
(যেখানে যুদ্ধের রক্তস্রোত মিলেছিল শান্তির সাদা জ্যোতিতে)
ভারতের ওড়িশা রাজ্যের রাজধানী ভুবনেশ্বর থেকে প্রায় আট কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এক ঐতিহাসিক স্থান — ধৌলি পাহাড়। এটি শুধু একটি পর্যটনকেন্দ্র নয়, বরং ভারতের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের প্রতীক। এখানেই রক্তাক্ত কলিঙ্গ যুদ্ধের শেষে সম্রাট অশোকের হৃদয়ে জেগেছিল বোধ, জেগেছিল করুণা, আর শুরু হয়েছিল তাঁর বৌদ্ধধর্ম গ্রহণের পথ।
ধৌলির বুকে দাঁড়িয়ে আজও সেই ইতিহাস যেন বাতাসে ভেসে আসে, নদীর জলে মিশে থাকে শান্তির মন্ত্র — “অহিংসা পরম ধর্ম।”
️ ইতিহাসের পটভূমি: রক্ত থেকে শান্তির জন্ম
প্রায় খ্রিস্টপূর্ব ২৬১ সালে সংঘটিত হয়েছিল ভয়ঙ্কর কলিঙ্গ যুদ্ধ। সম্রাট অশোক তাঁর সাম্রাজ্য বিস্তারের জন্য কলিঙ্গ (বর্তমান ওড়িশা) আক্রমণ করেন। যুদ্ধের শেষে পড়েছিল হাজার হাজার মৃতদেহ, রক্তে রাঙা হয়েছিল ধৌলি পাহাড়ের ঢাল ও দয়া নদীর জল।
অশোক নিজেই লিখেছিলেন তাঁর শিলালিপিতে —
“এই যুদ্ধ আমার হৃদয় বিদীর্ণ করে দিয়েছে। আর কখনও আমি এভাবে মানুষ হত্যা করব না।”
এইভাবেই ধৌলি পাহাড় হল অশোকের “রূপান্তরের ভূমি”, যেখানে এক রক্তপিপাসু রাজা পরিণত হলেন মানবতার দূত ও বৌদ্ধধর্মের রক্ষক।
শান্তি স্তূপ — ধৌলির হৃদয়
আজকের ধৌলির প্রধান আকর্ষণ হলো বিশাল শান্তি স্তূপ (Peace Pagoda), যা জাপানের নিপ্পনজো মায়োহোজি সংগঠনের সহযোগিতায় ১৯৭২ সালে নির্মিত হয়।
স্তূপটি সাদা রঙে মোড়ানো—যেন শান্তির প্রতীক। এর উপরে সোনালি বুদ্ধমূর্তি ও চারপাশে খোদাই করা দৃশ্যে দেখা যায় বুদ্ধের জীবনকাহিনি—জন্ম, বোধিলাভ, ধর্মচক্র প্রবর্তন ও মহাপরিনির্বাণ।
স্তূপের সামনে দাঁড়িয়ে মনে হয়, এই সাদা গম্বুজ যেন সমগ্র বিশ্বের প্রতি শান্তির আহ্বান জানাচ্ছে।
দয়া নদী — ইতিহাসের সাক্ষী
ধৌলি পাহাড়ের পাদদেশে বয়ে চলেছে দয়া নদী।
এই নদীর জলে নাকি একদিন কলিঙ্গ যুদ্ধে নিহত সৈনিকদের রক্ত মিশেছিল।
আজও নদীর ধারে দাঁড়ালে মনে হয় যেন সেই অতীতের আর্তনাদ ধীরে ধীরে শান্তির গানে রূপ নিয়েছে।
সূর্যাস্তের সময় নদীর ওপরে যখন সোনালি আলো পড়ে, তখন প্রকৃতি যেন নিজেই বলে — “রক্ত নয়, আলোই জীবন।”
অশোকের শিলালিপি
ধৌলি পাহাড়ের পাথরের গায়ে খোদাই করা আছে অশোকের শিলালিপি, যা তাঁর বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ ও মানবতাবাদের ঘোষণা বহন করে।
এখানে পালি ভাষায় লেখা বার্তাগুলিতে দেখা যায়, কেমনভাবে অশোক তাঁর প্রজাদের জন্য ন্যায়, দয়া ও ধর্মের আদর্শ প্রচার করেছিলেন।
এই শিলালিপি আজও ভারতের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অমূল্য সম্পদ।
ধৌলির পরিবেশ ও দৃশ্য
ধৌলি পাহাড়ের চূড়া থেকে দেখা যায় বিস্তীর্ণ সমভূমি ও দয়া নদীর বক্ররেখা।
চারপাশে সবুজ বনানী, বাতাসে ধূপের গন্ধ, আর স্তূপের ঘণ্টার মৃদু ধ্বনি — সব মিলিয়ে এক অপার্থিব শান্তি বিরাজ করে।
পর্যটকরা প্রায়ই এখানে বসে ধ্যান করেন। অনেকেই বলেন, এই জায়গার নিস্তব্ধতা তাদের মনে এনে দেয় এক গভীর প্রশান্তি।
দর্শনীয় স্থানসমূহ
ধৌলিতে শুধু শান্তি স্তূপই নয়, আরও কিছু উল্লেখযোগ্য স্থান রয়েছে —
- অশোক রক এডিক্টস (Rock Edicts) — প্রাচীন শিলালিপির মূল নিদর্শন।
- বুদ্ধ পার্ক — সবুজ পরিবেশে ধ্যান ও বিশ্রামের জন্য আদর্শ।
- ধৌলি গিরি মিউজিয়াম — যেখানে অশোক ও বৌদ্ধধর্ম সম্পর্কিত প্রত্নতাত্ত্বিক সামগ্রী সংরক্ষিত আছে।
- দয়া নদীর তীর — ফটোগ্রাফি ও সূর্যাস্ত উপভোগের জন্য বিখ্যাত।
ভ্রমণের অভিজ্ঞতা
ভুবনেশ্বর থেকে গাড়িতে ধৌলি যাওয়ার পথে দু’পাশে ধানক্ষেত, তালগাছ, আর গ্রামের মনোরম দৃশ্য চোখে পড়ে।
পাহাড়ের উপরে পৌঁছে যখন প্রথমবার শান্তি স্তূপ চোখে পড়ল, মনে হল — পৃথিবীর সমস্ত কোলাহল যেন মিলিয়ে গেল।
সাদা স্তূপের নিচে দাঁড়িয়ে বাতাসের মৃদু শব্দ শুনতে শুনতে মনে হচ্ছিল, অশোক যেন এখানেই এখনো বলছেন —
“অহিংসা পরম ধর্ম। শান্তিই মানবতার সর্বোচ্চ শক্তি।”
️ উপসংহার
ধৌলি কেবল একটি ভ্রমণস্থল নয়; এটি এক আত্মিক যাত্রার স্থান।
এখানে ইতিহাসের সঙ্গে মিশে আছে মানবতার শ্রেষ্ঠ শিক্ষা — ক্ষমা, করুণা ও শান্তি।
যে একবার ধৌলিতে আসে, সে শুধু পাহাড় দেখে না — সে দেখে এক সম্রাটের হৃদয়ের পরিবর্তন, এক জাতির চেতনার জাগরণ।
ধৌলির সাদা শান্তি স্তূপ আজও নিঃশব্দে পৃথিবীকে বলে যায় —
“যুদ্ধ নয়, শান্তিই চিরন্তন।” ️












Leave a Reply