
ভূমিকা:- ভারতবর্ষের উৎসবগুলির মধ্যে এমন কিছু আছে, যেগুলি শুধু ধর্মীয় নয়, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও প্রতীক।
তেমনই একটি পূজা হলো কোজাগরী লক্ষ্মী পূজা।
বাঙালিদের কাছে দুর্গাপূজার পরেই আসে এই শুভ দিনটি — কোজাগরী পূর্ণিমা।
এই দিনে গৃহস্থের ঘরে ঘরে সম্পদের দেবী মা মহালক্ষ্মী-র পূজা হয় বিপুল আনন্দে ও শ্রদ্ধায়।
লক্ষ্মী শুধু ধনসম্পদের দেবী নন, তিনি গৃহশান্তি, সৌভাগ্য, ও পরিপূর্ণতার প্রতীক।
তাঁর আশীর্বাদে সংসারে সুখ-সমৃদ্ধি ও শান্তি বিরাজ করে — এমনই বিশ্বাস যুগে যুগে।
“কোজাগরী” শব্দের অর্থ ও উৎপত্তি
‘কোজাগরী’ শব্দটি সংস্কৃত ‘কো জাগরতি?’ (কে জাগছে?) থেকে এসেছে।
পৌরাণিক কাহিনি অনুযায়ী, লক্ষ্মীদেবী আশ্বিন মাসের পূর্ণিমার রাতে পৃথিবীতে অবতীর্ণ হন এবং জিজ্ঞাসা করেন —
“কে জাগছে?” (কো জাগরতি?)
যে ব্যক্তি সেদিন রাত্রে জাগে, ব্রত পালন করে ও ভক্তিভরে তাঁর নাম জপ করে, দেবী তার গৃহে প্রবেশ করেন ও আশীর্বাদ দেন ধন, ধান্য ও সমৃদ্ধিতে।
তাই এই পূর্ণিমা রাতকে বলা হয় কোজাগরী পূর্ণিমা, আর পূজাকে বলা হয় কোজাগরী লক্ষ্মী পূজা।
পৌরাণিক পটভূমি
পুরাণে লক্ষ্মীদেবীর নানা রূপের কথা বলা হয়েছে। তিনি বিষ্ণুর অর্ধাঙ্গিনী ও বৈকুণ্ঠের অধিষ্ঠাত্রী দেবী।
বলা হয়, সমুদ্র মন্থনের সময় তিনি উদ্ভূত হন কমল ফুলের ওপর বসে, হাতে শঙ্খ, চক্র, পদ্ম ও গদা নিয়ে।
তাঁর আবির্ভাবে দেবতা ও মানব উভয়ের জীবনে আসে সম্পদ ও শান্তির বর্ষা।
পদ্মপুরাণ ও লক্ষ্মীপুরাণ-এ বলা হয়েছে —
লক্ষ্মী দেবী সেই গৃহে বাস করেন, যেখানে থাকে পরিশুদ্ধতা, পরিশ্রম, সততা ও ধর্মানুশীলন।
অলসতা, অসত্য ও অশুচিতা যেখানে থাকে, সেখান থেকে তিনি দূরে থাকেন।
কোজাগরী লক্ষ্মী পূজার সময় ও তিথি
কোজাগরী পূজা অনুষ্ঠিত হয় আশ্বিন মাসের পূর্ণিমা তিথিতে (সেপ্টেম্বর–অক্টোবর মাসে)।
এই দিনটি শারদীয় দুর্গাপূজার অব্যবহিত পরেই আসে।
এই রাতে পূর্ণিমার চাঁদে আলোকিত আকাশ এক পবিত্র ও জাগ্রত শক্তির প্রতীক হিসেবে ধরা হয়।
এই দিনটি ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন নামে পরিচিত —
- পশ্চিমবঙ্গে — কোজাগরী লক্ষ্মী পূজা
- মহারাষ্ট্রে — কোজাগরী পূর্ণিমা উৎসব
- উত্তর ভারতে — শরৎ পূর্ণিমা
পূজার প্রস্তুতি ও আচার
১. গৃহপরিচ্ছন্নতা
লক্ষ্মীদেবী শুচিতা ও পবিত্রতার দেবী।
তাই পূজার কয়েকদিন আগে থেকেই ঘর, বারান্দা, উঠান সব ঝকঝকে করে তোলা হয়।
বাড়ির সামনে আলপনা আঁকা হয় পদ্মফুল ও শঙ্খের নকশায়, যা দেবী আগমনের প্রতীক।
২. পূজার সামগ্রী
- লক্ষ্মীর প্রতিমা বা ছবি
- ধান, দুধ, দই, মিষ্টি, ফলমূল, পদ্মফুল
- মোমবাতি, প্রদীপ, ধূপ, চন্দন, রঙিন আলপনা
- একটি ধানভর্তি কলস (প্রতীক: সমৃদ্ধি)
৩. পূজার সময়
সন্ধ্যা থেকে পূজা শুরু হয়, কিন্তু মূল আচার রাত জেগে পালন করা হয়।
কারণ এই রাতেই দেবী জিজ্ঞেস করেন — “কে জাগরতি?”
৪. ব্রত ও ভোগ
নারীরা লক্ষ্মী ব্রত পালন করেন, উপবাস রেখে দেবীর উদ্দেশে প্রার্থনা করেন।
ভোগ হিসেবে থাকে খিচুড়ি, নারকেল, কলা, পায়েস, মিষ্টান্ন ইত্যাদি।
পরে পরিবারের সকল সদস্য মিলে সেই ভোগ গ্রহণ করেন।
কোজাগরী পূর্ণিমার সঙ্গে বৈজ্ঞানিক তাৎপর্য
শরৎকালের এই পূর্ণিমা রাতে বাতাসে আর্দ্রতা কমে এবং প্রকৃতি পরিষ্কার থাকে।
বিজ্ঞানীরা বলেন — এই রাতে চাঁদের আলোয় অল্ট্রাভায়োলেট রশ্মি কম এবং ভিটামিন D-এর শোষণ বেশি হয়।
তাই অনেক অঞ্চলে মানুষ ঐ রাতে চাঁদের আলোয় দুধ পান করেন।
এটি শরীরের জন্য উপকারী এবং “চন্দ্রআলো থেরাপি”-র এক রূপ বলে মনে করা হয়।
️ ধর্মীয় তাৎপর্য
লক্ষ্মী দেবীর পূজার মাধ্যমে মানুষ আশীর্বাদ কামনা করে —
- সংসারে শান্তি ও সম্পদ,
- মনোবল ও পরিশ্রমের ফল,
- এবং জীবনের স্থিরতা।
এই পূজা মানুষকে শেখায় —
সম্পদ অর্জনের মূল মন্ত্র হল পরিশ্রম, সততা ও পবিত্রতা।
সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দিক
কোজাগরী পূজা কেবল ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি একটি পারিবারিক ও সামাজিক উৎসব।
এই দিনে —
- পরিবারের সকল সদস্য একত্রিত হয়ে পূজা করে,
- প্রতিবেশীদের সঙ্গে ভোগ ভাগ করে খায়,
- সমাজে সম্প্রীতি ও ঐক্য বৃদ্ধি পায়।
গ্রামীণ বাংলায় এই দিনে ধানের ক্ষেতেও পূজা হয়, কারণ এটি নতুন ফসলের মৌসুমের সূচনা।
অনেক কৃষক এই দিনকে “আশীর্বাদের রাত” বলে মানেন।
কোজাগরী পূজার সঙ্গে কৃষিজীবনের সম্পর্ক
লক্ষ্মী দেবীকে কৃষির দেবী হিসেবেও মানা হয়।
বাংলার কৃষকরা বিশ্বাস করেন —
যে ঘরে ধান থাকে, সেই ঘরে লক্ষ্মী থাকে।
তাই পূজার রাতে নতুন ধান, চাল ও তিল দিয়ে দেবীকে নিবেদন করা হয়।
“লক্ষ্মী এলো ধানে ধানে, হাসি এলো প্রাণে প্রাণে”—
এই বিশ্বাসই বাংলার চিরন্তন গ্রামীণ জীবনের অংশ।
শিল্প ও সাহিত্যে কোজাগরী পূজার প্রতিফলন
বাংলা সাহিত্যে লক্ষ্মী পূজার উল্লেখ বহুবার পাওয়া যায়।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জীবনানন্দ দাশ, মদনমোহন তর্কালঙ্কার প্রমুখ কবি তাঁদের রচনায় এই পূর্ণিমার পবিত্রতার বর্ণনা দিয়েছেন।
লোকসংগীতে আজও শোনা যায় —
“কোজাগরী নিশি, ঘরে ঘরে জাগে আলো,
লক্ষ্মী মা আসেন পদ্মপাতে ভাসি ভাসি ভালো।”
কোজাগরী পূজার আধুনিক তাৎপর্য
আজকের দিনে অর্থ, ভোগবাদ ও ব্যস্ত জীবনে মানুষ প্রায়ই শান্তি হারিয়ে ফেলে।
এই পূজা আমাদের মনে করিয়ে দেয় —
সত্যিকার সমৃদ্ধি কেবল টাকাপয়সায় নয়, পরিবার, ভালোবাসা ও নৈতিকতায়।
তাই আধুনিক সমাজেও কোজাগরী পূজার শিক্ষাটি সমান প্রাসঙ্গিক —
“পরিশ্রম করো, সততার পথে চলো, তাহলেই দেবীর আশীর্বাদ লাভ করা সম্ভব।”
উপসংহার
কোজাগরী লক্ষ্মী পূজা শুধু ধনলাভের প্রার্থনা নয়;
এটি এক নৈতিক ও মানসিক শুদ্ধতার উৎসব।
এদিনে মানুষ নিজের জীবনকে বিশুদ্ধ করে তোলার, সংসারে ঐক্য স্থাপনের ও সত্যপথে চলার শপথ নেয়।
পূর্ণিমার চাঁদ যেমন আলো ছড়িয়ে দেয় অন্ধকারে,
তেমনি লক্ষ্মীদেবীর আশীর্বাদ আলো ছড়ায় মানুষের জীবনে,
দূর করে দুঃখ, দারিদ্র্য ও অশান্তি।
কোজাগরী পূর্ণিমার প্রার্থনা:
“হে লক্ষ্মী মা, আমাদের ঘর ভরো ধনে নয়, ভরো ধর্মে ও প্রেমে।
পরিশ্রমে দাও শক্তি, সততায় দাও জয়, শান্তিতে দাও আশ্রয়।”












Leave a Reply