
উত্তর ২৪ পরগনা, নিজস্ব সংবাদদাতা:- সবিতা দাসের জন্ম উত্তর ২৪ পরগনার অশোকনগরে। ১৯৭০ সালে। দেশভাগের ঠিক পরেই তার পিতৃপুরুষ এপার বাংলায় চলে আসে। তারপর থেকেই তারা পশ্চিমবঙ্গের স্থায়ী বাসিন্দা। নিয়মিত অসহ্য অত্যাচার চালানোর পর স্বামী তাঁকে দুই সন্তান-সহ ফেলে চলে যায়। সবিতা পরিবারে ফেরার চেষ্টা করেছিল। দরিদ্র বাবা-মা, ভাইয়েরা তাকে আর গ্রহণ করেনি। কাজের খোঁজে সবিতা দুই নাবালক ছেলে ও মেয়েকে নিয়ে কলকাতায় চলে আসে সেই নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি। এখন তার দুই সন্তানই বিবাহিত। তাদের ছেলেমেয়ে হয়েছে। ইস্টার্ন মেট্রোপলিটন বাইপাসের পিছনদিকের দরিদ্রপল্লিতে থাকে সবিতা, তার ছেলে, ছেলের বউ আর দুই নাতি। মেয়েরও বিয়ে হয়েছে পাশের পাড়ায়। কাছেই এক বহুতলের উচ্চমধ্যবিত্ত পরিবারে সারাদিনের অ্যাটেনড্যান্ট হিসেবে কাজ করে সবিতা। সেই অশোকনগরে থাকাকালীন নব্বইয়ের গোড়া থেকেই ভোট দিয়ে আসছে সে। এপিক কার্ড অনুযায়ী সে ভারতের বৈধ নাগরিক। তিনদশকের উপর প্রত্যেকটি সাধারণ নির্বাচনে ভোট দেয় সে। কাজের পারিশ্রমিক হিসেবে সবিতা পায় মাসিক দশহাজার টাকা। ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনের আগে জননেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ প্রকল্প চালু করলে সবিতা ‘দুয়ারে সরকার’ ক্যাম্পে দাঁড়িয়ে নাম লিখিয়েছিল। সেই থেকে ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’-এর টাকা তার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ঢুকছে। এবছর মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী তফসিলি সবিতা দাসের সেই টাকা বেড়ে হয়েছে মাসিক ১৮০০। সারাবছর নিজের অ্যাকাউন্টে হাত দেয় না সে। পুজোর আগে, আঠারো-বিশ হাজার টাকা জমলে তা থেকে বড়ো অংশটুকু তুলে নিয়ে ছেলেমেয়ে, ছেলের বউ, জামাই, নাতিনাতনিদের জন্য যথাসাধ্য জামাকাপড় কেনে সে, নিজের জন্যও কেনে। আজীবন অসহ্য দারিদ্র আর কষ্টের সংসারে যৎসামান্য সুরাহা হয়েছে তার। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্যোগে চালু হওয়া এই মাসিক আর্থিক সাহায্যটুকু পাবার কারণে।
বীরভূম জেলার সিনিয়র এগজিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে কর্মরত মহম্মদ মালিক। ২০১০ সাল থেকে তিনি পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর পদে ছিলেন। পরে WBCS (Exe) কোয়ালিফাই করেন। ২০১৯ সালে উত্তর দিনাজপুরের বিডিও হন তিনি। ২০২৩-২৪ সালে উত্তর ২৪ পরগনার ডিএমডিসি থাকাকালীন ERO হিসেবেও দায়িত্ব সামলেছেন তিনি। মালিক ও তাঁর বাবা-মা দুজনেই ২০০২ সালের ভোটার। তাঁরা আজ প্রায় দেড়শো বছর পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা।
সবিতা দাস এবং মুহম্মদ মালিক (নাম পরিবর্তিত) এইমুহূর্তে একটি জায়গায় এক অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছেন। আসন্ন ২০২৬ পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের শেষতম সাপ্লিমেন্টারি তালিকায় তাদের দুজনের নামই ‘ডিলিটেড’।
‘হিয়ারিং’-এ ডাক আসার পর এঁরা দুজনেই নিজেদের যাবতীয় ডকুমেন্টস জমা করেছিলেন। প্রোজিনি ম্যাপিং সম্পন্ন করার জন্য যা যা কাগজপত্র দেখানো প্রয়োজন, দুজনেই যথাযথভাবে নিয়ে গেছিলেন। কর্তব্যরত অফিসার কোনও সন্দেহ বা আপত্তিও প্রকাশ করেননি। অথচ এইমুহূর্তে এই দুজন, একজন মুসলিম উচ্চশিক্ষিত বাঙালি পুরুষ, আরেকজন স্বল্পশিক্ষিত, গরিব নীচুতলার বাঙালি মহিলা— দুজনেই ভারত রাষ্ট্রের চোখে ‘সন্দেহভাজনের’ তালিকায়। সৌজন্যে ভারতীয় নির্বাচন কমিশন।
রাজ্য বিজেপির পদস্থ নেতারা প্রথমদিন থেকেই হুঙ্কার ছাড়ছিলেন— ‘বাংলায় এক কোটি পঁচিশ লক্ষ অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গা তাড়াব।’ প্রাথমিক খসড়া তালিকায় মৃত, স্থানান্তরিত, ডাবল বা ট্রিপল এন্ট্রি, নিখোঁজ মিলিয়েও যখন ৫৮ লক্ষের বেশি নাম বাদ দিতে পারলেন না, নির্বাচন কমিশন নিয়ে এলেন তাঁদের অত্যাধুনিক অস্ত্র ‘লজিক্যাল ডিস্ক্রিপেন্সি’। যা পশ্চিমবঙ্গ ছাড়া ভারতের অন্য একটিও রাজ্যে প্রযুক্ত হয়নি। এইবার এক কোটি আঠাশ লক্ষ বাঙালি হিয়ারিং-নোটিশ পেলেন। অবশেষে দেখা গেল পাঁচ লক্ষ নাম ‘ডিলিটেড’, ষাট লক্ষ ‘আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন’। অর্থাৎ, সংখ্যাটা সর্বমোট সেই এক কোটি পঁচিশ লক্ষই দাঁড়াল। দিল্লির প্রভুরা খুশি। এখনও অব্দি সাপ্লিমেন্টারি লিস্ট থেকে কতোজনের নাম ফেরত এসেছে পরিষ্কার নয়। ট্রাইব্যুনালের কাজ কবে আরম্ভ হবে, অনিশ্চিত। কিন্তু আসল কাজটা করে ফেলা গেছে।
তা হল, গণহারে বৈধ মুসলিম আর মহিলা ভোটারের নাম বাদ দেওয়া।
পশ্চিমবঙ্গে মহিলা ভোটারের সংখ্যা ২০২১-এ ছিল ৩ কোটি ৫৯ লক্ষ। ২০২৪-এ ৩ কোটি ৭৩ লক্ষ। আর এইবছর, এসআইআরের পরে এ অব্দি তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩ কোটি ১৬ লক্ষ। আনুপাতিক হারে কমানো হয়েছে মুসলিম ভোটারের নাম। মালদা, মুর্শিদাবাদ, উত্তর দিনাজপুর, দুই ২৪ পরগনা মিলিয়ে ওই ৬০ লক্ষের মধ্যে প্রায় ৩৮ লক্ষ মুসলিম ভোটারকে ‘বিচারাধীনের’ তালিকায় ফেলা হয়েছে।
অথচ এরা প্রত্যেকেই বৈধ ভোটার। প্রাথমিক খসড়া তালিকায় এদের সকলের নামই ছিল। বিরোধী দলনেতা বলেছেন ‘ব্রেকফাস্টে এত লক্ষ, লাঞ্চে এত লক্ষ, ডিনারে এত লক্ষ ভোটার খাব।’ প্রভু-ভৃত্য নির্বাচন কমিশন অবিকল তাই করেছে,। তাঁরা যেন ‘হিজ মাস্টার্স ভয়েস’। কর্তার আজ্ঞায় কর্ম।
নারীবিদ্বেষী, দলিতবিদ্বেষী, মহিলাবিদ্বেষী বিজেপি কোনওদিনই চায়নি সমাজের এই অংশগুলোর ভোটাধিকার থাকুক। বিগত বারো বছরে নিজেদের ডবল ইঞ্জিনশাসিত রাজ্যগুলোতে যে ভয়াবহ নিপীড়ন তারা নামিয়ে এনেছে মুসলিম সম্প্রদায়ের উপর, গত দেড়-দু’বছরে গোটা দেশ জুড়ে যেভাবে দলিত ও মুসলিম বাঙালি শ্রমিকদের উপর লাগাতার অত্যাচার তারা চালিয়েছে, তা থেকে পরিষ্কার, মুসলিম সম্প্রদায় তাদের একটি ভোটও দেবে না। আর বাংলার মহিলাদের বৃহদংশ বিজেপির নারীবিদ্বেষী চেহারা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। তারা কোনওভাবেই বিজেপির পাশে থাকবে না। এবং এই দুই অংশের বৃহত্তর ভোট জমা হবে তৃণমূল কংগ্রেসের বাক্সেই। অতএব নাম কাটো। ওদের ‘ডি-ভোটারের’ তকমা দাও। এটাই ওদের শেষ কৌশল। কিন্তু বিজেপি জানে না, এরপরেও ওরা বাংলা দখল করতে পারবে না। বাংলার মানুষ ফের বুঝিয়ে দেবে— ‘যতোই করো হামলা/ আবার জিতবে বাংলা’!












Leave a Reply