বাংলার বুকে এমন কিছু স্থান আছে, যেখানে ইতিহাস, শিল্প ও ধর্ম একসঙ্গে মিশে গেছে। বিষ্ণুপুর সেই রকমই এক শহর—যেখানে প্রতিটি ইট, প্রতিটি টেরাকোটা দেয়াল অতীতের গল্প বলে। বাঁকুড়া জেলার এই ঐতিহাসিক শহর একসময় ছিল মল্লভূম রাজ্যের রাজধানী, আর আজ এটি পশ্চিমবঙ্গের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গর্ব। টেরাকোটা শিল্প, দেবালয় স্থাপত্য ও ক্লাসিকাল সঙ্গীতের জন্য বিষ্ণুপুরের খ্যাতি সারা দেশজুড়ে।
অতীতের গল্প: মল্লভূমের রাজধানী
বিষ্ণুপুরের ইতিহাস জড়িয়ে আছে মল্লরাজাদের সঙ্গে, যারা ৭ম শতক থেকে ১৮শ শতক পর্যন্ত এই অঞ্চল শাসন করেন। মল্লরাজা বির হাম্বির ছিলেন বিষ্ণুপুরের স্বর্ণযুগের স্থপতি। রাজারা ছিলেন ভগবান বিষ্ণুর ভক্ত, আর তাঁদের অনুপ্রেরণাতেই গড়ে ওঠে অসংখ্য টেরাকোটা মন্দির। এই মন্দিরগুলোর ইটের গায়ে খোদাই করা গল্পগুলো—রামায়ণ, মহাভারত, কৃষ্ণলীলা, ও দৈনন্দিন জীবনের নানা দৃশ্য—আজও জীবন্ত হয়ে ওঠে।
️ দর্শনীয় স্থানসমূহ
- রাসমনচ
বিষ্ণুপুরের প্রতীক বলা চলে এই রাসমনচকে। ১৬০০ খ্রিষ্টাব্দে রাজা বির হাম্বির এটি নির্মাণ করেন। চৌকো গম্বুজাকৃতি এই স্থাপনাটি রাজ্যের রাস উৎসবে দেবমূর্তি রাখার জন্য ব্যবহার হত। টেরাকোটা নকশায় মোড়া এই বিশাল স্থাপনা রাতে আলোয় ঝলমল করে যেন অতীতের রাজকীয় গৌরবের কথা বলে। - মদনমোহন মন্দির
১৭শ শতকে রাজা দুর্গামদন দেব নির্মিত এই মন্দিরে টেরাকোটা শিল্পের নিখুঁত নিদর্শন দেখা যায়। মন্দিরের দেয়ালে কৃষ্ণের লীলা, রাধার প্রেম, আর ধর্মীয় জীবনের প্রতিচ্ছবি খোদিত আছে। - শ্যামরায় মন্দির
পাঁচ চূড়াবিশিষ্ট এই মন্দির স্থাপত্যের দিক থেকে অনন্য। মল্লভূমের শৈল্পিক রুচি এই মন্দিরে সবচেয়ে সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে। - জোড়বাংলা মন্দির (কেশবরায় মন্দির)
বাংলার গ্রামীণ গৃহের নকশায় তৈরি এই মন্দিরে রয়েছে সূক্ষ্ম টেরাকোটা খোদাই। রামায়ণ-মহাভারতের দৃশ্য এখানে যেন গল্পের মতো প্রাণ পায়। - লালজী মন্দির ও রাধাশ্যাম মন্দির
এগুলোও অষ্টাদশ শতকের ঐতিহাসিক নিদর্শন। লাল ইটের গায়ে সূক্ষ্ম নকশা, গম্বুজাকৃতি ছাদ এবং অলঙ্কৃত খিলান প্রতিটি শিল্পপ্রেমীর চোখে মুগ্ধতা জাগায়।
বিষ্ণুপুরের শিল্প ও সংস্কৃতি
বিষ্ণুপুর শুধু মন্দিরেই সীমাবদ্ধ নয়। এখানে জন্ম নিয়েছে বিষ্ণুপুর ঘরানার ধ্রুপদী সঙ্গীত, যার ছন্দে মল্লভূমের ঐতিহ্য প্রতিফলিত। এছাড়া এখানকার বালুচরি শাড়ি টেরাকোটা নকশার মতোই বিখ্যাত। এই শাড়িগুলিতে মন্দিরের দেয়ালের মতোই গল্প বোনা হয়—কৃষ্ণলীলা, রাজদরবার, পৌরাণিক কাহিনি।
ভ্রমণকারীর আকর্ষণ
- টেরাকোটা মন্দির দর্শন
- হস্তশিল্প ও বালুচরি শাড়ি কেনাকাটা
- রাস উৎসব ও মল্লরাজাদের ঐতিহ্যবাহী পালা দেখা
- মন্দির নগরীর প্রাচীন পাথরের রাস্তা ধরে হেঁটে বেড়ানো
️ ভ্রমণের সেরা সময়
অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময় বিষ্ণুপুর ভ্রমণের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত। এই সময় আবহাওয়া মনোরম, আর নভেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত হয় রাস উৎসব, যখন শহর জেগে ওঠে দেবদেবীর আরাধনায় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে।
কীভাবে পৌঁছাবেন
- ট্রেন – কলকাতা থেকে বিষ্ণুপুরের দূরত্ব প্রায় ১৩০ কিমি। হাওড়া থেকে সরাসরি ট্রেন পাওয়া যায়।
- রাস্তা – কলকাতা থেকে ডানকুনি-আরামবাগ হয়ে বিষ্ণুপুর পৌঁছাতে সময় লাগে প্রায় ৪ ঘণ্টা।
উপসংহার
বিষ্ণুপুরে পা রাখলেই মনে হয় যেন সময় থেমে গেছে। টেরাকোটা ইটের দেয়াল, পুরোনো গন্ধ, রাজাদের কাহিনি আর দেবভক্তির আবহে তৈরি এই শহর শুধু ইতিহাস নয়, এক জীবন্ত শিল্পকাব্য।
যারা ইতিহাস, শিল্প, স্থাপত্য ও শান্ত সৌন্দর্যের মেলবন্ধন খুঁজছেন—তাদের জন্য বিষ্ণুপুরের টেরাকোটা মন্দির ভ্রমণ হবে এক অনন্য অভিজ্ঞতা। ❤️













Leave a Reply