স্মরণে প্রখ্যাত ভারতীয় ব্যালে নর্তকী – অমলা শঙ্কর।

(জন্ম: ২৭ জুন ১৯১৯ — মৃত্যু: ২৪ জুলাই ২০২০)
ভারতীয় নৃত্যাঙ্গনের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন অমলা শঙ্কর। তিনি শুধু একজন খ্যাতনামা ব্যালে নৃত্যশিল্পীই ছিলেন না, ছিলেন ভারতীয় নৃত্যকলার আধুনিক রূপান্তরের এক অগ্রদূত। উদয় শঙ্করের সহধর্মিণী, প্রখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী আনন্দ শঙ্করের জননী এবং অভিনেত্রী-নৃত্যশিল্পী মমতা শঙ্করের মা হিসেবে তাঁর পরিচিতি থাকলেও, নিজ গুণেই তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন একটি আলাদা ও অনন্য পরিচয়।

প্রারম্ভিক জীবন

অমলা শঙ্করের জন্ম হয় ১৯১৯ সালের ২৭ জুন, তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অধীন মাগুরা জেলার বাটাজোর গ্রামে। তার পৈতৃক নাম ছিল অমলা নন্দী। বাবা অক্ষয় কুমার নন্দী চেয়েছিলেন তাঁর সন্তানরা প্রকৃতি ও গ্রামীণ জীবনের প্রতি সংবেদনশীল হোক, যা অমলার মানসিক গঠনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।
মাত্র ১১ বছর বয়সে, ১৯৩১ সালে, তিনি প্যারিসে অনুষ্ঠিত একটি আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেন। সেখানেই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরে যায়—প্রথমবারের মতো দেখা হয় প্রখ্যাত নৃত্যগুরু উদয় শঙ্কর ও তাঁর পরিবারের সঙ্গে। অমলা তখন পাশ্চাত্য পোশাক—ফ্রকে পরিহিতা ছিলেন। উদয় শঙ্করের মা হেমাঙ্গিনী দেবী নিজ হাতে তাঁকে শাড়ি পরিয়ে দেন। সেই থেকেই শুরু হয় তাঁর নৃত্য জীবনের পথচলা। এরপর অমলা উদয় শঙ্করের নৃত্যদলে যোগ দেন এবং তাঁর সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পরিবেশনা করেন।

নৃত্য ও অভিনয়জীবন

অমলা শঙ্করের কর্মজীবন কেবলমাত্র ব্যালে বা শাস্ত্রীয় নৃত্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি অভিনয়জগতেও রাখেন উজ্জ্বল ছাপ। উদয় শঙ্করের পরিচালনায় ১৯৪৮ সালে নির্মিত কালজয়ী চলচ্চিত্র ‘কল্পনা’-তে তিনি অভিনয় করেন মুখ্য নারী চরিত্র উমা-র ভূমিকায়। এই চলচ্চিত্রে উদয় শঙ্কর স্বয়ং অভিনয় করেন এবং এটি ছিল সম্পূর্ণরূপে নৃত্যনির্ভর একটি অভিনব কল্পনাচিত্র।
২০১২ সালে, জীবনের শতবর্ষ পেরিয়ে তিনি উপস্থিত ছিলেন কান চলচ্চিত্র উৎসব-এ, যেখানে ‘কল্পনা’ ছবিটি পুনরায় প্রদর্শিত হয়। এক সাক্ষাৎকারে অমলা শঙ্কর বলেন—

“১৯৩১ সালে আমি যখন প্রথম কান উৎসবে এসেছিলাম, তখন ছিলাম সর্বকনিষ্ঠ তারকা। ৮১ বছর পর আবার এখানে ফিরে এসে সেই স্মৃতি ফিরে পেলাম।”

পুরস্কার ও সম্মাননা

অমলা শঙ্কর তার নৃত্যকলা ও ভারতীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরার জন্য বহু সম্মান ও পুরস্কারে ভূষিত হন। উল্লেখযোগ্য কিছু হল:

পদ্মভূষণ – ১৯৯১ সালে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে দেশের তৃতীয় সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মানে ভূষিত করা হয়।

বঙ্গবিভূষণ – ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাঁকে রাজ্যের সর্বোচ্চ বেসরকারি সম্মান প্রদান করে।

প্রয়াণ

অমলা শঙ্কর ২০২০ সালের ২৪ জুলাই, কলকাতায় পরলোকগমন করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ১০১ বছর। শতবর্ষ পেরিয়ে তিনি রেখে গেলেন এক অমূল্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, যা ভারতীয় নৃত্যকলার ইতিহাসে চিরভাস্বর হয়ে থাকবে।

উপসংহার

অমলা শঙ্কর ছিলেন এক যুগের সাক্ষী, এক সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন। ভারতীয় নৃত্যকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। তাঁর জীবন ও কর্মপ্রবাহ আগামী প্রজন্মের শিল্পীদের জন্য এক অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া ও বিভিন্ন অনলাইন সূত্র।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *