ভূমিকা—
ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে যাঁদের নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারণ করা হয়, তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন রানি লক্ষ্মীবাই। তিনি শুধু একজন বীরাঙ্গনা নন, বরং এক আদর্শ দেশপ্রেমিকা, যিনি ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। ঝাঁসির এই রানির সাহসিকতা, কৌশল, দেশপ্রেম এবং আত্মত্যাগ ভারতীয় নারীদের জন্য চিরকালীন অনুপ্রেরণা। ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের অন্যতম প্রধান মুখ রানি লক্ষ্মীবাই ছিলেন ইংরেজ শাসকদের চোখে আতঙ্ক এবং সাধারণ ভারতবাসীর কাছে মুক্তির মূর্তি।
শৈশব ও পরিবার
রানি লক্ষ্মীবাই-এর জন্ম হয় ১৮২৮ সালের ১৯ নভেম্বর কাশি নগরে (বর্তমানে বারাণসী)। তাঁর প্রকৃত নাম ছিল মনিকার্নিকা তাম্বে। তিনি ‘মণু’ নামেই পরিচিত ছিলেন। তাঁর পিতা মোরপন্ত তাম্বে ছিলেন পেশোয়া বাজিরাও দ্বিতীয়ের আদালতের একজন ব্রাহ্মণ, এবং মা ভগীরথী বাই ছিলেন একজন ধর্মপরায়ণা মহিলা।
শৈশবকাল থেকেই মণু ছিলেন অন্য দশজন কন্যাশিশুর থেকে আলাদা। তিনি পিতার সঙ্গে রাজদরবারে যেতেন, এবং ছেলেদের সঙ্গে কুস্তি, ঘোড়সওয়ারি, খড়গচালনা, ধনুর্বিদ্যা ইত্যাদি শিখতেন। তাঁর সাহস, তীক্ষ্ণ বুদ্ধি ও নেতৃত্বদানের ক্ষমতা খুব অল্প বয়সেই সবার নজরে পড়ে।
ঝাঁসির রানিরূপে আবির্ভাব
মাত্র ১৪ বছর বয়সে, ১৮৪২ সালে মণু বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন ঝাঁসির রাজা গঙ্গাধর রাও নিউলকর-এর সঙ্গে। বিবাহের পর তিনি ‘লক্ষ্মীবাই’ নাম গ্রহণ করেন। ঝাঁসির রানিরূপে তিনি ধীরে ধীরে প্রজাদের মধ্যে একজন আদর্শ এবং প্রিয় নেত্রী হয়ে ওঠেন।
তবে সুখ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ১৮৫১ সালে তাঁদের পুত্র মারা যান এবং পরে রাজা গঙ্গাধর রাওও গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। মৃত্যুর আগে রাজা ব্রিটিশদের অনুমতিক্রমে একটি দত্তক পুত্র গ্রহণ করেন—দামোদর রাও। কিন্তু রাজা মৃত্যুর পরে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ‘ডকট্রিন অফ ল্যাপস’ (Doctrine of Lapse) নীতি প্রয়োগ করে ঝাঁসি দখল করে নিতে চায়।
ইংরেজদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ
লক্ষ্মীবাই এই সিদ্ধান্ত মানতে রাজি হননি। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন:
“ম্যায় আপনী ঝাঁসি নাহি দুঁগি!”
(আমি আমার ঝাঁসি দেব না।)
ইংরেজদের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমাধানের অনেক চেষ্টা করেও তিনি ব্যর্থ হন। একদিকে রাজ্যচ্যুতি, অন্যদিকে দত্তক সন্তানের ভবিষ্যৎ—এই দুইয়ের দ্বন্দ্বে তিনি একাই দাঁড়িয়ে যান ইংরেজদের বিরুদ্ধে।
১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ ও যুদ্ধক্ষেত্রে লক্ষ্মীবাই
১৮৫৭ সালে যখন ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হয়, তখন লক্ষ্মীবাইও অস্ত্র তুলে নেন। ঝাঁসিতে তিনি সৈন্যদের সংগঠিত করেন, মহিলাদের প্রশিক্ষণ দেন এবং দুর্গ মজবুত করতে থাকেন।
তিনি একজন দক্ষ সেনাপতির মতো যুদ্ধ পরিকল্পনা করতেন। তাঁর সেনাবাহিনীতে তাতিয়া টোপে, রাও সাহেব, ঝলকারি বাই প্রমুখ ছিলেন। লক্ষ্মীবাই নিজে ঘোড়ার পিঠে চড়ে, পিঠে শিশু দামোদর রাওকে বেঁধে যুদ্ধক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিতেন।
ঝাঁসির যুদ্ধ
১৮৫৮ সালের মার্চ মাসে ব্রিটিশ বাহিনী ঝাঁসির দুর্গ ঘিরে ফেলে। রানির সৈন্যরা প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তোলে। কিন্তু একসময় ইংরেজরা দুর্গে প্রবেশ করে। রানী পিছু হটতে বাধ্য হন। তিনি দামোদর রাও-কে সঙ্গে নিয়ে কাল্পি অভিমুখে রওনা দেন।
কাল্পিতে তাতিয়া টোপের সঙ্গে মিলিত হয়ে তিনি গ্বালিয়রের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। সেখানে শেষ যুদ্ধ হয়।
মৃত্যু ও বীরত্বগাথা
১৮৫৮ সালের ১৮ জুন গ্বালিয়রের কাছে কোঠা কি সারাই নামক স্থানে ইংরেজ বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে রানি লক্ষ্মীবাই বীরোচিতভাবে নিহত হন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স ছিল মাত্র ২৯ বছর।
তাঁর মৃতদেহ যাতে ইংরেজদের হাতে না পড়ে, সেজন্য অনুগত সৈন্যরা তাঁর দেহ আগুনে ভস্ম করে দেন।
ব্রিটিশদের চোখে রানি লক্ষ্মীবাই
রানি লক্ষ্মীবাইয়ের বীরত্ব দেখে এমনকি ইংরেজরাও অভিভূত হয়েছিল। ব্রিটিশ সেনানায়ক হিউ রোজ তাঁর সম্পর্কে বলেছিলেন:
“She was the most dangerous of all Indian leaders. The bravest and the best.”
এ বক্তব্যই প্রমাণ করে কীভাবে এক নারী শাসক ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদীদের চোখে ভয়ংকর হয়ে উঠেছিলেন।
রানি লক্ষ্মীবাই ও নারীর ক্ষমতায়ন
রানি লক্ষ্মীবাই কেবল স্বাধীনতার প্রতীক নন, তিনি নারীর ক্ষমতায়নেরও প্রতীক। এক পুরুষ-শাসিত সমাজে দাঁড়িয়ে তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে নারী শুধু গৃহিণী নয়, প্রয়োজন হলে যোদ্ধা, সেনানায়ক ও রাষ্ট্রনায়িকাও হতে পারেন। তাঁর জীবন ছিল এক জীবন্ত বার্তা—নারী কখনও দুর্বল নয়।
কাব্যে, সাহিত্যে ও সংস্কৃতিতে রানির প্রভাব
রানি লক্ষ্মীবাইয়ের জীবন নিয়ে বহু কবিতা, নাটক, উপন্যাস ও চলচ্চিত্র রচিত হয়েছে। সবচেয়ে বিখ্যাত কবিতাটি হলো সুভদ্রা কুমারী চৌহান-এর লেখা হিন্দি কবিতা:
“झाँसी की रानी”
“ख़ूब लड़ी मर्दानी वो तो झाँसी वाली रानी थी।”
বাংলা সাহিত্যেও তাঁর ওপর ভিত্তি করে লেখা হয়েছে অনেক রচনা। এমনকি বলিউড ও টেলিভিশনে তাঁর জীবন বারবার চিত্রায়িত হয়েছে।
উত্তরাধিকার ও স্মৃতিচারণ
ভারত সরকারের তরফে রানি লক্ষ্মীবাই-এর স্মরণে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে:
- রানি লক্ষ্মীবাই রেজিমেন্ট (আইএনএ – Indian National Army) গঠিত হয় তাঁর নামে।
- তাঁর নামে ডাকটিকিট, স্মারক মূর্তি, রেলস্টেশন, কলেজ, স্কুল, এমনকি অন্তরীক্ষ মিশন-এর নামকরণ করা হয়েছে।
- ঝাঁসিতে তাঁর স্মৃতি রক্ষার্থে নির্মিত হয়েছে “ঝাঁসি ফোর্ট” এবং “রানি লক্ষ্মীবাই মিউজিয়াম”।
শিক্ষণীয় দিক
রানি লক্ষ্মীবাই-এর জীবন আমাদের শেখায়—
- অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করো, তা যত বড় শক্তিরই হোক।
- নারীরাও রাজনীতি, যুদ্ধ ও নেতৃত্বে পুরুষের সমকক্ষ, কখনও কখনও শ্রেষ্ঠও।
- দেশপ্রেম কোনো পদের অপেক্ষা করে না; তা হৃদয় থেকে আসে।
উপসংহার
রানি লক্ষ্মীবাই ছিলেন শুধু এক জন রানি নন—তিনি ছিলেন এক আদর্শ, এক ভাবনা, এক বিপ্লব। তাঁর জীবনের প্রতিটি অধ্যায় যেন এক মহাকাব্যের মতো। ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে তিনি এক চিরজাগরুক আলো, যাঁর সাহস, আত্মত্যাগ এবং নেতৃত্ব ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে যুগে যুগে উদ্বুদ্ধ করে যাবে।
তিনি ভারতের মাটি থেকে উঠে আসা এক অগ্নিকন্যা—
যিনি বলেছিলেন,
“আমি আমার ঝাঁসি দেব না।”
…এবং সত্যিই, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি তাঁর রাজ্য, তাঁর সন্তান ও তাঁর দেশকে আঁকড়ে ধরে লড়াই চালিয়ে গেছেন।












Leave a Reply