বাংলার মানুষের কাছে সমুদ্র মানেই দীঘা। কলকাতা থেকে মাত্র কয়েক ঘণ্টার পথ, অথচ এই অল্প দূরত্বেই যেন মেলে এক ভিন্ন জগৎ— নীল সমুদ্র, লাল কাঁকড়ার সৈকত, রোদ-ঝলমলে বালির মায়া, আর ঢেউয়ের অন্তহীন সঙ্গীত। পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব মেদিনীপুর জেলার এই সমুদ্র শহর শুধু বঙ্গবাসীর নয়, সারা ভারতের ভ্রমণপিপাসুদের অন্যতম প্রিয় গন্তব্য।
দীঘার ইতিহাস ও পরিচিতি
দীঘা একসময় “বেহারা” নামে পরিচিত ছিল। ১৮শ শতকের শেষ দিকে ব্রিটিশ ব্যবসায়ী জন ফ্র্যাঙ্ক সল্টার এই অঞ্চলের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে দীঘাকে বিশ্বের সামনে পরিচিত করার উদ্যোগ নেন। স্বাধীনতার পরে পশ্চিমবঙ্গ সরকার এখানে পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলে। আজ তা বাংলার সর্বাধিক জনপ্রিয় সমুদ্রসৈকত।
দীঘার সৈকতের বৈশিষ্ট্য
দীঘার প্রধান আকর্ষণ তার দীর্ঘ সৈকত। প্রায় ৭ কিলোমিটার লম্বা এই সৈকতকে বলা হয় “সমুদ্রের রানি”। ভোরের আলোয় সমুদ্রের রঙ বদলাতে দেখা কিংবা সন্ধ্যায় সূর্যাস্তের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য— দুটিই ভ্রমণকারীদের জন্য অনন্য অভিজ্ঞতা।
- ওল্ড দীঘা – মূল শহর ও পুরোনো সৈকত যেখানে ভিড় সবচেয়ে বেশি।
- নিউ দীঘা – অপেক্ষাকৃত শান্ত, প্রশস্ত সৈকত, যেখানে ভ্রমণকারীরা সাঁতার কাটতে বা বসে বসে ঢেউ উপভোগ করতে পারেন।
দীঘার প্রধান আকর্ষণ
- সৈকতে হাঁটা ও ঢেউয়ের খেলা – সমুদ্রের নোনতা হাওয়া ও ঢেউয়ের সঙ্গ মনের ক্লান্তি দূর করে দেয়।
- সামুদ্রিক খাবার – তাজা চিংড়ি, কাঁকড়া, মাছের নানা পদ ভ্রমণকারীদের রসনা তৃপ্ত করে।
- অ্যাকোয়ারিয়াম ও মেরিন অ্যাকোস্টিক্স রিসার্চ সেন্টার – শিশু ও বড় সবার কাছেই আকর্ষণীয়।
- চন্দনেশ্বর মন্দির – দীঘা থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে অবস্থিত প্রাচীন শিবমন্দির।
- শঙ্করপুর, মন্দারমণি ও তাজপুর – দীঘার কাছেই আরও কিছু মনোরম সৈকত, যা দিনভ্রমণের জন্য আদর্শ।
দীঘার বিনোদন ও কার্যকলাপ
- সৈকতে ঘোড়ার গাড়ি ভ্রমণ – সমুদ্রতটে সন্ধ্যার সময় ঘোড়ার গাড়ি বাঙালির ছুটির মধুর স্মৃতি।
- সামুদ্রিক খেলাধুলা – বোট রাইড, বিচ বাইকিং ইত্যাদি এখন নতুন সংযোজন।
- কেনাকাটা – দীঘার সমুদ্রতটে ঝিনুক, শাঁখ, সামুদ্রিক শিল্পকর্ম, শাড়ি ও হাতের তৈরি সামগ্রী সহজলভ্য।
কবে ভ্রমণ করবেন
দীঘা ভ্রমণের সবচেয়ে ভালো সময় অক্টোবর থেকে মার্চ মাস। শীতকালে আবহাওয়া মনোরম থাকে এবং সৈকতের সৌন্দর্য উপভোগে কোনো অসুবিধা হয় না। বর্ষাকালে সমুদ্র উত্তাল থাকে, যদিও প্রকৃতির এক ভিন্ন রূপ তখনও দেখা যায়।
কীভাবে পৌঁছাবেন
- ট্রেনে – হাওড়া থেকে সরাসরি দীঘার ট্রেন রয়েছে (তাম্রলিপ্ত এক্সপ্রেস, দীঘা এক্সপ্রেস ইত্যাদি)।
- বাসে – কলকাতার বিভিন্ন স্থান থেকে সরকারি ও বেসরকারি বাস যায়।
- গাড়িতে – NH-16 ও NH-116B ধরে সহজেই পৌঁছানো যায়।
দীঘা ভ্রমণের অভিজ্ঞতা
দীঘা কেবল সমুদ্র নয়, এটি এক অনুভূতি। এখানে এলে ভ্রমণকারীরা পায় প্রকৃতির কাছাকাছি থাকার আনন্দ। পরিবার নিয়ে হোক কিংবা বন্ধুদের সাথে, দীঘার ভ্রমণ সবসময়ই স্মৃতিময় হয়ে থাকে।
উপসংহার
পশ্চিমবঙ্গের দীঘা যেন এক চিরন্তন ডাক— সমুদ্রের ঢেউ, সূর্যাস্তের লাল আভা, কাঁকড়ার খেলাঘর আর সামুদ্রিক খাবারের স্বাদ। তাই বারবার ফিরে আসতে ইচ্ছে করে এই সমুদ্র শহরে। দীঘা ভ্রমণ মানেই জীবনের ব্যস্ততায় একটুখানি শান্তির খোঁজ, সমুদ্রের বুকে আত্মাকে মুক্ত করার এক অনন্য অভিজ্ঞতা।













Leave a Reply