
ইংল্যান্ডের হৃদয়ে অবস্থিত অক্সফোর্ড—একটি শহর যা শুনলেই মনে পড়ে যায় মধ্যযুগীয় বিশ্ববিদ্যালয়, রাজকীয় স্থাপত্য আর স্বপ্নে ঘেরা পাথুরে পথ। “City of Dreaming Spires” নামে পরিচিত অক্সফোর্ড যেন জ্ঞান, কল্পনা ও সৌন্দর্যের এক মায়াবী মিশ্রণ। এখানে ঘুরে বেড়ানো মানে ইতিহাসের পাতায় হাঁটাহাঁটি করা, আর প্রতিটি মুহূর্তে অনুভব করা যুগ যুগ ধরে জন্ম নেওয়া প্রতিভাদের ছোঁয়া।
শহরে প্রথম দেখা – শান্ত, শিক্ষাময় এক পরিবেশ
অক্সফোর্ডে প্রবেশ করলেই সবচেয়ে যেটা হৃদয় ছুঁয়ে যায়, তা হলো শহরের প্রশান্তি। পুরনো সময়ের পাথরের ভবন, গির্জার সুউচ্চ মিনার, আর ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসের নীরব পরিবেশ—এসব দেখেই বোঝা যায় কেন শত শত বছর ধরে শিক্ষার্থীদের স্বপ্নের ঠিকানা এই শহর।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় – বিশ্বের প্রাচীনতম শিক্ষাকেন্দ্রগুলোর একটি
অক্সফোর্ডের মর্মই হলো তার বিশ্ববিদ্যালয়। এটি আলাদা কোনো ক্যাম্পাস নয়; পুরো শহরটিই যেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশ।
এখানে রয়েছে:
- ৩৮টি কলেজ,
- অসংখ্য লাইব্রেরি,
- বিখ্যাত অডিটোরিয়াম,
- এবং ইতিহাসের গৌরবে সাজানো চত্বর।
ক্রাইস্ট চার্চ কলেজ, মাগডালেন কলেজ, বলিয়ল কলেজ, ট্রিনিটি কলেজ—এগুলোর প্রতিটি ভবনই মধ্যযুগীয় শিল্পকলার জীবন্ত উদাহরণ।
বডলিয়ান লাইব্রেরি – জ্ঞানভান্ডারের অমূল্য দুনিয়া
ইউরোপের অন্যতম বৃহত্তম লাইব্রেরি বডলিয়ান—এ আসলেই মনে হয় জ্ঞানের মহাসমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়ে আছি।
দুটি জায়গা বিশেষভাবে নজর কাড়ে:
- ডিউক হামফ্রে’স লাইব্রেরি,
- রাডক্লিফ ক্যামেরা, গোলাকার ওই অসামান্য ভবনটি অক্সফোর্ডের প্রতীক।
এখানে ঢুকে মনে হয় যেন হ্যারি পটার সিনেমার সেটে দাঁড়িয়ে আছি—কারণ সত্যিই এর কিছু অংশ সেই সিনেমায় ব্যবহার করা হয়েছে!
অক্সফোর্ডের রাস্তা – পায়ের তালে ইতিহাসের গল্প
পুরো শহরটাই পায়ে হেঁটে ঘোরা যায়।
- হাই স্ট্রিট,
- ব্রড স্ট্রিট,
- কারফ্যাক্স টাওয়ার,
- ব্রিজ অফ সাইস—
এসব জায়গা আপনাকে ইতিহাস, শিল্প আর জীবনের মায়ায় আবদ্ধ করে ফেলে।
রাস্তার পাশে ছোট কফিশপগুলোতে বসে গরম কফি হাতে নিজেরাই যেন কবি হয়ে ওঠেন ভ্রমণকারীরা।
ক্রাইস্ট চার্চ কলেজ – যেখানে ইতিহাস আর সাহিত্য মিলেমিশে যায়
এই কলেজই লুইস ক্যারলের অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড–এর জন্মস্থান। এখানকার ডাইনিং হল এতটাই রাজকীয় ও সুন্দর যে মনে হয় শতাব্দী পেরিয়ে কোনো রাজপ্রাসাদে এসে পড়েছি। হ্যারি পটার–এর কিছু দৃশ্যও এখানে চিত্রায়িত হয়েছে।
মাগডালেন কলেজ – ফুল, নদী ও প্রকৃতির শান্তিপূর্ণ সমাহার
অক্সফোর্ডের সবচেয়ে সুন্দর কলেজগুলোর একটি।
এখানে আছে সবুজ ঘাস, ফুলে ভরা পথ, পাখির ডাক, আর পাশ দিয়ে বয়ে চলা রিভার চেরওয়েল।
এমন প্রশান্ত জায়গা শহরের মধ্যে খুব কমই দেখা যায়।
রিভার চেরওয়েল ও পন্টিং – অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা
অক্সফোর্ডে গেলে অবশ্যই পন্টিং করতে হবে—একটি লম্বা কাঠের নৌকো হাতে লম্বা বৈঠা নিয়ে নদীর ওপরে ভেসে বেড়ানো।
নদীর দু’পাশের সবুজ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আপনাকে মুহূর্তেই স্বপ্নের দেশে নিয়ে যাবে।
অ্যাশমোলিয়ান মিউজিয়াম – শিল্প-সংস্কৃতির ধনভান্ডার
ইংল্যান্ডের প্রথম পাবলিক মিউজিয়াম। এখানে আছে—
- মিশরের প্রাচীন মমি,
- রেনেসাঁ যুগের চিত্রকলা,
- এশীয় সংস্কৃতির নিদর্শন,
- এবং নানা যুগের মহামূল্যবান শিল্পকর্ম।
শিল্পপ্রেমীদের জন্য এটি স্বর্গের মতো।
লোকাল খাবার – ইংলিশ স্বাদের ছোঁয়া
অক্সফোর্ডে অনেক ঐতিহ্যবাহী পাব ও ক্যাফে আছে।
- ফিশ অ্যান্ড চিপস,
- ইংলিশ ব্রেকফাস্ট,
- পাই অ্যান্ড ম্যাশ,
- আর গরম কফির কাপ—
এসব ভ্রমণকে আরামদায়ক ও সম্পূর্ণ করে তোলে।
শেষ কথাঃ অক্সফোর্ড – যে শহর মনের গভীরে থেকে যায়
অক্সফোর্ড শুধুই একটি শহর নয়—এটি এক অনুভূতি, এক অনুপ্রেরণা।
এখানে প্রতিটি দেয়াল, প্রতিটি রাস্তা, প্রতিটি গির্জা যেন শিক্ষা, শিল্প, সাহিত্য ও ইতিহাসের গল্প শোনায়।
অক্সফোর্ড এমন একটি শহর, যাকে একবার দেখলে সারাজীবন ভুলে থাকা যায় না।
এটি যেন এক স্বপ্ন—
যেখানে জ্ঞান ও সৌন্দর্য পাশাপাশি পথ চলে,
আর ভ্রমণকারীর হৃদয়ে রেখে যায় চিরস্থায়ী ছাপ।












Leave a Reply