
“সহধর্মিনী” শব্দটি একটি গভীর দার্শনিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্য বহন করে। যেখানে শব্দটির ব্যুৎপত্তি, শাস্ত্রীয় তাৎপর্য, সামাজিক প্রাসঙ্গিকতা ও আধুনিক যুগে এর প্রয়োগ সব দিক থেকে আলোচনা করা হয়েছে।
ভারতীয় সমাজ ও সংস্কৃতিতে “সহধর্মিনী” শব্দটি কেবল স্ত্রী বা জীবনসঙ্গিনী বোঝাতে ব্যবহৃত হয় না, বরং এটি এক গভীর দর্শনের প্রতিফলন। “সহধর্মিনী” মানে এমন এক সঙ্গিনী যিনি সহধর্ম পালন করেন, অর্থাৎ জীবনযাত্রার ধর্মীয়, নৈতিক ও সামাজিক কর্তব্যে সমানভাবে অংশীদার হন। আধুনিক যুগে যেখানে সম্পর্কের সংজ্ঞা ক্রমশ বদলাচ্ছে, সেখানে সহধর্মিনীর প্রকৃত অর্থ বোঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
১. শব্দটির ব্যুৎপত্তি
“সহধর্মিনী” শব্দটি দুটি সংস্কৃত শব্দের সংমিশ্রণ—
- “সহ” (অর্থাৎ একসঙ্গে, পাশাপাশি)
- “ধর্মিনী” (ধর্ম পালনকারী, নৈতিক কর্তব্যে স্থিত নারী)
অর্থাৎ, সহধর্মিনী মানে সেই নারী যিনি স্বামীর সঙ্গে একত্রে ধর্ম বা কর্তব্য পালন করেন। এখানে ধর্ম বলতে কেবল পূজা-পার্বণ নয়, জীবনের প্রত্যেকটি নৈতিক দায়িত্ব, সামাজিক কর্তব্য ও সংসারের মঙ্গলকাজ বোঝানো হয়েছে।
২. শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা
বৈদিক ও পুরাণ সাহিত্যে সহধর্মিনী শব্দটি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
- ঋগ্বেদে স্ত্রীকে বলা হয়েছে “জায়া” – যিনি জন্ম দেন, সংসার রক্ষা করেন।
- মনুস্মৃতি (৯.২৬)-এ বলা হয়েছে –
যত্র নার্যঃ পূজ্যন্তে রমন্তে তত্র দেবতাঃ
অর্থাৎ যেখানে নারীদের সম্মান দেওয়া হয়, সেখানেই দেবতারা বিরাজ করেন।
এখানেই সহধর্মিনীর তাৎপর্য—তিনি কেবল স্বামীর সংসার ভাগ করেন না, বরং তার ধর্মীয় ও নৈতিক কর্তব্যে সমান অংশ নেন।
৩. সহধর্মিনী বনাম স্ত্রী
অনেক সময় সহধর্মিনী শব্দটি স্ত্রী শব্দের সমার্থক হিসেবে ব্যবহৃত হয়, কিন্তু আসলে এদের মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে।
- স্ত্রী – শুধুমাত্র জৈবিক বা সামাজিক সম্পর্ককে বোঝায়।
- সহধর্মিনী – সম্পর্কের চেয়ে বড় এক আদর্শ, যেখানে ধর্ম, কর্তব্য ও আধ্যাত্মিক উন্নতি ভাগাভাগি করে নেওয়া হয়।
অর্থাৎ, সহধর্মিনী এমন একজন নারী যিনি সংসার জীবনে স্বামীর সমান সঙ্গী ও সহযাত্রী।
৪. সংসার ও ধর্মপালনে সহধর্মিনীর ভূমিকা
(ক) গার্হস্থ্য ধর্মে সমান অংশীদার
বিবাহিত জীবনে স্বামী-স্ত্রী উভয়েরই কিছু কর্তব্য থাকে। সহধর্মিনী স্বামীকে গৃহস্থ জীবনে সমর্থন দেন—অর্থনৈতিক, মানসিক, সামাজিক ও আধ্যাত্মিক দিক থেকে।
(খ) ধর্মীয় আচারে অংশগ্রহণ
হিন্দু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে স্ত্রী ছাড়া অনেক পূজা অসম্পূর্ণ ধরা হয়। যেমন, লক্ষ্মী পুজো, সত্যনারায়ণ ব্রত ইত্যাদিতে স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গে বসেন। এটি প্রতীকীভাবে দেখায় যে সংসারের সমৃদ্ধি উভয়ের যৌথ সাধনার ফল।
(গ) জীবনের কঠিন সময়ে সহযাত্রী
সহধর্মিনী কেবল সুখের সঙ্গিনী নন, দুঃখেও তিনি স্বামীর পাশে থাকেন। প্রাচীন সাহিত্যে বলা হয়েছে—
ধর্মে চ অর্থে চ কামে চ নিত্যা স্ত্রী সহধর্মিণী
অর্থাৎ ধর্ম, অর্থ ও কাম—এই তিন পুরুষার্থে স্ত্রী স্বামীর সহধর্মিনী।
৫. সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে সহধর্মিনী
সহধর্মিনী কেবল পরিবারের অংশ নন, তিনি সমাজের গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ।
- তিনি সন্তানদের নৈতিক শিক্ষা দেন।
- সমাজে নারীর সম্মান বজায় রাখেন।
- সংসারের অর্থনীতি, পারিবারিক সম্পর্ক ও সামাজিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করেন।
এভাবে সহধর্মিনী সমাজের অগ্রগতিতেও ভূমিকা পালন করেন।
৬. সহধর্মিনী ও নারীর মর্যাদা
সহধর্মিনী ধারণা আসলে নারীকে সমান মর্যাদা দেওয়ার প্রতীক।
- এখানে স্ত্রীকে স্বামীর অধীন নয়, বরং সমকক্ষ হিসেবে দেখা হয়।
- সংসারের সাফল্য বা ব্যর্থতা উভয়ের যৌথ দায়িত্ব হিসেবে ধরা হয়।
- এটি নারীর সামাজিক অবস্থানকে মর্যাদাপূর্ণ করে তোলে।
৭. আধুনিক প্রেক্ষাপটে সহধর্মিনী
আজকের দিনে সহধর্মিনীর ভূমিকা আরও বিস্তৃত হয়েছে।
- তিনি শুধু গৃহিণী নন, কর্মজীবীও হতে পারেন।
- সংসার ও কর্মক্ষেত্র উভয় ক্ষেত্রেই সমানভাবে অবদান রাখেন।
- আধুনিক সহধর্মিনী স্বামীকে শুধু ধর্মপালনে নয়, জীবনের প্রতিটি সিদ্ধান্তে অংশীদার হন।
৮. সহধর্মিনীর আদর্শ উদাহরণ
ভারতীয় ইতিহাসে বহু সহধর্মিনীর উদাহরণ রয়েছে—
- সীতা: রামের সহধর্মিনী, যিনি বনবাসে স্বামীর সঙ্গে গিয়েছিলেন।
- দ্রৌপদী: পাঁচ পাণ্ডবের সহধর্মিনী, যিনি মহাভারতের কাহিনিকে নতুন মোড় দিয়েছিলেন।
- সাবিত্রী: সত্যবানকে মৃত্যুর হাত থেকে ফিরিয়ে এনেছিলেন।
এদের প্রত্যেকের মধ্যে আমরা সহধর্মিনীর আত্মত্যাগ, দৃঢ়তা ও ভালোবাসার নিদর্শন পাই।
৯. দর্শনীয় তাৎপর্য
সহধর্মিনী ধারণা ভারতীয় দার্শনিক চিন্তাধারার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
- এটি “অর্ধনারীশ্বর” ধারণার মতোই স্বামী-স্ত্রীর যৌথ অস্তিত্বকে স্বীকৃতি দেয়।
- সংসার জীবনকে এক ধরণের যজ্ঞ হিসেবে ধরে, যেখানে উভয়েরই সমান অবদান প্রয়োজন।
১০. উপসংহার
সহধর্মিনী শব্দটি কেবল একটি সামাজিক সম্পর্ক নয়, বরং এক গভীর দর্শনের প্রতীক। এটি বলে—
- সংসার জীবনে স্ত্রী কেবল সহচরী নন, তিনি সহযাত্রী।
- সুখ-দুঃখে সমান ভাগীদার।
- ধর্ম, কর্তব্য, আধ্যাত্মিক উন্নতি—সব ক্ষেত্রেই তিনি স্বামীর সমান।
আধুনিক সমাজে সহধর্মিনীর এই ধারণা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এটি কেবল বিবাহিত সম্পর্ক নয়, বরং নারী-পুরুষের সমান মর্যাদা ও পারস্পরিক সহযোগিতার এক অনন্য প্রতীক।












Leave a Reply