
দক্ষিণ ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্যের পূর্ব উপকূলে অবস্থিত বিশাখাপত্তনম (Visakhapatnam), সংক্ষেপে “ভাইজাগ (Vizag)” নামে পরিচিত। এটি একদিকে ভারতের অন্যতম প্রধান বন্দরনগরী, অন্যদিকে সমুদ্র ও পাহাড়ে ঘেরা এক অনন্য প্রাকৃতিক স্বর্গ। আধুনিক শহুরে রূপের পাশাপাশি এখানে লুকিয়ে আছে প্রাচীন ইতিহাস, প্রকৃতির মহিমা ও আধ্যাত্মিক শান্তি — যা প্রত্যেক ভ্রমণপ্রেমীর মনে এক অমলিন ছাপ রেখে যায়।
️ শহরের পরিচয়
বিশাখাপত্তনম বঙ্গোপসাগরের তীরে অবস্থিত এক ব্যস্ত মহানগর, যার উত্তর দিকে সবুজ পাহাড় আর দক্ষিণে অনন্ত নীল সমুদ্রের তরঙ্গ। শহরটি শুধু অন্ধ্রপ্রদেশ নয়, গোটা দক্ষিণ ভারতের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও পর্যটন কেন্দ্র। এটি দেশের অন্যতম প্রাচীন নৌবন্দর হিসেবেও সুপরিচিত।
বিশাখাপত্তনমকে বলা হয়—“পূর্ব উপকূলের রাণী” (The Jewel of the East Coast)। শহরের সৌন্দর্য, পরিচ্ছন্নতা এবং পরিকল্পিত নগরায়ণ একে ভারতের অন্যতম সুন্দরতম সমুদ্রনগরী করে তুলেছে।
সমুদ্রের টানে
বিশাখাপত্তনমে গেলে প্রথমেই চোখে পড়বে বিশাল নীল সমুদ্র আর তার সঙ্গে লাগোয়া লম্বা সৈকত।
- আর.কে. বিচ (Rama Krishna Beach): শহরের প্রাণকেন্দ্র। এখানে সূর্যাস্তের সময় নরম সোনালি আলোয় সমুদ্রের ঢেউয়ে আলো-ছায়ার খেলা সত্যিই মনোমুগ্ধকর। সৈকতের ধারে রয়েছে INS Kurusura Submarine Museum, যা ভারতের প্রথম সাবমেরিন মিউজিয়াম।
- রিশিকোন্ডা বিচ: শহর থেকে প্রায় ৮ কিমি দূরে, এটি সার্ফিং ও জেট স্কি প্রেমীদের স্বর্গরাজ্য। পাহাড়ের কোলে অবস্থিত এই সৈকত নিঃশব্দ ও মনোরম।
- ইয়ারাদা বিচ: তুলনামূলক নিরিবিলি, পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে পৌঁছনো যায়। এখানকার প্রাকৃতিক দৃশ্য যেন কোনও চিত্রকরের ক্যানভাস থেকে উঠে এসেছে।
️ পাহাড়, গুহা ও প্রাকৃতিক বিস্ময়
বিশাখাপত্তনমের আশেপাশে প্রকৃতি তার সম্পূর্ণ সৌন্দর্য বিলিয়ে দিয়েছে।
- কৈলাসগিরি পাহাড় (Kailasagiri Hill): শহরের এক মনোরম দর্শনীয় স্থান। পাহাড়ের চূড়া থেকে দেখা যায় বঙ্গোপসাগরের বিস্তীর্ণ জলরাশি। এখানে রয়েছে বিশাল শিব-পার্বতীর মূর্তি, যা রাতে আলোকিত হয়ে আরও মনোরম লাগে।
- বোর্রা গুহা (Borra Caves): শহর থেকে প্রায় ৯০ কিমি দূরে অবস্থিত এই প্রাকৃতিক চুনাপাথরের গুহাগুলি হাজার হাজার বছর পুরনো। গুহার ভেতরে আলো পড়লে মনে হয় যেন প্রকৃতি নিজেই এক অলৌকিক স্থাপত্য সৃষ্টি করেছে।
- আরাকু ভ্যালি (Araku Valley): প্রায় ১১২ কিমি দূরের এক সুন্দর পাহাড়ি এলাকা। কফির বাগান, জলপ্রপাত, আদিবাসী সংস্কৃতি আর শীতল আবহাওয়া—সব মিলিয়ে এটি এক ছোট্ট স্বর্গ।
ইতিহাস ও সংস্কৃতি
বিশাখাপত্তনম প্রাচীনকাল থেকেই সমুদ্রবাণিজ্যের জন্য পরিচিত। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে অশোক এই অঞ্চলকে তাঁর সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। পরে সাতবাহন, চোল ও বিশাখনাগর সাম্রাজ্যের প্রভাব পড়ে এখানে।
শহরের নাম “বিশাখাপত্তনম” এসেছে ভগবান বিষাখেশ্বর-এর নাম থেকে। এখানে অবস্থিত প্রাচীন বিশাখেশ্বর মন্দির, যা সমুদ্রের একেবারে ধারে।
শিল্প ও আধুনিকতা
বিশাখাপত্তনম শুধু পর্যটন নয়, এটি ভারতের অন্যতম প্রধান নৌবাহিনীর ঘাঁটি। এখানে রয়েছে Eastern Naval Command-এর সদর দপ্তর। পাশাপাশি বিশাখা স্টিল প্ল্যান্ট, হিন্দুস্তান শিপইয়ার্ড, তেল শোধনাগার এবং একাধিক আধুনিক শিল্প প্রতিষ্ঠান শহরের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেছে।
ধর্মীয় স্থান
- সিমহাচলম মন্দির: শহর থেকে প্রায় ১৬ কিমি দূরে অবস্থিত এই মন্দিরটি ভগবান নারসিংহদেবকে উৎসর্গীকৃত। দক্ষিণ ভারতের অন্যতম প্রাচীন মন্দির এটি।
- ISKCON মন্দির: ভগবান কৃষ্ণের প্রতি উৎসর্গীকৃত, শান্ত ও পবিত্র পরিবেশে ভক্তদের মন জুড়ে দেয়।
কীভাবে পৌঁছবেন
- বিমানপথে: বিশাখাপত্তনম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কলকাতা, চেন্নাই, হায়দরাবাদ, দিল্লি সহ বিভিন্ন শহরের সঙ্গে সংযুক্ত।
- রেলপথে: Visakhapatnam Junction ভারতের অন্যতম ব্যস্ত রেলস্টেশন।
- সড়কপথে: নিয়মিত বাস পরিষেবা রয়েছে ভুবনেশ্বর, রাজামুন্দ্রি, বিজয়ওয়াড়া, চেন্নাই প্রভৃতি শহর থেকে।
থাকার ব্যবস্থা
বিশাখাপত্তনমে পর্যটকদের জন্য রয়েছে নানা ধরণের আবাসন—
সৈকতের ধারে বিলাসবহুল হোটেল থেকে শুরু করে বাজেট গেস্ট হাউস পর্যন্ত।
R.K. Beach Road-এর আশেপাশে থাকা সবচেয়ে সুবিধাজনক।
️ ভ্রমণের উপযুক্ত সময়
অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত সময় বিশাখাপত্তনম ভ্রমণের জন্য শ্রেষ্ঠ। এই সময় আবহাওয়া মনোরম থাকে, সমুদ্রস্নান ও দর্শনীয় স্থান ভ্রমণ দুটোই উপভোগ করা যায়।
উপসংহার
বিশাখাপত্তনম এমন এক জায়গা, যেখানে প্রকৃতি, ইতিহাস ও আধুনিকতা একসাথে নিখুঁত সুরে মিশে গেছে।
এখানে সকাল শুরু হয় নরম সূর্যালোকে সমুদ্রের ঢেউয়ের সঙ্গীত দিয়ে, আর রাত ঘুমিয়ে পড়ে পাহাড়ের কোলে শান্ত নীল আকাশে।
ভাইজাগ যেন বলে ওঠে—
“এসো, আমার ঢেউয়ের সুরে হারিয়ে যাও, আমার পাহাড়ের ছায়ায় নিজেকে খুঁজে নাও।” ✨












Leave a Reply