ভ্রমণ প্রবন্ধ: মুর্শিদাবাদের কাঠগোলা বাগানবাড়ি — ইতিহাস ও সৌন্দর্যের মেলবন্ধন।

পশ্চিমবঙ্গের ঐতিহাসিক জেলা মুর্শিদাবাদ এমন এক ধনভাণ্ডার, যেখানে প্রতিটি ইট-পাথর, প্রতিটি বৃক্ষ যেন অতীতের রাজকীয় কাহিনি শুনিয়ে যায়। হাজারদুয়ারি, নিমতলা কেল্লা, কাতরা মসজিদ—এদের মতোই আরেকটি অপরূপ ঐতিহাসিক স্থাপত্য হল কাঠগোলা বাগানবাড়ি। ইতিহাস, শিল্প, ও প্রাচীন বাঙালি জমিদারি সংস্কৃতির এক অনন্য নিদর্শন এই স্থাপত্যটি আজও পর্যটকদের মোহিত করে চলেছে।


️ ইতিহাসের পাতায় কাঠগোলা বাগানবাড়ি

কাঠগোলা বাগানবাড়ি নির্মিত হয়েছিল শেঠ পরিবার বা জৈন ব্যবসায়ী পরিবার কর্তৃক। এই পরিবারটি মূলত মারোয়ারি ব্যবসায়ী ছিলেন, যাঁরা নবাব সিরাজউদ্দৌলার আমল থেকেই মুর্শিদাবাদে ব্যবসার সূত্রপাত করেন। তাঁদের বিশাল ধনসম্পদ, জমিদারি ও ব্যবসায়িক দক্ষতার প্রতীক হিসেবে ১৮৭৩ সালে এই প্রাসাদতুল্য বাগানবাড়িটি তৈরি হয়।

“কাঠগোলা” নামটির উৎস সম্পর্কে বিভিন্ন মত আছে। কেউ বলেন, একসময় এই স্থানে কাঠের ব্যবসা হত, তাই “কাঠগোলা”। আবার কেউ কেউ বলেন, এখানে প্রচুর কাঠগোলাপ গাছ ছিল, তাই এই নাম।


প্রাসাদ ও বাগানের নকশা

কাঠগোলা বাগানবাড়ির স্থাপত্য একদিকে যেমন ইউরোপীয় স্টাইলের প্রভাব বহন করে, তেমনই তাতে ভারতীয় ঐতিহ্যের রেশও রয়েছে। সাদা ও হলুদ রঙের প্রাসাদটির সামনে রয়েছে সবুজে ঘেরা বিশাল বাগান, যেখানে নানা প্রজাতির ফুল, আম, কাঁঠাল, ও বকুল গাছের ছায়ায় পরিবেশ যেন অন্য জগৎ তৈরি করে।

প্রাসাদের ভিতরে প্রবেশ করলে চোখে পড়ে—বড় বড় কলাম, উচ্চ ছাদ, কাঁচের জানালা, ইউরোপীয় মূর্তি, পুরনো চিত্রকলা ও ঝাড়বাতি। এখানকার মার্বেল ফ্লোররোমান শৈলীর সিঁড়ি দর্শনার্থীদের যেন সময়ের পিছনে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।


️ সংগ্রহশালা ও নিদর্শন

কাঠগোলা বাগানবাড়ির একাংশ বর্তমানে জৈন মিউজিয়াম হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এখানে রাখা আছে জৈন ধর্মের দেব-দেবীর মূর্তি, প্রাচীন কাচের সামগ্রী, সোনার গয়না, রূপার বাসনপত্র, পুরনো বন্দুক ও রাজকীয় পোশাক।

বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য একটি কক্ষ হলো “হাতির ঘর”, যেখানে একসময় রাজপরিবারের হাতিগুলি রাখার ব্যবস্থা ছিল। এছাড়া আছে ছোট্ট একটি জৈন মন্দির, যার স্থাপত্য শৈলী অপূর্ব সুন্দর।


কাঠগোলা বাগানবাড়ির সৌন্দর্য

বাগানবাড়িটির চারপাশের পরিবেশ একেবারে ছবির মতো মনোরম। বসন্তকালে ফুলের রঙিন সমারোহ, পাখির কলতান ও ইতিহাসের নিঃশব্দ প্রতিধ্বনি একসঙ্গে মিশে এক অনন্য আবহ তৈরি করে। সন্ধ্যাবেলায় সূর্যাস্তের আলোয় প্রাসাদটি যেন সোনালি রঙে ঝলমল করে ওঠে — যেন কোনো পুরনো রাজবাড়ির রূপকথার পৃষ্ঠা জীবন্ত হয়ে উঠেছে।


কীভাবে পৌঁছানো যায়

  • রেলপথে: কলকাতা থেকে বহরমপুর কোর্ট স্টেশন পর্যন্ত ট্রেনে পৌঁছানো যায়। সেখান থেকে টোটো বা গাড়ি ভাড়া করে সহজেই কাঠগোলা বাগানবাড়িতে যাওয়া যায় (প্রায় ৪ কিমি দূরত্ব)।
  • সড়কপথে: NH34 ধরে মুর্শিদাবাদ যাওয়ার পথে বহরমপুর বা লালবাগ থেকে রাস্তাটি সহজেই সংযুক্ত।
  • জলপথে: ভাগীরথী নদীর অপর প্রান্ত থেকেও নৌকাযোগে পৌঁছানো যায় এই ঐতিহাসিক বাগানবাড়িতে।

️ ভ্রমণের উপযুক্ত সময়

অক্টোবর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত সময়টি কাঠগোলা বাগানবাড়ি দর্শনের জন্য আদর্শ। শীতকালে মনোরম আবহাওয়া, নির্মল আকাশ এবং পরিষ্কার দৃশ্য ভ্রমণকে আরও উপভোগ্য করে তোলে।


✨ উপসংহার

মুর্শিদাবাদের কাঠগোলা বাগানবাড়ি কেবল একটি ঐতিহাসিক স্থাপত্য নয়, এটি বাংলার অতীত ঐশ্বর্যের এক জীবন্ত নিদর্শন। বাগানবাড়ির প্রতিটি প্রাচীর যেন সাক্ষী হয়ে আছে এক হারানো যুগের গল্পের। ইতিহাসপ্রেমী, ফটোগ্রাফার, ও সাধারণ ভ্রমণপ্রেমী—সবার কাছেই এটি এক অনন্য অভিজ্ঞতা।

যদি ইতিহাস ও সৌন্দর্যের মিলনবিন্দু খুঁজতে চাও, তবে কাঠগোলা বাগানবাড়ির নিরব সৌন্দর্যে নিজেকে হারিয়ে ফেলো — সেখানে প্রতিটি হাওয়া বলে যায়, “আমি এখনও সেই যুগের গল্প জানি।”

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *