
ইংল্যান্ডের পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত ক্যামব্রিজ—একটি শহর যা ইতিহাস, সৌন্দর্য ও শিক্ষার মহিমায় বিশ্বজোড়া খ্যাতি অর্জন করেছে। এই শহর শুধু বিশ্বের অন্যতম সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসস্থলই নয়; এটি যেন প্রকৃতি ও শিক্ষার সুমধুর মিলনে গড়ে ওঠা এক কাব্যিক নগরী। শান্ত নদী, সযত্নে রক্ষিত সবুজ প্রান্তর, মধ্যযুগীয় ভবন আর আভিজাত্যে ভরা ক্যাম্পাস—ক্যামব্রিজ ভ্রমণ মানেই মুগ্ধতার এক অনন্য অভিজ্ঞতা।
ক্যামব্রিজে প্রথম দৃশ্য—যেন কোনো ইংরেজি উপন্যাসের পাতা
শহরের ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ে সবুজে ঘেরা রাস্তা, সাইকেলে চলা শিক্ষার্থীরা, আর পাথর বাঁধানো পুরনো ভবন।
যেন কোনো কবি বা লেখকের লেখা ইংরেজি উপন্যাসকে বাস্তবে দেখে ফেললাম—এমনই অনুভূতি জাগে প্রথম দেখাতেই।
ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় – এক হাজার বছরের ঐতিহ্য
১২০৯ সালে প্রতিষ্ঠিত University of Cambridge আধুনিক বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী জ্ঞানভিত্তিক প্রতিষ্ঠান।
নামকরা ৩১টি কলেজ নিয়ে গঠিত এই বিশ্ববিদ্যালয়ে জন্ম নিয়েছে—
- আইজ্যাক নিউটনের মতো বিজ্ঞানী,
- চার্লস ডারউইনের মতো গবেষক,
- স্টিফেন হকিংয়ের মতো প্রতিভা,
- এবং শত শত নোবেলজয়ী ব্যক্তিত্ব।
প্রতিটি কলেজের নিজস্ব ঐতিহ্য, স্থাপত্য আর পরিবেশ দর্শনার্থীদের ভেতরে বিস্ময় জাগায়।
কিংস কলেজ – আকাশ ছোঁয়া শিল্পের অপূর্ব নিদর্শন
ক্যামব্রিজের সবচেয়ে পরিচিত স্থাপনা হলো King’s College Chapel।
গথিক স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত এই চ্যাপেল—
- অসাধারণ স্টেইনড গ্লাস,
- মার্বেল খোদাই,
- ও সুউচ্চ ছাদের জন্য বিশ্ববিখ্যাত।
সূর্যের আলো পড়লে এর রঙিন কাচগুলো সৌন্দর্যের এমন জাদু ছড়ায় যে মনে হয় আলো নিজেই সঙ্গীত গাইছে।
দ্য ব্যাকস – প্রকৃতির সরল অথচ মহিমাময় মুখচ্ছবি
বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকটি কলেজের পেছনে বিস্তৃত সবুজ খোলা জায়গা The Backs।
এখানেই দেখা যায়—
- সবুজ ঘাসের কার্পেট,
- পুরনো কলেজ ভবনের আভিজাত্য,
- আর ক্যাম নদীর শান্ত জলধারা।
এটি ক্যামব্রিজ ঘোরার সবচেয়ে শান্ত, সুন্দর এবং আত্মাকে ছুঁয়ে যাওয়া জায়গা।
রিভার ক্যাম – পন্টিং-এর জাদু
ক্যামব্রিজে পন্টিং না করলে ভ্রমণ অসম্পূর্ণ!
একটি লম্বা কাঠের নৌকা আর একজন চালক লম্বা বৈঠা দিয়ে নৌকাটি চালিয়ে নিয়ে যায়।
নদীর দুই পাশে কলেজ ভবন, সেতু, ঘাট—সব মিলিয়ে দৃশ্যটি যেন কোনো চিত্রকরের তুলিতে আঁকা।
সবচেয়ে সুন্দর সেতুগুলোর মধ্যে আছে:
- ব্রিজ অফ সাইস,
- ক্লেয়ার ব্রিজ,
- ম্যাথেমেটিক্যাল ব্রিজ।
সূর্যাস্তের সময় নদীর জলে প্রতিফলিত ক্যামব্রিজ যেন আরও মোহময় হয়ে ওঠে।
ট্রিনিটি কলেজ – প্রতিভাদের বাসস্থান
আইজ্যাক নিউটন এখানেই পড়াশোনা করেছেন। ট্রিনিটির চত্বর, গ্রন্থাগার আর বাগান ভ্রমণ মানে অতীতের জ্ঞানজ্যোতির সান্নিধ্যে আসা।
নিউটনের আপেল গাছের বংশধর বলে পরিচিত গাছটিও এখানে দেখা যায়, যা পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ।
ফিট্জউইলিয়াম মিউজিয়াম – শিল্প-ঐতিহ্যের ধনভাণ্ডার
ক্যামব্রিজের এই মিউজিয়ামটি ইউরোপের অন্যতম উল্লেখযোগ্য সংগ্রহশালা।
এখানে রয়েছে—
- মিশরের প্রাচীন মমি,
- গ্রিস ও রোমের ভাস্কর্য,
- রেমব্রান্ডট, মনেটসহ বিখ্যাত শিল্পীদের চিত্রকর্ম।
শিল্প ও ইতিহাসপ্রেমীদের জন্য এটি স্বর্গ।
মার্কেট স্কয়ার – ক্যামব্রিজের প্রাণকেন্দ্র
রঙিন দোকান, স্থানীয় খাবার, তাজা ফল-সবজি আর হস্তশিল্পের স্টল—সব মিলিয়ে এই বাজারটি খুবই উজ্জ্বল ও প্রাণবন্ত।
এখান থেকে স্মারক জিনিস কেনার অভিজ্ঞতাও দারুণ।
সাইকেল-নগরী ক্যামব্রিজ
ক্যামব্রিজে সাইকেলই সবচেয়ে জনপ্রিয় যান। শহরের প্রতিটি রাস্তা, সেতু, চত্বর সাইকেল-নির্ভর জীবনের এক অনন্য উদাহরণ।
সাইকেল ভাড়া করে শহর ঘোরা—একটি অসাধারণ ও পরিবেশবান্ধব অভিজ্ঞতা।
ক্যামব্রিজের খাদ্যসংস্কৃতি
এখানে রয়েছে বহু ঐতিহ্যবাহী রেস্তোরাঁ ও পাব।
ইংলিশ ব্রেকফাস্ট, স্যুপ, বেকড পেস্ট্রি, ওয়েস্টার্ন ডিশ, কফি—সবই ভ্রমণকে আরামদায়ক করে তোলে।
বিশেষ করে নদীর পাশে ক্যাফেগুলো অসাধারণ শান্ত পরিবেশ দেয়।
শেষ কথাঃ ক্যামব্রিজ – শান্তি, জ্ঞান ও সৌন্দর্যের পূর্ণ সমাহার
ক্যামব্রিজ এমন এক শহর, যেখানে ইতিহাস আর আধুনিকতা পাশাপাশি চলে।
উচ্চ শিক্ষার ধারক এই নগরী একই সঙ্গে প্রকৃতির সৌন্দর্যে ভরপুর—
নদী, ঘাসের প্রান্তর, পুরোনো ভবন, আর নীরব পরিবেশ মনকে অপূর্ব প্রশান্তি দেয়।
একবার ক্যামব্রিজে গেলে মনে হয়—
জ্ঞান, শিল্প, প্রকৃতি ও শান্তি—সব মিলিয়ে এ শহরটি যেন চিরকাল মনে রাখার মতো এক স্বপ্ন।












Leave a Reply