
মুর্শিদাবাদের এক প্রত্যন্ত গ্রাম—কৃষ্ণপুর। গ্রামের শেষ প্রান্তে ছিল একটি ছোট্ট কুঁড়েঘর। সেখানে মা মায়া ও ছেলে অর্ণব থাকত।
অর্ণবের বয়স তখন মাত্র বারো। বাবা বহু বছর আগে মারা গিয়েছিলেন। মা অন্যের বাড়িতে কাজ করে সংসার চালাতেন।
সংসারে অভাব ছিল, কিন্তু অর্ণবের স্বপ্নে কোনো অভাব ছিল না।
সে প্রতিরাতে উঠোনে শুয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকত।
তার সবচেয়ে বড় কৌতূহল ছিল—তারাগুলো আসলে কী?
একদিন মাকে জিজ্ঞেস করল,
— “মা, আকাশের ওপারে কী আছে?”
মা হেসে বললেন,
— “জানি না রে।”
— “আমি বড় হয়ে জেনে নেব।”
মা ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
— “তুই পারবি।”
একটি অদ্ভুত স্বপ্ন
গ্রামে মাঝে মাঝে একজন বৃদ্ধ শিক্ষক আসতেন। তাঁর নাম শশাঙ্কবাবু। তিনি অবসরপ্রাপ্ত বিজ্ঞান শিক্ষক।
একদিন তিনি দেখলেন, অর্ণব মাটিতে কাঠি দিয়ে আকাশের ছবি আঁকছে।
তিনি জিজ্ঞেস করলেন,
— “এগুলো কী?”
অর্ণব বলল,
— “তারাগুলোকে আমি নাম দিচ্ছি।”
— “কেন?”
— “যেগুলোকে আমরা চিনি না, তাদের নাম দেওয়া উচিত।”
শশাঙ্কবাবু মুগ্ধ হয়ে গেলেন।
পরদিন তিনি অর্ণবকে একটি পুরোনো বই দিলেন।
বইটি ছিল মহাকাশবিজ্ঞান নিয়ে।
অর্ণব বইটি হাতে নিয়ে যেন গুপ্তধন পেয়ে গেল।
“আমি আকাশ কিনব”
একদিন অর্ণব মাকে বলল,
— “মা, আমি বড় হয়ে আকাশ কিনব।”
মা হেসে ফেললেন।
— “আকাশ আবার কেনা যায় নাকি?”
— “যদি না যায়, তাহলে আকাশের একটা অংশ আমার নামে করব।”
মা বললেন,
— “তুই আগে নিজের পায়ে দাঁড়া। তারপর আকাশের সঙ্গে যা খুশি করিস।”
অর্ণবের পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ দেখে শশাঙ্কবাবু তাকে বিনামূল্যে পড়াতে শুরু করলেন।
কিন্তু সমস্যা ছিল অন্য জায়গায়।
উচ্চশিক্ষার জন্য শহরে যেতে হবে।
মায়ার কাছে সেই টাকা ছিল না।
অর্ণব একদিন বলল,
— “আমি পড়াশোনা ছেড়ে দেব।”
শশাঙ্কবাবু কঠিন গলায় বললেন,
— “স্বপ্নের দাম টাকা দিয়ে মাপা যায় না।”
তিনি নিজে কয়েকজন পুরোনো সহকর্মীর সঙ্গে যোগাযোগ করলেন।
অর্ণব একটি বৃত্তি পেল।
তারপর শুরু হলো নতুন পথ।
শহরের জীবন
শহরের বড় স্কুলে প্রথম দিন অর্ণব খুব অস্বস্তি বোধ করল।
অনেক ছাত্রের কাছে দামি মোবাইল, ল্যাপটপ, উন্নত বই।
আর তার কাছে ছিল পুরোনো একটি ব্যাগ আর শশাঙ্কবাবুর দেওয়া সেই বই।
কেউ কেউ তাকে নিয়ে হাসাহাসি করত।
একদিন একজন বলল,
— “তুই নাকি আকাশ কিনবি?”
অর্ণব কিছু বলল না।
সেদিন রাতে হোস্টেলের ছাদে উঠে আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল,
— “একদিন তোমাদের সবাইকে দেখাব।”
বড় পরীক্ষা
উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় অর্ণব জেলার মধ্যে প্রথম হলো।
তারপর পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা শুরু করল।
মহাকাশবিজ্ঞানে গবেষণা করতে করতে একসময় সে একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা প্রতিষ্ঠানে সুযোগ পেল।
সেখানে সে মহাকাশের দূরবর্তী নক্ষত্র নিয়ে কাজ করতে শুরু করল।
বহু বছরের পরিশ্রমের পর তার গবেষণা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেল।
একটি নতুন আবিষ্কৃত নক্ষত্রের নামকরণে তার গবেষণার অবদান স্বীকৃত হলো।
সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হলো।
অর্ণবের গ্রামের মানুষ আনন্দে মেতে উঠল।
ফিরে আসা
বহু বছর পরে অর্ণব গ্রামে ফিরল।
মা তখন বৃদ্ধা।
অর্ণব মায়ের সামনে বসে বলল,
— “মা, মনে আছে? আমি বলেছিলাম আকাশ কিনব?”
মা হাসলেন।
— “মনে আছে।”
অর্ণব আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,
— “আকাশ কিনতে পারিনি। কিন্তু তারাদের একটু কাছ থেকে দেখতে শিখেছি।”
মায়ের চোখে জল।
— “তোর বাবা থাকলে খুব খুশি হতো।”
অর্ণব মায়ের হাত ধরে বলল,
— “তোমরা আমাকে আকাশ দেখতে শিখিয়েছিলে।”
একটি নতুন স্বপ্ন
অর্ণব গ্রামের স্কুলে একটি ছোট বিজ্ঞানকেন্দ্র তৈরি করল।
সেখানে একটি টেলিস্কোপ বসানো হলো।
গ্রামের শিশুরা প্রথমবার চাঁদের গর্ত, বৃহস্পতি আর তার কয়েকটি উপগ্রহ দেখতে পেল।
একটি ছোট ছেলে টেলিস্কোপে চোখ রেখে চিৎকার করে উঠল—
— “স্যার! আমি চাঁদ দেখতে পাচ্ছি!”
অর্ণব হেসে বলল,
— “দেখেছ? আকাশ সবার জন্য।”
ছেলেটি জিজ্ঞেস করল,
— “স্যার, আমি কি বড় হয়ে মহাকাশে যেতে পারব?”
অর্ণব বলল,
— “অবশ্যই।”
তারপর সে স্কুলের দেওয়ালে একটি বাক্য লিখে দিল—
“যে শিশু আকাশের দিকে তাকিয়ে স্বপ্ন দেখতে শেখে, তার পায়ের নিচের মাটিও একদিন তাকে অনেক দূর নিয়ে যায়।”
সেদিন রাতে অর্ণব আবার নিজের পুরোনো বাড়ির উঠোনে শুয়ে পড়ল।
ছোটবেলার মতোই আকাশের দিকে তাকাল।
তার মনে হলো, আকাশ এখনও আগের মতোই বিশাল।
শুধু সে বদলে গেছে।
একসময় সে আকাশ কিনতে চেয়েছিল।
আজ সে বুঝেছে—
আকাশ কেনার নয়।
আকাশকে দেখার, বোঝার, ভালোবাসার এবং অন্যদেরও দেখানোর জন্য।
দূরে মায়ের কণ্ঠ শোনা গেল—
— “অর্ণব, ঘুমাবি না?”
সে হেসে উত্তর দিল,
— “আর একটু মা। তারাগুলো গুনছি।”
মা বললেন,
— “তুই ছোটবেলাতেও একই কথা বলতিস।”
অর্ণব চোখ বন্ধ করে মৃদু হাসল।
তারপর মনে হলো, তার শৈশবের সেই স্বপ্নটি এখনও আকাশে জ্বলছে।
একটি ছোট্ট জোনাকির মতো।












Leave a Reply