের প্রতি যত্নশীলতা, নিজের একজন পিতা হিসেবে দায়বদ্ধতা , দায়িত্ব পালন, ভাই-বোনেদের প্রতি স্নেহময়আচরণ,আত্মীয়-বন্ধু-বান্ধব-
সহকর্মী সকলের প্রতি প্রায় প্রতিটি দিক থেকেই প্রদীপদা ছিলেন অত্যন্ত যথাযথ একজন মানুষ ।

“নিভৃত প্রাণের নীরব ছায়ায়
নীরব নীড়ের পরে
কথাহীন ব্যথা
একা একা বাস করে”

অবনীর মায়াবগুন্ঠন ছিন্ন করে অনন্ত লোকে পাড়ি দেওয়া প্রদীপ ভৌমিক মহাশয় তথা প্রদীপদা আজ আর আমাদের মধ্যে নেই। কিন্তু, তাঁকে হারানোর বেদনায় ভারাক্রান্ত সেই প্রতিজন যাঁদের সঙ্গী তাঁর পরিচিতি ছিল । ডুকরে কেঁদে উঠছে প্রাণ প্রত্যেকের অমন মনখোলা , হৃদয় উজাড় করে কপটতাহীন নির্ভীক ভাবে কথা বলা , সহজ-সরল, সাহায্যকারী মানুষটির বিরহ বেদনায়। তাঁর পরিবারের ব্যথায় সমব্যথী আমরা প্রত্যেকেই । নবদ্বীপ গৌড়ীয় বৈষ্ণব সমাজের প্রতিজনার প্রতি তাঁর যে মমতা, আন্তরিকতা , ভালোবাসা তা চিরকাল স্মরণীয় হয়ে রয়ে যাবে । বহু কাজ বাকি রয়ে গেল প্রদীপদার করার এবং দেখারও । তবুও হৃদয় ভরা শোক নিয়েই লিখতে হচ্ছে—-

“এবার তুমি তোমার পূজা
সাঙ্গ করি চলিলে সঁপিয়া মনপ্রাণ।
এখন হতে আমার পূজা লহো গো আঁখি সলিলে—- আমার স্তবগান।”

গৌড়ীয় বৈষ্ণব সমাজের পক্ষ থেকে আমরা সকলে মিলে স্মৃতিপ্রদীপ জ্বালালাম আপনার জন্য প্রিয় প্রদীপ ভৌমিক দাদা। আমাদের সকলের শ্রদ্ধা , ভালবাসা আপনার প্রতি আগেও ছিল , আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। আপনি আপনার মনের মত লোকে সদা আনন্দে থাকুন— এই কামনা করি আমরা সকলে।

“ওগো পথের সাথী, নমি বারম্বার
পথিকজনের লহো লহো নমস্কার।।
ওগো বিদায়, ওগো ক্ষতি , ওগো দিনশেষের রাতি,
ভাঙা বাসার লহো নমস্কার।।”

——প্রণামান্তে নম্রানতা
ড. রাধাবিনোদিনী বিন্তি বণিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *