
ভারতের উত্তরতম প্রান্তে অবস্থিত লেহ, লাদাখ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় শহর এবং ভ্রমণপ্রেমীদের কাছে এক রোমাঞ্চকর স্বপ্নস্থান। লেহ শুধুমাত্র প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য নয়, বরং এর অনন্য সংস্কৃতি, মঠ, অ্যাডভেঞ্চার কার্যকলাপ এবং আকাশছোঁয়া পাহাড়ের জন্য বিশ্বজুড়ে পর্যটকদের আকর্ষণ করে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩,৫০০ মিটার উঁচুতে অবস্থিত এই শহর সত্যিই “হাই-অ্যালটিটিউড হেভেন”।
অবস্থান ও আবহাওয়া
লেহ চারদিক থেকে হিমালয়ের তুষারশৃঙ্গ দ্বারা ঘেরা। এখানে শীতকাল দীর্ঘ এবং তীব্র শীতল, আর গ্রীষ্মকালে শুষ্ক কিন্তু মনোরম আবহাওয়া থাকে। গ্রীষ্মের মে-সেপ্টেম্বর মাস লেহ ভ্রমণের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সময়।
বৌদ্ধ মঠ ও আধ্যাত্মিকতা
লেহর প্রধান আকর্ষণ এর বৌদ্ধ মঠগুলি – যেগুলি লাদাখের সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিকতার প্রতীক।
- থিকসে মঠ – এটি লাদাখের অন্যতম বৃহৎ মঠ, যেখানে রয়েছে ১২ তলা বিশাল স্থাপনা ও মহামায়ী বুদ্ধের বিরাট মূর্তি।
- হেমিস মঠ – এর হেমিস উৎসব বিশ্ববিখ্যাত।
- স্পিতুক মঠ – এখান থেকে লেহ শহরের এক অপূর্ব দৃশ্য দেখা যায়।
লেহ প্যালেস
১৭শ শতকে নির্মিত লেহ প্যালেস হলো শহরের আইকনিক স্থাপনা। এই ৯ তলা প্রাসাদ থেকে পুরো লেহ ও আশেপাশের পর্বতের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য দেখা যায়।
️ প্রকৃতির অপূর্ব রূপ
️ খারদুং লা
বিশ্বের অন্যতম উচ্চতম মোটরযোগ্য রাস্তা (৫,৩৫৯ মিটার)। এখান থেকে লাদাখের উপত্যকা, নুব্রা ভ্যালি ও আশেপাশের পাহাড়ের অপূর্ব দৃশ্য দেখা যায়।
প্যাংগং লেক
লেহ থেকে প্রায় ১৬০ কিমি দূরে অবস্থিত বিখ্যাত প্যাংগং লেক, যার নীল জল দিনের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রঙ ধারণ করে। অসংখ্য সিনেমায় এই হ্রদকে দেখা যায় (যেমন – ৩ ইডিয়টস)।
️ নুব্রা ভ্যালি
ডাবল হাম্পড ব্যাকট্রিয়ান উটের জন্য বিখ্যাত এই মরুভূমি উপত্যকা লেহ ভ্রমণের অন্যতম হাইলাইট। এখানে বালুর টিলা, ডিস্কিট মঠ এবং হান্ডার গ্রাম বিশেষ আকর্ষণ।
অ্যাডভেঞ্চার কার্যকলাপ
লেহ হল অ্যাডভেঞ্চার প্রেমীদের স্বর্গ।
- বাইক রাইড (বিশেষত মানালি-লেহ ও শ্রীনগর-লেহ হাইওয়ে)
- ট্রেকিং (মারখা ভ্যালি ট্রেক, চাদর ট্রেক – জমে যাওয়া জাঁস্কর নদীর ওপর দিয়ে হাঁটা)
- রিভার রাফটিং (জাঁস্কর নদীতে)
- মাউন্টেন ক্লাইম্বিং ও ক্যাম্পিং
️ স্থানীয় বাজার ও সংস্কৃতি
লেহ বাজারে পাওয়া যায় তিব্বতি হস্তশিল্প, প্রেয়ার ফ্ল্যাগ, উলের পোশাক, অ্যাপ্রিকট জ্যাম এবং রূপার অলংকার। স্থানীয়রা অত্যন্ত আতিথেয়তাপূর্ণ। লাদাখি খাবারের মধ্যে থুকপা ও মোমো ভ্রমণকারীদের অবশ্যই চেখে দেখা উচিত।
তারাভরা আকাশ
লেহর অন্যতম আকর্ষণ হলো এর পরিষ্কার আকাশ। রাতের আকাশে হাজারো তারা দেখা যায়। চাঁদহীন রাতে আকাশগঙ্গা স্পষ্ট দেখা যায় – যা শহুরে জীবনে প্রায় অসম্ভব।
উচ্চতা ও স্বাস্থ্যের টিপস
যেহেতু লেহ উচ্চতায় অবস্থিত, তাই পর্যটকদের অ্যাক্লিমাটাইজেশন করা জরুরি। প্রথম দুই দিন বিশ্রাম নেওয়া উচিত, প্রচুর জল খেতে হবে এবং অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম এড়িয়ে চলতে হবে।
উপসংহার
লেহ এমন এক জায়গা যেখানে ইতিহাস, আধ্যাত্মিকতা, অ্যাডভেঞ্চার এবং প্রকৃতির অপূর্ব রূপ একসাথে মিশে গেছে। পাহাড়ি পথ ধরে বাইক চালানোর রোমাঞ্চ, নীল হ্রদের ধারে বসে থাকা নীরবতা, মঠের ঘণ্টাধ্বনি – সবকিছু মিলিয়ে লেহ ভ্রমণ একবার নয়, বহুবার মনে পড়বে। যারা সত্যিই ভারতের এক ভিন্ন রূপ দেখতে চান, তাদের জন্য লেহ একটি অবশ্যই দর্শনীয় স্থান।












Leave a Reply