শিখদের আদর্শে গুরু গোবিন্দ সিংহের প্রভাব : স্মরণে শিখ ধর্মের দশম গুরু।।।

গুরু গোবিন্দ সিংহ (২২ ডিসেম্বর ১৬৬৬ – ৭ অক্টোবর ১৭০৮) ছিলেন শিখ ধর্মের দশম ও সর্বশেষ মানবগুরু। তিনি একাধারে শিখ জাতির একজন বীর নেতা, দক্ষ যোদ্ধা, কবি, দার্শনিক এবং সংস্কারক। তাঁর জীবনের শিক্ষা ও আদর্শ শুধু শিখ সম্প্রদায়ের মধ্যেই নয়, বরং গোটা ভারতের ইতিহাস ও সংস্কৃতিতেও গভীর প্রভাব ফেলেছে।

জন্ম ও শৈশব—

গুরু গোবিন্দ সিংহ জন্মগ্রহণ করেন ১৬৬৬ সালের ২২ ডিসেম্বর, ভারতের বর্তমান বিহার রাজ্যের পাটনা শহরে। তাঁর জন্মনাম ছিল গোবিন্দ রায়। তিনি ছিলেন নবম শিখ গুরু গুরু তেগ বাহাদুর ও মাতা গুজরি-র একমাত্র সন্তান। পাটনায় তাঁর জন্মস্থানেই গড়ে উঠেছে তখত শ্রী পাটনা হরিমন্দর সাহিব, যা আজ একটি অন্যতম পবিত্র তীর্থস্থান।
শৈশবে গোবিন্দ সিং পাটনা শহরে বেশ কয়েক বছর কাটান। এক আকর্ষণীয় ঘটনা অনুযায়ী, পাটনার তৎকালীন রাজা ফতেহ চাঁদ ও রানী ছিলেন নিঃসন্তান। তারা শিব দত্ত নামে এক সাধুর পরামর্শে গোবিন্দ রায়ের আশীর্বাদ নিতে যান। ছোট্ট গোবিন্দ রায় রানীর অনুরোধে বলেন, “তুমি যদি চাও, আমিই তোমার পুত্র।” সেই থেকেই রানী তাঁকে পুত্ররূপে দেখতেন এবং তাকে স্নেহ করতেন। আজও সেই রাজপ্রসাদেই (বর্তমানে গুরুদ্বারা রূপে পরিণত) গুরু গোবিন্দ সিংহের স্মৃতিতে পুরি ও ছোলার ডাল রান্না করে দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করা হয়।

শিক্ষাজীবন—–

১৬৭০ সালে গোবিন্দ সিং পাঞ্জাবের আনন্দপুর সাহিবে চলে আসেন, যেখানে তাঁর পিতা গুরু তেগ বাহাদুর নতুন শহর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এখানেই তিনি সংস্কৃত, ফারসি, পাঞ্জাবি ও আরবি ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেন এবং সৈনিক হিসেবে প্রশিক্ষণ নেন। সাহেব চাঁদের কাছে তিনি পাঞ্জাবি এবং কাজী পীর মুহাম্মদের কাছে ফারসি শিখেছিলেন।
তিনি কেবল বুদ্ধিজীবীই নন, একজন শক্তিশালী যোদ্ধাও ছিলেন। ঘোড়সওয়ারি, ধনুর্বিদ্যা এবং কৌশলী যুদ্ধকৌশলে তিনি ছিলেন নিপুণ। শিখ আদর্শে “সন্ত সিপাহী” অর্থাৎ সাধু ও যোদ্ধার সমন্বয়— এই ধারণার বাস্তব রূপ ছিলেন তিনি।

খালসা প্রবর্তন ও ধর্মীয় সংস্কার—

১৬৯৯ সালের ১৩ এপ্রিল, গুরু গোবিন্দ সিংহ আনন্দপুর সাহিবে খালসা পন্থ প্রবর্তন করেন, যা শিখ ধর্মের ইতিহাসে যুগান্তকারী ঘটনা। খালসা ছিল এক বিশুদ্ধ, নির্ভীক ও ঈশ্বরনিষ্ঠ শিখ সম্প্রদায়, যারা কেশ, কঙ্গা, কাড়া, কচ্ছা ও কৃপান—এই ‘পাঁচ ক’ ধারণ করতেন। খালসার মাধ্যমে গুরু গোবিন্দ সিং জাতপাত, লিঙ্গবৈষম্য এবং কুসংস্কারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন।
তিনি ঘোষণা করেন, “খালসা মেরে রূপ হ্যায় খাস। খালসা মে হউ করু নিবাস।” অর্থাৎ, “খালসাই আমার প্রকৃত রূপ, আমি খালসার মধ্যেই বাস করি।”

যুদ্ধজীবন ও আত্মত্যাগ—-

গুরু গোবিন্দ সিং জীবনের অধিকাংশ সময় কাটিয়েছেন মুঘল সাম্রাজ্য এবং পার্বত্য রাজাদের সাথে যুদ্ধে। তাঁর চার পুত্র—অজিত সিং, জুজর সিং, জোরাওয়ার সিং এবং ফতেহ সিং—সমস্তেই ধর্মরক্ষার জন্য প্রাণ উৎসর্গ করেছিলেন।
সিরহিন্দের নবাব ওয়াজির খানের সাথে শত্রুতা চরমে ওঠে। ১৭০৮ সালে, দক্ষিণ ভারতে অবস্থানকালে আফগান আততায়ীর হাতে গুরু গোবিন্দ সিং গুরুতরভাবে আহত হন। ৭ অক্টোবর ১৭০৮ সালে নান্দেদে তিনি প্রয়াণ করেন।

গুরু গ্রন্থ সাহিব: চিরন্তন গুরু—-

প্রয়াণের পূর্বে, গুরু গোবিন্দ সিং ঘোষণা করেন যে এরপর আর কোনও মানব গুরুর প্রয়োজন নেই। তিনি শ্রী গুরু গ্রন্থ সাহিব-কেই শিখদের চিরন্তন গুরু হিসেবে অভিষিক্ত করেন। এই সিদ্ধান্ত শিখ ধর্মে এক অভূতপূর্ব ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ।

উপসংহার —

গুরু গোবিন্দ সিংহ ছিলেন শুধু একজন ধর্মগুরু নন, বরং এক সামাজিক বিপ্লবী। তাঁর শিক্ষা, সাহস, সহনশীলতা ও আত্মত্যাগ আজও শিখদের নিত্যদিনের জীবনে, প্রার্থনায়, সংস্কারে ও আদর্শে গভীর ছাপ রেখে চলেছে।

তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া ও বিভিন্ন তথ্যভিত্তিক ওয়েবসাইট
✍️ সম্পাদনা ও উপস্থাপন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *