মূল্যবান মনুষ্য জীবন ও দোলযাত্রা বা হোলি : স্বামী আত্মভোলানন্দ(পরিব্রাজক)।

ওঁ নমঃ শ্রী ভগবতে প্রণবায় ।

আমাদের মূল্যবান সুন্দর মনুষ্য জীবনে সত্য সনাতন হিন্দু ধর্মে দোলযাত্রা বা হোলি হলো একটি জনপ্রিয় ও তাৎপর্যপূর্ণ উৎসব, যা রঙের উৎসব নামেও পরিচিত ৷
দোল পূর্ণিমা বা দোল উৎসব ফাল্গুনের পূর্ণিমায় ব্রজ অঞ্চল, রাজস্থান , বিহার , গুজরাট , ওড়িশা , আসাম , ত্রিপুরা এবং বাংলায় পালিত হয়। পৌরাণিক তথ্য অনুযায়ী সত্যযুগে হিরণ্যকশিপু নামে এক রাজা ছিলেন, যার ছেলের নাম ছিলো প্রহ্লাদ। এক সময় হিরণ্যকশিপু দেবতাদের বরে বলীয়ান হয়ে নিজেকে সর্বশক্তিমান ঈশ্বর ভাবতে শুরু করেন এবং প্রজাদেরকে তাকে ঈশ্বর হিসেবে মানতে নির্দেশ দেন। নিজের বালক পুত্র প্রহ্লাদ পিতাকে ঈশ্বর বলে মানতে রাজী ছিলো না। প্রহ্লাদ পালনকর্তা ভগবান বিষ্ণুর অনন্য ভক্ত হিসেবে খ্যাত ছিলেন। তার কথা বিষ্ণুদেবের নৃসিংহ অবতার উপাখ্যানে বর্ণিত হয়েছে। নিজের ছেলেই যদি তাকে ঈশ্বর বলে না মানে, তাহলে প্রজারা তাকে ঈশ্বর বলে মানবে কেনো ? তাই, হিরণ্যকশিপু অনেক বুঝিয়ে ছেলেকে ধর্মের পথ থেকে সরাতে না পেরে, নিজের ছেলেকে হত্যা করার জন্য নানাভাবে চেষ্টা করেন কিন্তু প্রত্যেকবারই ব্যর্থ হন।

শেষ পর্যন্ত হিরণ্যকশিপুর বোন হোলিকা রাজাকে এই প্রস্তাব দেয় যে, বালক প্রহ্লাদকে হত্যা করার জন্য সে তাকে ধরে নিয়ে অগ্নিকুণ্ডে প্রবেশ করবে, যেহেতু হোলিকার উপর দেবতার এই বর ছিলো যে, আগুনে হোলিকার কোনো ক্ষতি হবে না, সেহেতু প্রহ্লাদ আগুনে পুড়ে মারা যাবে, কিন্তুর হোলিকার কোনো ক্ষতি হবে না।
হোলিকার প্রস্তাব মতো রাজা হিরণ্যকশিপু সেই ব্যবস্থা করেন এবং তাতেও প্রহ্লাদ বেঁচে গিয়ে হোলিকাই আগুনে পুড়ে মারা যায়। এরপর রাজা হিরণ্যকশিপু, তার বালক পুত্রকে বলেন, তোমার ভগবান যদি থেকে থাকে তাকে এই মূহুর্তে এখানে উপস্থিত হতে বল, আর তারপর দেখ, তাকে আমি কিভাবে হত্যা করি। হিরণ্যকশিপু এটা বলা মাত্র, সেখানে নৃসিংহ বা নরসিংহ রূপে ভগবান বিষ্ণু আবির্ভূত হন এবং হিরণ্যকশিপুকে হত্যা করেন।

রাজ্যের প্রজারা, বালক প্রহ্লাদের এই ভগবান ভক্তি, অহঙ্কারী রাজার বিনাশ দেখে খুশিতে আপ্লুত হন। ধর্মপ্রাণ প্রহ্লাদই যে এখন তাদের রাজা, এই খুশিতে আপ্লুত হয়ে প্রজারা রং নিয়ে খেলা ও উৎসব শুরু করেন এবং রং উৎসবের আনন্দকে অনেকগুন বাড়িয়ে দেয়, হোলিকা এবং হিরণ্যকশিপুর বিনাশ একই দিনে বা একই ঘটনায় ঘটেছিলো বলে কালক্রমে এই রং খেলার নাম হোলিকা থেকে শুধু হোলিতে পরিণত হয় এবং এই ঘটনার স্মরণে প্রতিবছর এই তিথিতে রং খেলা বা হোলি খেলা একটি উৎসবে পরিণত হয়ে যুগের পর যুগ ধরে চলতে থাকে এবং এখনও চলতে আছে।

দোলযাত্রা বা দোল মূলত বৈষ্ণব সমাজের উৎসব, এটি রাধা ও কৃষ্ণের শাশ্বত ও ঐশ্বরিক প্রেম উদযাপন করে। হোলিকা দহন অশুভ শক্তির বিপরীতে শুভের জয় নির্দেশিত করে। কারণ এই তিথিতেই চৈতন্যদেব জন্ম গ্রহণ করেছিলেন। একদিকে এই তিথিতে চৈতন্যদেব জন্মগ্রহন করে ছিলেন, অন্যদিকে এই তিথিতেই শ্রীকৃষ্ণ বৃন্দাবন বাসীর সঙ্গে প্রাচীন প্রথা অনুযায়ী রং খেলায় মেতেছিলেন, এই সব কিছু মিলিয়ে রং খেলার পাশাপাশি বৈষ্ণব সমাজ এটাকে দোলযাত্রা বানিয়েছেন। বাংলায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাত ধরে শান্তিনিকেতনে দোলের উৎসব বা বসন্তোৎসব একটি বিশেষ ও জনপ্রিয় ঐতিহ্য। যেখানে রঙের উৎসবের সাথে ঋতু পরিবর্তন এবং প্রকৃতির সৌন্দর্য উদযাপন করা হয় শান্তিনিকেতনে বসন্তোৎসবের একটি বিশেষত্ব হল এর মধ্যে ধর্মীয় অনুষঙ্গ না থাকার কারণে এটি সকলের জন্য উন্মুক্ত এবং আনন্দপূর্ণ, এটি বসন্ত ঋতুর আগমন এবং প্রকৃতির নবজাগরণের এক আনন্দপূর্ণ উদযাপন। বাংলা ক্যালেন্ডার অনুযায়ী 2025 সালে দোল যাত্রা 14 মার্চ শুক্রবার পালিত হবে। আপনাকে এবং আপনার পরিবারকে দোলযাত্রা এবং হোলির শুভেচ্ছা….! দোলযাত্রা এবং হোলি উপলক্ষে জগৎ গুরু ভগবান স্বামী প্রণবানন্দজী মহারাজের শুভ ও মঙ্গলময় আশির্বাদ আপনাদের সকলের শিরে বর্ষিত হোক… এই প্রার্থনা করি…!!
ওঁ গুরু কৃপা হি কেবলম্ ।
স্বামী আত্মভোলানন্দ *পরিব্রাজক*

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *