গল্পের নাম: চিঠি ফেরত
১.
অরণ্য জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। বাইরে হালকা বৃষ্টি পড়ছে—ঝিরিঝিরি, মৃদু, মন খারাপ করা বৃষ্টি। আকাশটা ধূসর, কিন্তু তার মনের ভিতরটা যেন আরও কালো। হাতে ধরা পুরোনো একটা খাম—তাতে লেখা,
“রূপা বিশ্বাস, কলকাতা।”
চিঠিটা আজও পৌঁছায়নি। তিন বছর হয়ে গেছে, কিন্তু সে এখনো সেই চিঠিটা ডাকবাক্সে ফেলতে পারেনি। কেন জানে না—সম্ভবত ওর কাছে এই চিঠিই শেষ সংযোগ, যেটা হারালে রূপাও একেবারে হারিয়ে যাবে।
রূপা—তার জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল নাম, আবার সবচেয়ে বেদনাময় অধ্যায়।
২.
তিন বছর আগে, রূপাকে প্রথম দেখেছিল অরণ্য কলকাতার কলেজ স্ট্রিটের একটা পুরোনো বইয়ের দোকানে। রূপা তখন “রবীন্দ্রনাথের চিঠিপত্র” খুঁজছিল, আর অরণ্যও একই বই হাতে নিয়েছিল। দু’জনের হাত একসাথে ছুঁয়ে যায়।
রূপা হেসে বলেছিল,
— “তুমি আগে নাও, আমি পরে নেব।”
অরণ্য শুধু তাকিয়ে ছিল সেই হাসিতে।
সেই দিন থেকেই একটা গল্প শুরু হয়েছিল, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রেমে গাঢ় হয়েছিল।
তারা দু’জন বইয়ের দোকান, কফি হাউস, কলেজের পর ঘুরতে যেত বৌবাজারের রাস্তা ধরে, আর সন্ধ্যায় গঙ্গার ঘাটে বসে নিরবে সূর্যাস্ত দেখত। রূপা কবিতা ভালোবাসত, অরণ্য ভালোবাসত রূপাকে।
রূপার মুখে ছিল এক অদ্ভুত শান্তি—যেন নদীর ঢেউয়ে ভেসে থাকা চাঁদের আলো।
৩.
একদিন রূপা বলেছিল,
— “জানো অরণ্য, প্রেম মানে শুধু পাওয়া নয়, প্রেম মানে কখনও হারিয়ে যাওয়া। প্রেম মানে অপেক্ষা।”
অরণ্য তখন হেসে বলেছিল,
— “তুমি হারিয়ে যেও না যেন।”
কিন্তু মানুষ কি সবসময় কথা রাখে?
রূপার বাবার চাকরি বদলি হয়ে যায় দিল্লিতে। রূপাকে যেতে হয়, অরণ্যের জীবন থমকে যায় সেই দিন থেকেই। প্রথম কয়েক মাস নিয়মিত চিঠি, ফোন, মেসেজ — কিন্তু তারপর ধীরে ধীরে যোগাযোগ কমতে থাকে।
একদিন অরণ্য খবর পায়—রূপা অন্য কাউকে বিয়ে করেছে।
চোখের সামনে যেন সবকিছু ভেঙে যায়। কফি হাউসের টেবিল, গঙ্গার ধারে বসে থাকা, সেই প্রিয় মুখ—সব যেন একসাথে মুছে যায় ধূসর কুয়াশায়।
৪.
অরণ্য চিঠি লিখেছিল সেই রাতে।
চিঠিটা এমন—
“রূপা,
তুমি কি জানো, এখনো আমি বইয়ের দোকানে ঢুকলে তোমার হাসিটা শুনতে পাই?
তুমি কি জানো, গঙ্গার ধারে বসলে তোমার কণ্ঠে রবীন্দ্রসঙ্গীত বাজে?
আমি তোমাকে দোষ দিই না। হয়তো ভাগ্যই আমাদের গল্পটা অসমাপ্ত রেখেছিল।
কিন্তু আমি আজও সেই অসমাপ্ত বাক্যটা শেষ করতে চাই—
আমি তোমাকে ভালোবাসি, রূপা।
সবকিছুর পরেও।”
চিঠিটা লেখা হয়েছিল তিন বছর আগে। কিন্তু এখনো পাঠানো হয়নি।
৫.
সময়ের নদী বয়ে যায়। অরণ্য এখন স্কুলের শিক্ষক। চশমার কাচে বয়সের ছোঁয়া, কিন্তু হৃদয়ে এখনো রূপার ছবি ঝুলে আছে।
প্রতিদিন রাতে টেবিল ল্যাম্প জ্বেলে সে একই চিঠিটা পড়ে।
কিন্তু আজ হঠাৎ তার মনে হলো—সময় এসেছে। আজ চিঠিটা পৌঁছে দেবে।
সে বেরিয়ে পড়ল বৃষ্টির মধ্যে। পোস্ট অফিসের দিকে হাঁটছে। চারপাশে গন্ধ ছড়াচ্ছে ভেজা মাটির, মনে পড়ছে সেই দিন, যখন রূপা বলেছিল—
“অরণ্য, যদি কোনোদিন আমি না থাকি, তুমি আমার জন্য একটা চিঠি লিখবে তো?”
আজ সেই প্রতিজ্ঞা পূর্ণ হবে।
৬.
পোস্ট অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে অরণ্য খামের দিকে তাকাল।
তারপর হঠাৎ মনে হলো—রূপা তো হয়তো এই ঠিকানায় আর নেই। হয়তো নতুন জীবন, নতুন শহর, নতুন মানুষ।
তাহলে এই চিঠি যাবে কোথায়?
তবু সে খামটা ডাকবাক্সে ফেলল।
একটু হালকা লাগল বুকটা। যেন একটা দীর্ঘ বোঝা নেমে গেল।
কিন্তু ভাগ্য কি এত সহজে শান্তি দেয়?
৭.
দুই সপ্তাহ পর অরণ্যের দরজায় কড়া পড়ল।
ডাকপিয়ন বলল—
“চিঠিটা ফেরত এসেছে, স্যার। ঠিকানাটি ভুল।”
খামটা হাতে নিতেই অরণ্যের বুক হিম হয়ে গেল।
খামের উপর বড় করে লেখা —
“Return to Sender.”
চিঠি ফেরত এসেছে।
রূপা আর নেই সেই ঠিকানায়। হয়তো নেই এই পৃথিবীতেই।
৮.
সেই রাতে অরণ্য দীর্ঘ সময় চুপচাপ বসে ছিল জানালার পাশে। বাইরে আবার বৃষ্টি পড়ছিল।
হঠাৎ তার মনে হলো, জানলার কাচে কেউ আঙুল বুলিয়ে লিখছে—
“আমি তোমার চিঠি পেয়েছি…”
অরণ্য কেঁপে উঠল।
জানলার বাইরে মেঘের ফাঁকে দেখা গেল রূপার হাসিমুখ—হালকা, নরম, বৃষ্টিভেজা।
চোখের জল গড়িয়ে পড়ল তার খোলা চিঠির উপর।
সেই জলেই যেন মুছে গেল তিন বছরের অপেক্ষা, সব অভিযোগ, সব অভিমান।
৯.
সকালে অরণ্য তার চিঠিটা নতুন খামে ভরে রাখল। উপরে লিখল—
“রূপা, যেখানেই থাকো…”
চিঠিটা সে এবার পাঠাল আকাশের ঠিকানায়।
গঙ্গার ধারে গিয়ে জলে ভাসিয়ে দিল খামটা।
জলের ঢেউয়ে ভেসে গেল সেই কাগজের টুকরো, রূপার নাম, আর অরণ্যের সমস্ত বেদনা।
১০.
বছর পেরিয়ে যায়।
অরণ্য আজও কলেজ স্ট্রিটে যায়, বই কিনে, বৃষ্টিতে হাঁটে, মাঝে মাঝে মনে হয়—রূপা ঠিক পাশে আছে।
কারণ ভালোবাসা কখনও মরে না।
চিঠি ফেরত আসতে পারে, মানুষ চলে যেতে পারে, কিন্তু প্রেমের চিঠি কখনও হারায় না।
সেগুলো বাতাসে ভেসে থাকে, আকাশে, নদীর জলে, বা কোনো অচেনা জানলার পাশে।
উপসংহার
“চিঠি ফেরত” কেবল একটি প্রেম-বিরহের গল্প নয়, এটি সময়ের, অপেক্ষার, আর নিঃশব্দ ভালোবাসার গল্প।
কখনও কখনও, যাকে আমরা হারাই, সে থেকেই শিখি ভালোবাসার অর্থ—যে প্রেম পাওয়া যায় না, সেটাই সবচেয়ে চিরন্তন হয়।













Leave a Reply