বাংলা বলার অপরাধে ভিনরাজ্যে নির্যাতনের অভিযোগ, সর্বস্ব খুইয়ে বালুরঘাটে ফিরল পরিযায়ী দম্পতি।

বালুরঘাট, নিজস্ব সংবাদদাতা :- নাম ভারতী। কিন্তু ভারতেরই অন্য রাজ্যে গিয়ে স্বামীকে নিয়ে হয়রান হতে হবে ভাবতে পারেননি তিনি। বাংলা ভাষা নিয়ে ভিন রাজ্যে হয়রানির অভিযোগ ঘিরে রাজ্য রাজনীতিতে যখন তুমুল তরজা চলছে। ঠিক তখনই সেই অভিযোগকে সামনে এনে চরম দুর্দশার কাহিনি উঠে এল বালুরঘাট থেকে। বালুরঘাট ব্লকের চকভৃগু গ্রাম পঞ্চায়েতের বাসিন্দা ভারতী লোহার ও তাঁর স্বামী সনাতন লোহারের অভিযোগ, সেকেন্দ্রাবাদে কাজ করতে গিয়ে বাংলা বলার কারণেই তাঁদের উপর নেমে এসেছিল লাগাতার অত্যাচার। শেষ পর্যন্ত প্রাণের ভয়ে বাসনপত্র, জামাকাপড় ফেলে কার্যত নিঃস্ব হয়েই তাঁরা বাড়িতে পালিয়ে আসেন।

প্রায় ছ’মাস আগে কাজের খোঁজে সেকেন্দ্রাবাদে গিয়েছিলেন ওই দম্পতি। ঝাড়ঝাঁটা দেওয়ার পাশাপাশি মাঝেমধ্যে নির্মাণ শ্রমিকের কাজও করতেন তাঁরা। সঙ্গে ছিলেন তাঁদের ছেলেও। দম্পতির দাবি, এর আগে কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী পর্যন্ত দেশের নানা রাজ্যে কাজ করেছেন তাঁরা। কিন্তু কোথাও ভাষা নিয়ে এমন পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়নি। অভিযোগ, সেকেন্দ্রাবাদে বাংলা কথা বলতে শুনলেই গালিগালাজ ও নানা রকম হয়রানি শুরু হতো। একদিন কাজে না গেলে খাবার বন্ধ করে দেওয়া হতো। অসুস্থ হলেও চিকিৎসার সুযোগ মিলত না। ভারতীর দাবি, তাঁদের ছেলে সেখানে অসুস্থ হয়ে পড়লে চিকিৎসার কথা জানালে বলা হয়, “মরে গেলে যাক।” একই সঙ্গে মহিলাদের উদ্দেশে খারাপ কথাবার্তার অভিযোগও তুলেছেন তিনি।
দীর্ঘদিন কাজ করলেও বেতন ঠিকমতো দেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ দম্পতির। বহুবার বেতন চাইলেও কোনও ফল হয়নি। পরিস্থিতি চরমে পৌঁছনোর পর তাঁরা সেখানে থাকা জিনিসপত্র ফেলে রেখেই ফেরার সিদ্ধান্ত নেন। ট্রেনের টিকিট কাটার মতো টাকাও তাঁদের কাছে ছিল না। টিকিট পরীক্ষকের কাছে নিজেদের অবস্থার কথা জানিয়ে হাতে পায়ে পড়ে কোনওমতে বাড়ি ফিরেছেন তাঁরা। প্রায় দু’দিন ট্রেনে না খেয়েই কাটাতে হয়েছে বলে দাবি তাঁদের।

বাড়ি ফিরে এসে আবার বিপর্যয়। দম্পতি দেখেন, তাঁদের ঘরের টিন সহ একাধিক সামগ্রী চুরি হয়ে গিয়েছে। বর্তমানে প্রতিবেশীদের কাছ থেকে থালা-বাসন ধার করে কোনও মতে রান্না করে দিন যাপন করছেন তাঁরা। ঘটনার খবর পৌঁছয় স্থানীয় পঞ্চায়েত সমিতির সদস্য মিঠুন মজুমদারের কাছে। শনিবার জেলা পরিষদের সভাধিপতি চিন্তামণি বিহা, চকভৃগু গ্রাম পঞ্চায়েতের উপপ্রধান পিটার বারু সহ একাধিক জনপ্রতিনিধি ওই দম্পতির বাড়িতে যান। তাঁদের প্রাথমিকভাবে রেশন সামগ্রী সংগ্রহের টোকেন, শাড়ি, জামা ও ত্রিপল দেওয়া হয়েছে।

ভারতী জানান,’ লক্ষীর ভান্ডারের টাকা তুলে ছেলের চিকিৎসা করে তাকে আগে বাড়ি পাঠিয়েছিলাম। পরে স্বামীকে নিয়ে আমরা বাড়ি ফিরেছি।’ সনাতন লোহার বলেন, ‘বাংলা বলার জন্য চরম হয়রানি হয়েছে। আর বাইরে কাজ করতে যাব না। সেদ্ধ ভাত খেয়ে বাড়িতেই থাকবো।’

এদিকে ঘটনাটি ঘিরে রাজনৈতিক চাপানউতোর শুরু হয়েছে। ওই দম্পতি সত্যি বাংলা বলার অপরাধে পালিয়ে এসেছেন। নাকি অন্য কারণ রয়েছে খতিয়ে দেখতে তাদের বাড়ি যাবেন বলে জানিয়েছেন তপনের বিধায়ক বুধরাই টুডু। তিনি বলেন, ‘মুখ্যমন্ত্রী এই নিয়ে একটা অশান্তির বাতাবরণ তৈরি করতে চাইছেন। এখন এসব মনগড়া কথা নাকি তৃণমূল বানাচ্ছে দেখতে হবে।’

জেলা পরিষদের সভাধিপতি চিন্তামণি বিহা বলেন, ‘বিষয়টি জানতে পেরে দ্রুত এলাকায় গিয়ে পাশে থাকার কথা বলেছি। বাইরে রাজ্যে কাজে গিয়ে নিজের ভাষায় তারা কথা বলতে পারছে না। উপর মহলে বিষয়টি জানাব।’

চকভৃগু গ্রাম পঞ্চায়েতের উপপ্রধান পিটার বারই জানান, ‘তারা সেকেন্দ্রাবাদে কাজে গিয়ে পালিয়ে এসেছে। ছেলের অসুখ, আর্থিক সমস্যা সমস্ত কিছুতে তারা জর্জরিত।’

বালুরঘাট পঞ্চায়েত সমিতির সদস্য মিঠুন মজুমদার বলেন, ‘বুথ সভাপতির কাছ থেকে বিষয়টি জেনেছি। সেখানে তাদের বাংলা বলার জন্য অত্যাচার করত। এমনকি বেতনও ঠিকভাবে দিত না। আমরা তাদের পাশে আছি।’ ভিনরাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও ভাষার অধিকার নিয়ে আবার প্রশ্ন তুলে দিল এই ঘটনা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *