ওড়িশার ভুবনেশ্বর – মন্দিরনগরীর মহিমায় এক অনন্ত যাত্রা।

ওড়িশার ভুবনেশ্বর – মন্দিরনগরীর মহিমায় এক অনন্ত যাত্রা
(ইতিহাস, সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিকতার এক অনন্য অধ্যায়)


ওড়িশার রাজধানী ভুবনেশ্বর শুধু একটি শহর নয়, এটি ভারতের আধ্যাত্মিক হৃদয়স্থল। একে বলা হয় — “মন্দিরের শহর” বা Temple City of India, কারণ এই শহরে প্রায় ৭০০টিরও বেশি প্রাচীন মন্দির রয়েছে, যেগুলি ওড়িশার শিল্প, সংস্কৃতি ও স্থাপত্যের ঐতিহ্য বহন করে চলেছে সহস্রাব্দ ধরে। এখানে ইতিহাসের গন্ধ মিশে আছে প্রতিটি পাথরের গায়ে, প্রতিটি গলির বাঁকে।


ইতিহাসের পাতায় ভুবনেশ্বর

ভুবনেশ্বরের নাম এসেছে ত্রিলোচনেশ্বর বা ভুবনেশ্বর মহাদেব থেকে — যিনি এই শহরের অধিষ্ঠাত্রী দেবতা।
প্রাচীন কলিঙ্গ সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল ভুবনেশ্বর, যেখানে রাজারা ধর্ম, শিল্প ও স্থাপত্যের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন।

খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীতে অশোকের কলিঙ্গ যুদ্ধ এই অঞ্চলে সংঘটিত হয়েছিল, যার সাক্ষী আজও ধৌলি পাহাড়। যুদ্ধ শেষে সম্রাট অশোক বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেন এবং শান্তির বার্তা প্রচার করেন। ফলে এই শহর হিন্দু, বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের মিলনস্থল হয়ে ওঠে।


স্থাপত্যের রত্ন – মন্দিরসমূহ

ভুবনেশ্বরের গর্ব তার অসাধারণ মন্দির স্থাপত্য। প্রতিটি মন্দিরের গঠন, শিলালিপি ও ভাস্কর্য যেন একেকটি জীবন্ত শিল্পকর্ম।

  1. লিঙ্গরাজ মন্দির – একাদশ শতকের এই মহাদেব মন্দিরটি ভুবনেশ্বরের প্রাণ। এখানে শিবকে ‘ত্রিভুবনেশ্বর’ নামে পূজা করা হয়। মন্দিরের টাওয়ারের উচ্চতা প্রায় ১৮০ ফুট, যা ওড়িশার কলিঙ্গ স্থাপত্যের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন।
  2. মুক্তেশ্বর মন্দির – “ওড়িশার রত্ন” নামে খ্যাত এই মন্দিরের সূক্ষ্ম খোদাই ও তোরণ (গেটওয়ে) ভারতীয় শিল্পকলার এক বিস্ময়।
  3. রাজরাণী মন্দির – এই মন্দিরটির বিশেষত্ব তার লালচে পাথর ও দারুণ ভাস্কর্য, যেখানে নারী-পুরুষের সৌন্দর্য ও মানবিক আবেগ ফুটে উঠেছে।
  4. ব্রহ্মেশ্বর মন্দির, আনন্ত বসুদেব মন্দির, যোগিনি মন্দির (হিরাপুর)—সবই ভুবনেশ্বরের ঐতিহাসিক রত্নভাণ্ডারের অংশ।

️ ধৌলি পাহাড় – শান্তির আলোকস্তম্ভ

ভুবনেশ্বর শহরের প্রায় ৮ কিমি দক্ষিণে ধৌলি পাহাড়, যেখানে সম্রাট অশোক কলিঙ্গ যুদ্ধের পর শান্তির পথে যাত্রা শুরু করেছিলেন।
আজও পাহাড়ের গায়ে খোদিত আছে তাঁর বৌদ্ধ শিলালিপি, এবং এখানে নির্মিত শান্তি স্তূপ (Peace Pagoda) সাদা গম্বুজে প্রতিফলিত করে বুদ্ধের করুণার আলো।


প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও আধুনিকতার মেলবন্ধন

ভুবনেশ্বর শুধু প্রাচীনতার শহর নয়, এটি এক আধুনিক নগরীরও প্রতীক। শহরের পরিকল্পনা এমনভাবে করা হয়েছে যে ঐতিহ্য ও আধুনিকতা হাতে হাত রেখে এগিয়েছে।
এখানে রয়েছে প্রশস্ত রাস্তা, সুন্দর উদ্যান, আধুনিক মিউজিয়াম, এবং নিকটবর্তী নন্দনকানন জুলজিক্যাল পার্ক, যা বন্যপ্রাণপ্রেমীদের জন্য এক অনন্য আকর্ষণ। এখানে দেখা যায় সাদা বাঘ, হাতি, হরিণ, নানা প্রজাতির পাখি ও প্রজাপতি।


‍♂️ ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতার মেলবন্ধন

ভুবনেশ্বরের পরিবেশে এক ধরনের প্রশান্তি রয়েছে। এখানে হিন্দুদের সঙ্গে বৌদ্ধ ও জৈন সাধকরা যুগ যুগ ধরে সহাবস্থান করেছেন।
কান্ডগিরি ও উদয়গিরি গুহা বৌদ্ধ স্থাপত্যের প্রাচীন নিদর্শন, যেখানে বুদ্ধভিক্ষুদের ধ্যানকক্ষ আজও ইতিহাসের কথা বলে।


খাবার ও উৎসবের ছোঁয়া

ওড়িশার স্বাদ এখানে প্রতিটি রাস্তার মোড়ে। ‘ছেনাপোড়া, দাহিবড়া-আলুদম, পাখালভাত’—সবই মুখরোচক ঐতিহ্যের অংশ।
এছাড়া শিবরাত্রি, দুর্গাপূজা, রথযাত্রা, ও কপিলেশ্বর মেলা শহরের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জীবনের প্রধান উৎসব।


✨ উপসংহার

ভুবনেশ্বর এক এমন শহর, যেখানে ইতিহাসের নীরব পাথর কথা বলে, যেখানে প্রাচীন মন্দিরের ছায়ায় আধুনিকতা প্রস্ফুটিত হয়েছে।
এখানে ভক্তি, স্থাপত্য, প্রকৃতি ও শান্তি – সবই একসঙ্গে বেঁধে রেখেছে মানবতার সুতোয়।

যে কেউ একবার ভুবনেশ্বর ঘুরে আসেন, তাঁর মনে থাকে শুধু এক অনুভূতি—
“এ শহরে ঈশ্বর এখনো বেঁচে আছেন, মন্দিরের প্রতিটি ঘণ্টাধ্বনিতে।”

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *