মাটির প্রদীপ।

শরৎকাল। গ্রামের আকাশ তখন পরিষ্কার, বাতাসে শিউলির গন্ধ। নদিয়ার ছোট্ট গ্রাম শান্তিপুরে প্রতি বছর কালীপুজোর সময় মাটির প্রদীপে সেজে উঠত প্রতিটি বাড়ি।

এই গ্রামেরই এক প্রান্তে থাকতেন হরনাথ পাল, পেশায় কুমোর। বয়স সত্তরের কাছাকাছি। তাঁর ছোট্ট মাটির ঘর আর তার পাশেই ছিল মাটির জিনিস তৈরির কারখানা।

সারাদিন তিনি মাটি দিয়ে প্রদীপ, হাঁড়ি, কলসি, পুতুল তৈরি করতেন।

হরনাথবাবুর একমাত্র নাতি রাহুল শহরে পড়াশোনা করত। ছুটিতে বাড়িতে এলেই দাদুর কাজ দেখে অবাক হয়ে যেত।

একদিন রাহুল বলল,

— “দাদু, এখন তো বাজারে কত সুন্দর ইলেকট্রিক আলো পাওয়া যায়। মানুষ তোমার মাটির প্রদীপ কিনবে কেন?”

হরনাথবাবু মাটির একটি প্রদীপ হাতে নিয়ে মৃদু হেসে বললেন,

— “আলো শুধু চোখে দেখার জিনিস নয় রে। কিছু আলো মানুষের মনে জ্বলে।”

রাহুল কথাটা বুঝল না।


কালীপুজোর কয়েকদিন আগে হরনাথবাবু অসুস্থ হয়ে পড়লেন। কাজ বন্ধ হয়ে গেল।

বাড়িতে তখন চিন্তার ছায়া।

কারণ এই কয়েকদিনের প্রদীপ বিক্রির টাকাতেই তাঁদের বছরের অনেকটা খরচ উঠে আসত।

রাহুল দাদুর পাশে বসে বলল,

— “দাদু, তুমি চিন্তা কোরো না। আমি প্রদীপগুলো বিক্রি করব।”

হরনাথবাবু অবাক হয়ে নাতির দিকে তাকালেন।

— “তুই পারবি?”

— “চেষ্টা করব।”

পরদিন রাহুল প্রদীপগুলো নিয়ে বাজারে বসে পড়ল।

কিন্তু প্রথম কয়েক ঘণ্টায় কেউ তেমন প্রদীপ কিনল না।

সবাই প্লাস্টিকের আলো, বৈদ্যুতিক মালা আর রঙিন বাতির দিকে ছুটছে।

রাহুল হতাশ হয়ে বসে রইল।

ঠিক তখন এক বৃদ্ধা এসে একটি প্রদীপ হাতে তুলে নিলেন।

— “কত?”

— “দশ টাকা।”

বৃদ্ধা বললেন,

— “একটা নয়, বিশটা দাও।”

রাহুল অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,

— “এতগুলো?”

বৃদ্ধা মৃদু হেসে বললেন,

— “আমার স্বামী যখন বেঁচে ছিলেন, প্রতি কালীপুজোয় তিনিই প্রদীপ জ্বালাতেন। এখন তিনি নেই। কিন্তু প্রদীপের আলোটা এখনও জ্বালিয়ে রাখি।”

রাহুল চুপ করে গেল।


বৃদ্ধার কথাটি সে মনে রাখল।

পরদিন সে প্রদীপের সঙ্গে একটি ছোট্ট কাগজ লাগিয়ে দিল।

তাতে লেখা—

“একটি মাটির প্রদীপ কিনুন, একটি ঘরের স্মৃতি জ্বালান।”

অদ্ভুতভাবে মানুষের আগ্রহ বাড়তে লাগল।

কেউ বলল,

— “আমার মায়ের কথা মনে পড়ছে।”

কেউ বলল,

— “ছোটবেলায় আমরাও মাটির প্রদীপ জ্বালাতাম।”

কেউ দশটি কিনল, কেউ পঞ্চাশটি।

দুদিনের মধ্যেই সব প্রদীপ বিক্রি হয়ে গেল।

রাহুল বাড়ি ফিরে দাদুর হাতে টাকাগুলো তুলে দিল।

হরনাথবাবুর চোখে জল এসে গেল।

তিনি বললেন,

— “দেখলি? মাটির জিনিসের দাম কম হতে পারে, কিন্তু তার স্মৃতির দাম অনেক বেশি।”


পরের বছর রাহুল একটি নতুন পরিকল্পনা করল।

সে গ্রামের কুমোরদের তৈরি মাটির প্রদীপ, পুতুল, হাঁড়ি এবং অন্যান্য জিনিস নিয়ে একটি ছোট অনলাইন ব্যবসা শুরু করল।

শহরের মানুষও গ্রামের তৈরি জিনিস কিনতে শুরু করল।

কয়েক মাসের মধ্যেই গ্রামের বহু কুমোরের আয় বেড়ে গেল।

যে তরুণেরা অন্য শহরে কাজের খোঁজে চলে যেতে চাইছিল, তারাও আবার গ্রামে ফিরে এল।

হরনাথবাবুর ছোট্ট কারখানা হয়ে উঠল গ্রামের প্রশিক্ষণকেন্দ্র।

সেখানে শিশু-কিশোরদের মাটির কাজ শেখানো হতে লাগল।

একদিন রাহুল দাদুকে বলল,

— “দাদু, তোমার একটা প্রদীপ এত মানুষের জীবন বদলে দিল!”

হরনাথবাবু হেসে বললেন,

— “প্রদীপ নিজে খুব ছোট। কিন্তু তার আলো অন্য প্রদীপ জ্বালাতে পারে। মানুষের জীবনও তেমন।”


কয়েক বছর পরে হরনাথবাবু আর ছিলেন না।

তাঁর মৃত্যুর পর রাহুল গ্রামের মাঝখানে একটি ছোট্ট কর্মশালা তৈরি করল।

নাম দিল—

“হরনাথ মৃৎশিল্প কেন্দ্র”।

প্রতিবছর কালীপুজোর রাতে সেখানে হাজার হাজার মাটির প্রদীপ জ্বলে উঠত।

প্রথম প্রদীপটি জ্বালানো হতো হরনাথবাবুর পুরোনো চাকার পাশে।

তার পাশে একটি ফলকে লেখা ছিল—

“অন্ধকারকে গালমন্দ করে লাভ নেই। একটি ছোট্ট প্রদীপ জ্বালিয়ে দাও।”

রাহুল প্রতি বছর সেই প্রথম প্রদীপটি জ্বালিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকত।

তার মনে পড়ত দাদুর কথা—

“কিছু আলো চোখে দেখা যায় না, মনে অনুভব করতে হয়।”

দূরে তখন হাজার হাজার প্রদীপ জ্বলছে।

একটি প্রদীপ থেকে আরেকটি প্রদীপ।

একটি মানুষের স্বপ্ন থেকে আরেকটি মানুষের স্বপ্ন।

আর সেই আলোয় যেন পুরো গ্রাম বলে উঠছে—

আলো যত ভাগ করা যায়, ততই বাড়ে।

সমাপ্ত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *