ওড়িশার কোনার্ক সূর্য মন্দির : সূর্যের রথে চেপে ইতিহাসের পথে এক অবিস্মরণীয় যাত্রা।

ভারতের প্রাচীন স্থাপত্যকলার ইতিহাসে কিছু নিদর্শন আছে, যা কেবল পাথরের গাঁথুনি নয়, এক যুগের গৌরবের সাক্ষ্য। ওড়িশার কোনার্ক সূর্য মন্দির এমনই এক অলৌকিক সৃষ্টি—যেখানে সূর্যের আলো, শিল্পীর মেধা এবং ধর্মের মহিমা একাকার হয়ে গেছে। আমার জীবনের অন্যতম স্মরণীয় ভ্রমণগুলির মধ্যে কোনার্কের এই সফরটি এক অনন্য অভিজ্ঞতা হয়ে আছে।


সূর্যের নগর কোনার্কে যাত্রা

ভুবনেশ্বর থেকে প্রায় ৬৫ কিলোমিটার দূরে, বঙ্গোপসাগরের তীরে অবস্থিত কোনার্ক। ভোরবেলায় সূর্যোদয়ের আলোয় সমুদ্রতীরের পথে গাড়ি ছুটছিল, আর প্রতিটি মুহূর্তে যেন মনে হচ্ছিল আমি ইতিহাসের গর্ভের দিকে এগিয়ে চলেছি। রাস্তার দুই পাশে তাল, নারকেল ও কাঁকড়া গাছের সারি, আর সমুদ্রের নোনা হাওয়া — যেন স্বাগত জানাচ্ছিল সূর্যের মন্দিরে আগমনকারীকে।


সূর্যের রথে গড়া এক মহাকাব্য

১৩শ শতকে গঙ্গবংশীয় রাজা নারসিংহদেব প্রথম এই মন্দির নির্মাণ করেন। বলা হয়, এটি এক বিশাল সূর্যরথের আকৃতিতে নির্মিত, যেখানে বারো জোড়া চাকা আর সাতটি ঘোড়া সূর্যদেবের রথ টানছে। সূক্ষ্ম কারুকার্যে গঠিত প্রতিটি চাকা আসলে একেকটি সূর্যঘড়ি—যা দিয়ে দিনের সময় নির্ধারণ করা যেত।

যখন প্রথমবার মন্দিরের সামনে দাঁড়ালাম, মুহূর্তেই বুঝলাম—এ শুধু স্থাপত্য নয়, এ যেন এক জীবন্ত কবিতা। পাথরের প্রতিটি ভাঁজে, প্রতিটি মূর্তিতে লুকিয়ে আছে ধর্ম, শিল্প ও জীবনের অনন্ত ছন্দ।


ভাস্কর্যের মহিমা

কোনার্ক সূর্য মন্দিরের কারুকার্য যেন এক বিস্ময়। এখানে পাথরের ভাস্কর্যে ফুটে উঠেছে নৃত্য, সঙ্গীত, প্রেম, যুদ্ধ, রাজনীতি, প্রকৃতি—সবই। মন্দিরের দেওয়ালে খচিত অসংখ্য দেব-দেবীর মূর্তি, অশ্বারোহী সৈনিক, গজদল, রাজসভা, আর নারী-মূর্তির কোমল ভঙ্গিমা যেন এক জীবন্ত ইতিহাসের চিত্রপট।

বিশেষভাবে মুগ্ধ করেছিল মন্দিরের “নৃত্যমণ্ডপ” বা নাচঘর। এখানে পাথরের গায়ে উৎকীর্ণ বিভিন্ন নৃত্যভঙ্গি দেখে মনে হয়েছিল—যেন দেবদূতেরা এখনো সেখানে নৃত্যরত।


সূর্য পূজা ও কিংবদন্তি

স্থানীয় কাহিনি অনুযায়ী, সূর্যদেব নিজেই নাকি এই স্থানে আশীর্বাদ দান করেছিলেন। প্রাচীন কালে কোনার্কে সূর্য উপাসনা অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল। ভোরে প্রথম সূর্যকিরণ পড়ত মন্দিরের মূল গর্ভগৃহে থাকা সূর্যদেবের মূর্তিতে—যা আজ আর নেই, কিন্তু ইতিহাসের পাতায় সেই অলৌকিক দৃশ্যের বর্ণনা অমর হয়ে আছে।


চন্দ্রভাগা সৈকতের টানে

মন্দির দর্শনের পর আমি গিয়েছিলাম কাছেই অবস্থিত চন্দ্রভাগা সৈকতে। এখানেই সূর্য উৎসবের সময় হাজার হাজার ভক্ত সূর্যোদয়ের সময় স্নান করেন। নীল সমুদ্রের গর্জন আর সোনালী আলোয় ভেজা বালুচর—এ যেন প্রকৃতি নিজেই সূর্যদেবের পূজা করছে।


ঐতিহ্য, শিল্প ও আত্মার মিলন

কোনার্ক সূর্য মন্দির কেবল একটি তীর্থস্থান নয়; এটি ভারতের স্থাপত্য ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ প্রতীক। ইউনেস্কো ঘোষিত World Heritage Site হিসাবে এই মন্দির মানবসৃষ্ট শিল্পের এক অনন্য উদাহরণ।

মন্দিরের প্রতিটি ইঞ্চি যেন একেকটি শিক্ষা—সময় অমর নয়, কিন্তু শিল্প অমর। আজ মন্দিরের অনেক অংশ ধ্বংসপ্রাপ্ত হলেও, তার গৌরব, তার শৌর্য, তার সৌন্দর্য আজও অটুট।


ভ্রমণের অনুভব

কোনার্ক ভ্রমণ আমাকে কেবল চোখের আনন্দই দেয়নি, দিয়েছে এক গভীর আধ্যাত্মিক উপলব্ধি। সূর্যদেবের এই মন্দিরের সামনে দাঁড়িয়ে মনে হয়েছিল—মানুষের মেধা ও ভক্তি মিলেই তৈরি করতে পারে চিরস্থায়ী সৌন্দর্য।

ভ্রমণ শেষে ফিরে আসার সময় সূর্যাস্তের আভায় যখন মন্দিরটি ধীরে ধীরে অন্ধকারে মিলিয়ে যাচ্ছিল, মনে হচ্ছিল—সূর্যদেব নিজেই যেন রথে চেপে অস্তগামী হচ্ছেন, কিন্তু তাঁর আলোর ছায়া রয়ে গেল আমার মনে চিরকাল।


উপসংহার:
কোনার্ক সূর্য মন্দির শুধু ওড়িশার নয়, সমগ্র ভারতের গৌরব। এখানে সূর্যের উপাসনা মানে জীবন, শক্তি, আলো ও অমরতার উপাসনা। যিনি একবার এখানে আসবেন, তাঁর মনে এই মহিমা চিরকাল দীপ্তি ছড়াবে—যেন সূর্য নিজেই তাঁর অন্তরে আলো জ্বেলে দেন।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *