অচেনা পথের ডাকে —একটি দীর্ঘ ভ্রমণ প্রবন্ধ।


ভ্রমণ—এই শব্দটির মধ্যেই লুকিয়ে আছে মুক্তি। দৈনন্দিন জীবনের ক্লান্তি, চেনা রাস্তায় চলার একঘেয়েমি, পরিচিত মুখের অভ্যাস—সবকিছুর বাইরে বেরিয়ে এসে কিছুটা সময় নিজের সঙ্গে একা থাকা। ভ্রমণ আসলে গন্তব্যে পৌঁছনোর চেয়ে অনেক বেশি কিছু; এটি এক ধরনের মানসিক যাত্রা, যেখানে মানুষ ধীরে ধীরে নিজের ভেতরের মানুষটিকে চিনে নিতে শেখে।
এই ভ্রমণের শুরুটা হঠাৎ করেই। কোনো বড় পরিকল্পনা ছিল না, কোনো বিলাসী হোটেলের তালিকাও নয়। শুধু মনে হচ্ছিল—আর পারছি না। শহরের শব্দ, যান্ত্রিকতা, প্রতিদিনের একরকম সকাল-দুপুর-রাত—সব মিলিয়ে মনে হচ্ছিল শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। ঠিক তখনই সিদ্ধান্ত নিলাম, কিছুদিনের জন্য হলেও এই চেনা বৃত্তের বাইরে বেরোতে হবে।

যাত্রার শুরু—

ভোরবেলা। শহর তখনও পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। রাস্তার আলো নিভে আসছে ধীরে ধীরে, আকাশে ফিকে নীল রঙ। ব্যাগটা খুব ভারী নয়—কিছু জামাকাপড়, একটি নোটবুক, একটি কলম আর অল্প কিছু স্বপ্ন। স্টেশন কিংবা বাসস্ট্যান্ড—যেখান থেকেই যাত্রা শুরু হোক না কেন, সেখানে এক অদ্ভুত আবেগ কাজ করে। চারপাশে অচেনা মানুষ, প্রত্যেকেরই আলাদা গন্তব্য, আলাদা গল্প।
যানবাহন ছেড়ে দিতেই জানালার বাইরে দৃশ্য বদলাতে শুরু করল। শহরের উঁচু দালান ধীরে ধীরে হারিয়ে গেল, তার জায়গায় এল খোলা মাঠ, জলাশয়, ছোট ছোট বাড়ি। কোথাও কৃষক মাঠে কাজ করছেন, কোথাও স্কুলে যাওয়া শিশুরা হাসতে হাসতে হাঁটছে। এই দৃশ্যগুলো খুব সাধারণ, অথচ শহরে বসে এগুলোর কথা আমরা ভুলে যাই।

পথে পথে প্রকৃতি—

যত সামনে এগোতে লাগলাম, প্রকৃতিও তত বদলাতে শুরু করল। কোথাও সবুজ পাহাড়, কোথাও নদী সাপের মতো এঁকেবেঁকে এগিয়ে গেছে। নদীর ধারে বসে থাকা নৌকা, জলের ওপর পড়া রোদের ঝিলিক—সব মিলিয়ে মনে হচ্ছিল, প্রকৃতি যেন ইচ্ছে করেই তার সৌন্দর্য উজাড় করে দিচ্ছে।
ভ্রমণের সময় প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কটা খুব কাছ থেকে দেখা যায়। শহরে প্রকৃতি থাকে দূরে—পার্কে বন্দি, টবে লাগানো। কিন্তু এখানে প্রকৃতি জীবনের অংশ। মানুষ গাছের ছায়ায় বসে গল্প করে, নদীর জলেই দৈনন্দিন কাজ সারে, পাহাড়ই তাদের আশ্রয়।
একসময় যানবাহন থামল ছোট্ট এক জায়গায়। নামটা খুব পরিচিত নয়, মানচিত্রেও খুঁজে পাওয়া কঠিন। কিন্তু এই জায়গাটির মধ্যেই ছিল সেই শান্তি, যেটা খুঁজতে খুঁজতে আমি বেরিয়েছিলাম।

প্রথম পরিচয়: নীরবতার সঙ্গে

শহরের কোলাহলে অভ্যস্ত কানে প্রথমে এই নীরবতা অস্বস্তিকর লাগে। এখানে কোনো হর্ন নেই, নেই চিৎকার। শুধু হালকা বাতাসের শব্দ, দূরে পাখির ডাক। মনে হলো, শব্দ না থাকলেও এই নীরবতার একটা নিজস্ব ভাষা আছে।
হেঁটে চললাম অচেনা রাস্তায়। রাস্তা খুব চওড়া নয়, দু’ধারে গাছ। মাঝে মাঝে ছোট দোকান—চা, মুদি জিনিস, কোথাও আবার হাতের তৈরি সামগ্রী। দোকানদারদের চোখেমুখে কোনো তাড়া নেই। তারা সময়কে যেমন আছে তেমনই গ্রহণ করেছে।
একটি চা-দোকানে বসে চা খেলাম। সেই চায়ের স্বাদ এখনো মনে পড়ে—হয়তো খুব বিশেষ কিছু উপাদান ছিল না, কিন্তু তার মধ্যে ছিল আন্তরিকতা। দোকানদার জিজ্ঞেস করলেন, “কোথা থেকে এলেন?” এই প্রশ্নটা ভ্রমণে প্রায়ই শোনা যায়, কিন্তু প্রত্যেকবারই আলাদা অনুভূতি জাগায়। কারণ এই প্রশ্নের সঙ্গে কোনো বিচার নেই—শুধু কৌতূহল।

মানুষের গল্প

ভ্রমণের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো মানুষ। পথেঘাটে, চায়ের দোকানে, বাজারে—যাদের সঙ্গে দেখা হয়, তাদের প্রত্যেকের জীবন একেকটা গল্প। কেউ সারাজীবন এই জায়গাতেই কাটিয়েছেন, কেউ আবার শহর ছেড়ে এখানে শান্তি খুঁজতে এসেছেন।
এক বৃদ্ধ মানুষ গল্প করছিলেন তাঁর শৈশবের কথা। কীভাবে এই অঞ্চল বদলেছে, কীভাবে মানুষ বদলেছে। তাঁর চোখে ছিল স্মৃতির ভার, কিন্তু মুখে ছিল প্রশান্ত হাসি। তিনি বললেন, “জায়গা বদলায়, মানুষ বদলায়—কিন্তু প্রকৃতি একই থাকে। আমরা যদি তার সঙ্গে থাকতে পারি, তাহলেই শান্তি।”
এই কথাগুলো যেন বুকের ভেতর কোথাও গেঁথে গেল।

দুপুরের আলো ও নিঃশব্দ সময়

দুপুরের আলো এখানে আলাদা। শহরের মতো কংক্রিটে আটকে পড়ে না, খোলা আকাশে ছড়িয়ে পড়ে। পাহাড় বা গাছের ছায়া ধীরে ধীরে লম্বা হয়। এই সময়টা ভ্রমণে খুব গুরুত্বপূর্ণ—এটা বিশ্রামের সময়, ভাবনার সময়।
একটা উঁচু জায়গায় বসে চারপাশ দেখছিলাম। দূরে পাহাড়, নিচে উপত্যকা, মাঝখানে ছোট ছোট বাড়ি। মনে হচ্ছিল, জীবনের সব জটিলতা আসলে মানুষের তৈরি। প্রকৃতি খুব সহজ—সে কাউকে তাড়া দেয় না, কাউকে ঠেলে দেয় না।
নোটবুক খুলে কিছু লিখলাম। ভ্রমণের সময় লেখা খুব আলাদা হয়। তখন লেখায় কোনো চাপ নেই, কোনো লক্ষ্য নেই। শুধু অনুভূতি।

সন্ধ্যার আবির্ভাব–

সন্ধ্যা নামার সময় এই জায়গাটা যেন আরও সুন্দর হয়ে উঠল। আকাশে রঙ বদলাতে লাগল—নীল থেকে কমলা, কমলা থেকে বেগুনি। বাতাসে হালকা শীত। কোথাও কোথাও ঘরের আলো জ্বলে উঠছে।
একটি ছোট অতিথিশালায় রাত কাটানোর ব্যবস্থা করলাম। বিলাসিতা নেই, কিন্তু পরিষ্কার আর আরামদায়ক। রাতের খাবার খুব সাধারণ—ভাত, সবজি, ডাল। কিন্তু সেই খাবারে ছিল দিনের পরিশ্রমের স্বাদ।
রাতের আকাশে তারা দেখা যাচ্ছিল। শহরে যেগুলো আলোয় ঢাকা পড়ে যায়, এখানে সেগুলো স্পষ্ট। আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছিল—এই বিশালতার সামনে আমরা কত ছোট।

ভ্রমণের শিক্ষা–

পরের দিন ভোরে উঠে আবার হাঁটতে বেরোলাম। মনে হচ্ছিল, এই অল্প সময়েই জায়গাটা আমাকে অনেক কিছু শিখিয়ে দিয়েছে। ভ্রমণ আসলে আমাদের শেখায়—
ধীরে চলতে
শুনতে
দেখতে
অল্পে খুশি হতে
আমরা শহরে সবকিছু তাড়াহুড়ো করে করি। কিন্তু ভ্রমণ শেখায়, সবকিছুর একটা নিজস্ব গতি আছে। সেই গতির সঙ্গে মিশে যেতে পারলেই শান্তি।

ফেরার পথে–

ফেরার সময় মনটা ভারী লাগছিল। সব ভ্রমণেই এই অনুভূতি আসে। গন্তব্য ছেড়ে যাওয়ার কষ্ট, নতুন করে পাওয়া সম্পর্ক ছিন্ন করার ব্যথা। কিন্তু ভ্রমণ এটাই শেখায়—সবকিছু স্থায়ী নয়, আর এই অস্থায়িত্বই জীবনের সৌন্দর্য।
যানবাহন আবার শহরের দিকে এগিয়ে চলল। জানালার বাইরে দৃশ্য বদলাতে লাগল। কিন্তু মনে হচ্ছিল, আমি আগের মতো নেই। কিছুটা বদলে গেছি।

উপসংহার—-

ভ্রমণ কোনো বিলাসিতা নয়, এটি প্রয়োজন। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—জীবন শুধু কাজ আর দায়িত্বের মধ্যে আটকে নেই। জীবনের একটা বড় অংশ হলো অনুভব করা, দেখা, শোনা।

এই ভ্রমণ আমাকে শিখিয়েছে, শান্তি কোনো জায়গায় নেই—শান্তি তৈরি হয় আমাদের ভেতরে। ভ্রমণ শুধু সেই শান্তিকে খুঁজে পাওয়ার পথ দেখায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *