
দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যের করমণ্ডল উপকূলে, বঙ্গোপসাগরের তীরে অবস্থিত মহাবলিপুরম (বর্তমান নাম মামাল্লপুরম) ভারতের প্রাচীন ইতিহাস, স্থাপত্য, শিল্পকলার এক অনন্য সাক্ষী। সমুদ্রের গর্জন, বালুকাবেলায় খোদাই করা মন্দির ও পাথরের ভাস্কর্যে ঘেরা এই শহর একদিকে যেমন ইতিহাসের গর্ব, অন্যদিকে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের প্রতীক।
️ ঐতিহাসিক পটভূমি
মহাবলিপুরমের নাম এসেছে পৌরাণিক রাজা মহাবলী থেকে। তবে এর খ্যাতি শুরু হয় সপ্তম শতাব্দীতে পল্লব রাজবংশের শাসনকালে, বিশেষত রাজা নারাসিম্ভবর্মণ প্রথম (মামল্ল)-এর আমলে। তাই শহরের আরেক নাম মামাল্লপুরম।
তখনই এখানে শুরু হয় পাথরের গায়ে মন্দির খোদাই, গুহামন্দির নির্মাণ ও মনোলিথিক স্থাপত্যের বিস্ময়কর অধ্যায়। আজ মহাবলিপুরমের মন্দিরগুচ্ছ ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে স্বীকৃত, যা ভারতীয় শিল্পকলার গর্ব।
প্রকৃতি ও পরিবেশ
মহাবলিপুরম এক অনন্য স্থানে অবস্থিত— একদিকে নীল সমুদ্র, অন্যদিকে প্রাচীন পাথুরে পাহাড়। সকালে যখন সূর্যের প্রথম আলো সমুদ্রতীরের মন্দিরচূড়ায় পড়ে, তখন পুরো শহরটি যেন সোনার আলোর পরশে ঝলমল করে ওঠে।
বাতাসে নোনা গন্ধ, ঢেউয়ের ছন্দ আর পাথরের কারুকাজ— সব মিলিয়ে এটি এমন এক জায়গা যেখানে ইতিহাস ও প্রকৃতি হাত ধরে হাঁটে।
দর্শনীয় স্থানসমূহ
১. শোর টেম্পল (Shore Temple)
বঙ্গোপসাগরের তীরে অবস্থিত এই মন্দির মহাবলিপুরমের প্রতীক। সপ্তম শতাব্দীতে নির্মিত এই মন্দিরটি পল্লব রাজাদের দক্ষ স্থাপত্যকলার নিদর্শন। এটি শিব ও বিষ্ণু দেবতার উদ্দেশ্যে নিবেদিত এবং সমুদ্রতীরে দাঁড়িয়ে যেন অতীতের সাক্ষী হয়ে আছে। সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময় এই মন্দিরের রূপ সত্যিই অবর্ণনীয়।
️ ২. পঞ্চ রথ (Five Rathas)
একই পাথরের ব্লক থেকে খোদাই করা পাঁচটি রথ, যা মহাভারতের পাণ্ডবদের নামে পরিচিত— ধর্মরাজ, ভীম, অর্জুন, নকুল, সহদেব। এই স্থাপত্যগুলি ভারতের প্রথম মনোলিথিক ভাস্কর্যের উৎকৃষ্ট উদাহরণ।
৩. অর্জুনের তপস্যা (Arjuna’s Penance)
বিশ্বের বৃহত্তম শিলাচিত্রগুলির একটি এটি। বিশাল এক পাথরের গায়ে খোদাই করা এই ভাস্কর্য মহাভারতের অর্জুনের তপস্যা ও গঙ্গা অবতরণের পৌরাণিক কাহিনি চিত্রিত করেছে। এর সূক্ষ্ম শিল্পকর্ম ও জীবন্ত ভঙ্গি দর্শকদের মুগ্ধ করে।
৪. গুহামন্দির ও মণ্ডপ
মহাবলিপুরমে আছে একাধিক গুহামন্দির, যেমন বর্মন মণ্ডপ, মহিষাসুরমর্দিনী গুহা, কৃষ্ণ মণ্ডপ ইত্যাদি। প্রতিটি গুহায় পৌরাণিক গল্প খোদাই করা হয়েছে সূক্ষ্ম নিপুণতায়।
৫. কৃষ্ণের মাখন বল (Krishna’s Butter Ball)
এক বিশাল গোলাকার পাথর শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে একটি ঢালে স্থির হয়ে আছে। প্রকৃতির এই বিস্ময়কর দৃশ্য দেখলে মনে হয় যেন কোনো অলৌকিক শক্তিই এটি স্থির রেখেছে!
️ ভ্রমণের সেরা সময়
অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত মহাবলিপুরম ভ্রমণের আদর্শ সময়। এই সময় আবহাওয়া মনোরম থাকে এবং সমুদ্রতীরে হাঁটার বা ঐতিহাসিক স্থানগুলি ঘুরে দেখার উপযুক্ত পরিবেশ থাকে। গ্রীষ্মে তাপমাত্রা অনেক বেশি থাকায় সেই সময় এড়ানো ভালো।
খাবার ও স্থানীয় অভিজ্ঞতা
মহাবলিপুরমের উপকূলীয় অবস্থানের কারণে এখানে সামুদ্রিক খাবারের প্রাচুর্য— যেমন গ্রিল ফিশ, প্রন কারি, ক্র্যাব ফ্রাই ইত্যাদি। এছাড়াও দক্ষিণ ভারতীয় দোসা, ইডলি, সাম্ভার প্রতিটি রেস্তোরাঁয় সহজলভ্য।
শহরের ছোট দোকানগুলিতে বিক্রি হয় পাথরের তৈরি শিল্পকর্ম, গয়না, ও মহাবলিপুরমের ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্প— পর্যটকদের জন্য দারুণ স্মারক।
কীভাবে পৌঁছাবেন
- বিমানপথে: নিকটতম বিমানবন্দর চেন্নাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, প্রায় ৬০ কিমি দূরে।
- রেলপথে: নিকটতম রেলস্টেশনও চেন্নাই। সেখান থেকে ট্যাক্সি বা বাসে মহাবলিপুরম পৌঁছানো যায়।
- সড়কপথে: ইস্ট কোস্ট রোড (ECR) ধরে চেন্নাই থেকে প্রায় ১.৫ ঘণ্টার মনোরম ড্রাইভেই পৌঁছে যাওয়া যায়।
সমাপ্তি
মহাবলিপুরম কেবল একটি পর্যটন কেন্দ্র নয়— এটি ভারতীয় সভ্যতা ও স্থাপত্যকলার এক জীবন্ত দলিল। এখানে পাথরের ভেতর গাঁথা আছে ভক্তি, নন্দনশিল্প ও প্রকৃতির মিলন। সমুদ্রের গর্জন, মন্দিরের নিঃশব্দতা, আর পাথরের শিল্পকলার ঐশ্বর্য মিলেমিশে মহাবলিপুরমকে করেছে এক অবিনশ্বর সৌন্দর্যের প্রতীক।
একবার যারা এই স্থান ভ্রমণ করেছেন, তাঁদের মনে চিরকাল রয়ে যায় সমুদ্রতীরে খোদাই করা সেই প্রাচীন ইতিহাসের মায়াময় প্রতিধ্বনি।












Leave a Reply