তামিলনাড়ুর উটি — দক্ষিণ ভারতের রাণী পাহাড়ের স্বর্গরাজ্য।

দক্ষিণ ভারতের মনোরম নীলগিরি পর্বতমালার কোলে অবস্থিত উটি (Ooty) বা উধগমণ্ডলম এক অপার সৌন্দর্যময় পাহাড়ি শহর, যাকে অনেকে স্নেহভরে বলেন— “দক্ষিণ ভারতের রাণী পাহাড়”। কর্ণাটক ও কেরালার সীমান্ত ছুঁয়ে থাকা তামিলনাড়ুর এই অপরূপ পাহাড়ি শহর প্রকৃতিপ্রেমী, নবদম্পতি ও ভ্রমণপিপাসুদের অন্যতম প্রিয় গন্তব্য।


উটির ইতিহাস ও পরিচয়

উটির ইতিহাস শুরু হয় ব্রিটিশ আমলে। ১৮২০ সালের দিকে ইংরেজ আধিকারিক জন সুলিভান প্রথম এই অঞ্চলকে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলেন। তিনি এখানকার পাহাড়, হ্রদ, ও ফুলে ভরা উপত্যকাগুলিকে দেখে একে ব্রিটিশ অফিসারদের গ্রীষ্মকালীন আস্তানা হিসেবে বেছে নেন। পরে এখানে গড়ে ওঠে ইউরোপীয় ধাঁচের কটেজ, চার্চ, এবং বাগান— যা আজও তার ঔপনিবেশিক ঐতিহ্যের সাক্ষ্য বহন করে।


উটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য

উটির সৌন্দর্যের মূল আকর্ষণ তার সবুজ নীলগিরি পর্বত, চা-বাগান, এবং নরম কুয়াশার চাদরে মোড়া উপত্যকা। এখানে ভোরবেলা কুয়াশার ফাঁকে সূর্যের লালচে আভা যে মায়াবী দৃশ্য তৈরি করে, তা যেন রূপকথার কোনো রাজ্যের মতো লাগে।

সবচেয়ে বিখ্যাত হলো উটি লেক, যা ১৮২৪ সালে তৈরি হয়। নৌকায় ভেসে এই হ্রদের চারপাশের পাহাড়, ফুলবাগান ও পাইন গাছের সারি দর্শন সত্যিই এক স্বপ্নময় অভিজ্ঞতা।


উটির দর্শনীয় স্থানসমূহ

১. বোটানিক্যাল গার্ডেন (Government Botanical Garden)

প্রায় ৫৫ একর জায়গা জুড়ে বিস্তৃত এই উদ্যানটি ১৮৪৭ সালে প্রতিষ্ঠিত। এখানে দেখা যায় ২০০০ বছরের পুরনো গাছ, রঙিন অর্কিড ও নানারকম পাহাড়ি ফুল। গ্রীষ্মে এখানে অনুষ্ঠিত হয় ফ্লাওয়ার শো, যা হাজার হাজার পর্যটককে টানে।

২. উটি লেক (Ooty Lake)

চা বাগানের মাঝখানে অবস্থিত এই মানুষ-নির্মিত হ্রদে প্যাডেল বোট বা মোটর বোটে ঘুরে দেখা যায় নীলগিরির অনন্য সৌন্দর্য।

️ ৩. ডড্ডাবেটা পিক (Doddabetta Peak)

উটির সর্বোচ্চ চূড়া, এখান থেকে পুরো নীলগিরি উপত্যকার প্যানোরামিক দৃশ্য চোখে পড়ে। ভোরে এখানে সূর্যোদয় দেখা এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা।

৪. চা ও গোলাপ বাগান

উটির চা-বাগান ভারতের সেরা গুলির মধ্যে একটি। এখানে আপনি দেখতে পাবেন সবুজ পাতার সারি, চা তৈরির প্রক্রিয়া এবং কিনতে পারবেন বিশুদ্ধ পাহাড়ি চা। পাশাপাশি উটির রোজ গার্ডেন-এ ২০,০০০-এরও বেশি প্রজাতির গোলাপ ফুটে থাকে।

৫. নীলগিরি মাউন্টেন রেলওয়ে

ইউনেস্কো স্বীকৃত এই হেরিটেজ ট্রেনটি মেট্টুপালয়ম থেকে উটি পর্যন্ত চলে, পথে দেখা যায় ঝর্ণা, সুড়ঙ্গ, ও সবুজ পাহাড়ের রূপ। এটি ভারতের অন্যতম মনোমুগ্ধকর ট্রেনযাত্রা হিসেবে পরিচিত।


️ আবহাওয়া ও ভ্রমণের সেরা সময়

উটির আবহাওয়া সারা বছরই মনোরম, তবে ভ্রমণের জন্য এপ্রিল থেকে জুন এবং সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সময়টি শ্রেষ্ঠ। গ্রীষ্মে আবহাওয়া ঠান্ডা, আর বর্ষায় পাহাড়ের রূপ আরও অপার হয়ে ওঠে।


স্থানীয় খাবার ও কেনাকাটা

উটির বাজারে চা, কফি, ঘরে তৈরি চকলেট ও মশলার সুবাসে মন ভরে যায়। এখানে পাওয়া যায় হোমমেড চকলেট, যা উটির অন্যতম বিশেষ আকর্ষণ। স্থানীয় খাবারের মধ্যে ইডলি, ডোসা, সাম্ভার, আর গরম চায়ের সঙ্গে চিপস বা পকোড়া বেশ জনপ্রিয়।


কীভাবে পৌঁছাবেন

  • রেলপথে: মেট্টুপালয়ম স্টেশন নিকটতম। সেখান থেকে নীলগিরি মাউন্টেন ট্রেনে উটি পৌঁছানো যায়।
  • সড়কপথে: কোয়েম্বাটুর (প্রায় ৮৮ কিমি) বা বেঙ্গালুরু থেকে বাস বা গাড়িতে উটি যাওয়া যায়।
  • বিমানপথে: নিকটতম বিমানবন্দর কোয়েম্বাটুর।

শেষকথা

উটি কেবল একটি পাহাড়ি শহর নয়, এটি প্রকৃতির এক জীবন্ত চিত্রকল্প— যেখানে নীল আকাশ, সবুজ পাহাড়, চা-বাগানের সুবাস, আর ঠান্ডা হাওয়ার স্পর্শ মিলেমিশে এক স্বর্গীয় অভিজ্ঞতা তৈরি করে। একবার যদি কেউ উটির এই মায়াময় সৌন্দর্য দেখে ফেলেন, তবে তার হৃদয়ে চিরদিনের জন্য জায়গা করে নেবে এই “রাণী পাহাড়”

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *