
ওঁ নমঃ শ্রী ভগবতে প্রণবায়….!
আমাদের ভারতীয় সত্য সনাতন হিন্দুধর্মে মূল্যবান সুন্দর মনুষ্য জীবনে মহাশিবরাত্রি বা শিবরাত্রি হচ্ছে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব। এই মহাশিবরাত্রি ফাল্গুন মাসের কৃষ্ণ পক্ষের চতুর্দশী তিথিতে পালিত হয়। তাই, এই তিথিকে শিব চতুর্দশী ও বলা হয়। শিব পুরাণ এবং অন্যান্য ধর্মগ্রন্থগুলিতে, শিবকে একজন মহান যোগী বা ‘আদিযোগী’ হিসাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। শিবের আধ্যাত্মিক অর্থ হল সমস্ত প্রকার ভোগ এবং আনন্দ থেকে বিরত থাকা। শিবমূর্তির প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি হল তাঁর তৃতীয় নয়ন, গলায় বাসুকী নাগ, জটায় অর্ধচন্দ্র, জটার উপর থেকে প্রবাহিত গঙ্গা, অস্ত্র ত্রিশূল ও বাদ্য ডমরু। শিবকে সাধারণত ‘শিবলিঙ্গ’ নামক বিমূর্ত প্রতীকে পূজা করা হয়। শিব শব্দটি একটি বিশেষণ, যার অর্থ “শুভ, দয়ালু ও মহৎ”।
মহাশিবরাত্রি হল সর্বোচ্চ আরাধ্য দেবতা দেবাদিদেব মহাদেব ‘শিবের মহারাত্রি’। শিবপুরাণ অনুসারে, এই রাত্রেই শিব সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয়ের মহা তাণ্ডব নৃত্য করেছিলেন। আবার এই রাত্রেই শিবপার্বতীর বিয়ে ও হয়েছিল। আমাদের মনের অন্ধকার আর অজ্ঞতা দূর করার জন্য এই ব্রত পালিত হয়। অগণিত শিবভক্ত এইদিন শিবলিঙ্গে গঙ্গাজল, দুধ, ফুল বেলপাতা দিয়ে পূজা করেন। শিবরাত্রির দিনে ভক্তরা শিবের মস্তকে ফল, ফুল ও বিল্বপত্র অর্পণ করেন। সারা রাত জেগে মহাদেবের আরাধনা করেন ও কঠোর উপবাস পালন করেন। শিবরাত্রি ব্রত পালন করলে সব ধরনের মনস্কামনা পূর্ণ হয়, ও আশীর্বাদ লাভ হয়।
শ্রী শ্রী চন্ডিতে যে চারটি রাত্রির কথা উল্লেখ আছে তার মধ্যে মহারাত্রি অভিহিত করা হয়েছে মহা-শিবরাত্রিকে। তাই শিবরাত্রির মাহাত্ম্য অপরিসীম। শিব শব্দের অর্থ মঙ্গল, শুভ কল্যাণ প্রভৃতি। লিঙ্গ শব্দের অর্থ চিহ্ন বা প্রতীক, আবার প্রতীক শব্দের অর্থ অবয়ব, প্রতিমা, নিদর্শন, ঈশ্বর তথা অকল্পনীয় বা বিরাট পদার্থকে কল্পনা করার সহায়ক বস্তু পভৃতি। তাই প্রতিটি মঙ্গলময় জিনিস বা ব্যক্তিত্ব হলো শিবস্বরূপ। আর মঙ্গলকে আশ্রয় না করে কয়জন বাঁচতে পারে? তাই শিব সবারই আশ্রয়স্থল। তেমনি শিব ব্যক্তিত্বের ব্যক্তি মঙ্গলময় ও আশ্রয়দাতার প্রতীক। তাহলে শিবলিঙ্গ শব্দের সম্মিলিত অর্থ – যা মঙ্গলময়ের প্রতীক, কল্যাণের প্রতীক প্রভৃতি। অতএব শিবলিঙ্গ পূজা, মঙ্গলময়ের পূজা, সুন্দরের পূজা, শুভ বা কল্যাণের পূজা।
শিবপূজার অন্যতম প্রধান মন্ত্র :- “ওঁ নমঃ শিবায়”৷ এই মন্ত্রের শক্তি মানব মনের বিশুদ্ধ অন্তঃসত্ত্বাকে জাগ্রত করে ৷ বিশ্বব্রহ্মান্ড সৃষ্টির আগে মহাশূণ্যে যে শব্দতরঙ্গ ছিল তাই “ওম “৷ যুগ যুগ ধরে হিন্দু সাধক ঋষি-মুনিরা ওম উচ্চারণ করে ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে তপস্যায় নিমগ্ন থেকেছেন ৷ “ওঁ /ওমঃ” (প্রনব) হল পরমেশ্বরের প্রতীক। সৃষ্টির প্রথম শব্দ ওঁ। ওঁ এ আছে তিন অক্ষর- অ, উ, ম। তিন অক্ষরে আছে- তিন দেবতাঃ- ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর/শিব। ” ন, ম, শি, বা, য় ,” এই মন্ত্রে আমরা মহাদেবের জপ করি ৷ তাই, সঠিক ভাবে “ওঁ নমঃ শিবায়” উচ্চারণ করে জপ করলে সবরকম অশুভ প্রভাব দূরে থাকে ৷ পাঁচ ইন্দ্রিয় নিয়ন্ত্রণে থাকে৷ শিব জন্মরহিত, শাশ্বত, সব কারণের কারণ৷ তিনি স্ব স্বরূপে বিদ্যমান৷ সব জ্যোতির জ্যোতি বা আলো ৷ তিনি তুরীয়, অন্ধকারের অতীত৷ আদি ও অন্তহীন৷ শিবের সমান দেবতা নেই, শিবের তুল্য গতি নেই, দানে শিবের তুল্য দেবতা নেই, যুদ্ধে শিবের তুল্য বীর নেই। তাই প্রকৃত শিবভক্তগণ শিব লিঙ্গ পূজার মাধ্যমে মঙ্গলময় করুণাময় শিবসুন্দরের মহান আশীর্বাদ লাভ করেন। আর সব শেষে শিবলিঙ্গ বা শিব মূর্তিকে প্রণাম করে বলেন:-
ওঁ নমঃ শিবায় শান্তায় কারণত্রয়হেতবে।
নিবেদয়ামি চাত্মানং গতিস্তং পরমেশ্বরম্।।
ওঁ নমঃ শিবায়..ওঁ নমঃ শিবায়..ওঁ নমঃ শিবায়…..
সকলের জন্য জগৎগুরু ভগবান শিব-অবতার স্বামী প্রণবানন্দজী মহারাজের শুভ ও মঙ্গলময় আশির্বাদ প্রার্থনা করি। *এই বছর ২৬শে ফেব্রুয়ারি বুধবার মহাশিবরাত্রি পালন করা হবে৷ (২৬ ফেব্রুয়ারি সকাল ৯/৪২ মিনিট থেকে ২৭ ফেব্রুয়ারি সকাল ৮/৩১ মিনিট পর্যন্ত থাকবে শিব চতুর্দশীর তিথি।)*
ওঁ গুরু কৃপা হি কেবলম্ ….!

কলমে : স্বামী আত্মভোলানন্দ (পরিব্রাজক)












Leave a Reply