
দক্ষিণ ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্যের হৃদয়ে অবস্থিত নাগার্জুন সাগর (Nagarjuna Sagar) এক অনন্য ভ্রমণস্থান—যেখানে প্রকৃতির সৌন্দর্য, প্রাচীন ইতিহাস এবং আধুনিক প্রকৌশলের বিস্ময় একসঙ্গে মিলেমিশে গেছে। এটি শুধু একটি বিশাল জলাধার নয়, বরং মানব মেধা ও প্রকৃতির মিলনে গঠিত এক চিরন্তন নিদর্শন।
নাগার্জুন সাগরের অবস্থান ও পরিচিতি
নাগার্জুন সাগর অবস্থিত অন্ধ্রপ্রদেশের গুন্তুর ও নালগোন্ডা জেলার সীমানায়, বিশাখাপত্তনম থেকে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার এবং হায়দরাবাদ থেকে প্রায় ১৬০ কিলোমিটার দূরে।
এই বিশাল বাঁধটি নির্মিত হয়েছে কৃষ্ণা নদীর উপর, যা দক্ষিণ ভারতের অন্যতম প্রধান নদী।
নাগার্জুন সাগর বাঁধ হলো বিশ্বের অন্যতম উঁচু মেসনারি (পাথরের) বাঁধ, যার উচ্চতা প্রায় ১২৪ মিটার এবং দৈর্ঘ্য প্রায় ১.৬ কিলোমিটার। এটি ভারতের জলবিদ্যুৎ ও সেচব্যবস্থার এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
⚙️ ইতিহাস ও নামকরণ
“নাগার্জুন সাগর” নামটি এসেছে এক মহামানব আচার্য নাগার্জুন-এর নাম থেকে, যিনি দ্বিতীয় শতাব্দীতে এখানে এক বিশাল বৌদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয় ও মঠ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
তাঁর প্রচারে এই অঞ্চল একসময় বৌদ্ধ সংস্কৃতির অন্যতম কেন্দ্র ছিল। পরবর্তীতে বাঁধ নির্মাণের সময় বহু প্রাচীন বৌদ্ধ স্থাপনা জলমগ্ন হয়ে যায়। সেগুলি সংরক্ষণ করে স্থানান্তরিত করা হয়েছে নাগার্জুন কন্দা (Nagarjunakonda) দ্বীপে।
নাগার্জুন কন্দা : ইতিহাসের দ্বীপ
নাগার্জুন সাগরের জলাশয়ের মাঝখানে অবস্থিত একটি ছোট দ্বীপ নাগার্জুন কন্দা, যা আজ একটি প্রত্নতাত্ত্বিক ধনভাণ্ডার।
এখানে রয়েছে প্রাচীন বৌদ্ধ বিহার, স্তূপ, মঠ ও প্রত্নসামগ্রী—যেগুলি খ্রিস্টীয় প্রথম থেকে তৃতীয় শতাব্দীর মধ্যে নির্মিত।
দ্বীপের উপর রয়েছে এক সুন্দর মিউজিয়াম, যেখানে সংরক্ষিত আছে প্রাচীন ভাস্কর্য, মৃৎপাত্র, লিপি ও মুদ্রা।
দ্বীপে যাওয়ার জন্য বাঁধের দিক থেকে ছোট ফেরি সার্ভিস রয়েছে, যা পর্যটকদের কাছে এক বিশেষ আকর্ষণ।
প্রকৃতির সৌন্দর্য ও দৃশ্যাবলী
নাগার্জুন সাগর লেকের নীলাভ জলরাশি, চারিদিকে পাহাড়ের ঘেরা সবুজ বনভূমি, আর আকাশের প্রতিফলন—সব মিলিয়ে দৃশ্যটি স্বপ্নের মতো।
ভোরবেলা সূর্যোদয়ের সময় কিংবা বিকেলের আলোয় যখন জলরাশি সোনালি রঙে ঝিলমিল করে, তখন পুরো এলাকা এক মায়াময় আবহে ভরে ওঠে।
এখানে আপনি উপভোগ করতে পারেন—
- বাঁধের দর্শনীয় স্পিলওয়ে থেকে জলছাড়ার দৃশ্য, যা বর্ষাকালে এক মহাকাব্যিক অভিজ্ঞতা।
- বোট রাইড বা ক্রুজে চেপে নাগার্জুন কন্দা দ্বীপে যাত্রা।
- পাহাড়ি পথ ধরে হাঁটা ও প্রাকৃতিক ফটোগ্রাফি।
বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ এলাকা
নাগার্জুন সাগরের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত নাগার্জুন সাগর – শ্রীশৈলম টাইগার রিজার্ভ, যা ভারতের বৃহত্তম বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যগুলির মধ্যে একটি।
এখানে রয়েছে—
- বাঘ, চিতা, হরিণ, নীলগাই, স্লথ বেয়ার, এবং
- শতাধিক প্রজাতির পাখি ও প্রজাপতি।
এই সংরক্ষিত অরণ্য ভ্রমণপ্রেমী ও ফটোগ্রাফারদের কাছে এক স্বর্গরাজ্য।
জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র
নাগার্জুন সাগর বাঁধ শুধু একটি পর্যটন কেন্দ্র নয়, এটি দক্ষিণ ভারতের শক্তির অন্যতম উৎস।
বাঁধের নিচেই অবস্থিত নাগার্জুন সাগর হাইড্রো ইলেকট্রিক পাওয়ার প্ল্যান্ট, যার উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ৮১৫ মেগাওয়াট।
এটি অন্ধ্রপ্রদেশ, তেলেঙ্গানা ও তামিলনাড়ুর বিভিন্ন অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে।
আশেপাশের দর্শনীয় স্থান
নাগার্জুন সাগর ঘুরতে এলে আশেপাশে আরও কিছু স্থান ঘুরে দেখা যায় —
- ইথমপুর জলপ্রপাত (Ethipothala Waterfalls) – প্রায় ৭০ ফুট উঁচু এক মনোরম ঝরনা।
- আনুপল্লি গুহা (Anupu Ruins) – যেখানে প্রাচীন বৌদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয়ের নিদর্শন পাওয়া গেছে।
- শ্রীশৈলম মন্দির – বিখ্যাত জ্যোতির্লিঙ্গ তীর্থস্থান, যা নাগার্জুন সাগর থেকে প্রায় ১৫০ কিমি দূরে।
স্থানীয় স্বাদ ও সংস্কৃতি
এই অঞ্চলের খাবারে অন্ধ্রর মশলা ও স্বাদের প্রভাব সুস্পষ্ট।
তামারিন্দ রাইস, গঙ্গুরা পচাড়ি, দোসা, এবং মাছের ঝোল—সবই এখানে অনন্য স্বাদে ভরপুর।
স্থানীয় মানুষের আন্তরিক আতিথেয়তা ভ্রমণকে আরও আনন্দময় করে তোলে।
️ ভ্রমণের উপযুক্ত সময়
অক্টোবর থেকে মার্চ মাস নাগার্জুন সাগর ভ্রমণের আদর্শ সময়।
এই সময়ে আবহাওয়া শীতল ও মনোরম থাকে।
বর্ষাকালে বাঁধ থেকে জলছাড়ার দৃশ্য দেখতে ভিড় বাড়ে, তবে গরমের সময়ে (এপ্রিল–জুন) এখানে যাওয়া কিছুটা অসুবিধাজনক।
কীভাবে পৌঁছবেন
- বিমানপথে: নিকটতম বিমানবন্দর হায়দরাবাদ (রাজীব গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর)।
- রেলপথে: মিরিয়ালাগুড়া বা নালগোন্ডা স্টেশন নাগার্জুন সাগরের নিকটবর্তী রেলস্টেশন।
- সড়কপথে: হায়দরাবাদ থেকে নিয়মিত বাস ও ট্যাক্সি পরিষেবা পাওয়া যায়।
উপসংহার
নাগার্জুন সাগর একসঙ্গে ইতিহাস, প্রকৃতি ও প্রযুক্তির মেলবন্ধন।
এখানে দাঁড়িয়ে যেমন প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যে হারিয়ে যাওয়া যায়, তেমনি অনুভব করা যায় প্রাচীন সভ্যতার উত্তরাধিকার এবং আধুনিক ভারতের কীর্তি।
যারা একসঙ্গে প্রকৃতি, নীরবতা, ইতিহাস ও রোমাঞ্চ খোঁজেন—নাগার্জুন সাগর তাদের জন্য এক অবিস্মরণীয় ভ্রমণস্থল।












Leave a Reply