বৃষ্টিভেজা বারান্দায় শেষ দেখা।

রাত আটটা।

অর্ক বারান্দায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখছিল। হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হলো।

এই সময় সাধারণত কেউ আসত না।

দরজা খুলতেই অর্ক থমকে গেল।

সামনে দাঁড়িয়ে মীরা।

বারো বছর পর।

চোখে ক্লান্তি, হাতে ছোট একটি ব্যাগ।

অর্ক কিছুক্ষণ কোনো কথা বলতে পারল না।

মীরা মৃদু হেসে বলল,

— আমাকে দেখে এত অবাক হয়েছ?

— তুমি এখানে?

— আজ শুধু এক রাতের জন্য এসেছি।

অর্ক তাকে ভেতরে নিয়ে এল।

দু’জনের মধ্যে বারো বছরের দূরত্ব যেন ঘরের বাতাসকেও ভারী করে তুলেছিল।

একসময় তারা একে অপরকে ভালোবাসত।

কিন্তু মীরা হঠাৎ একদিন অর্ককে ছেড়ে চলে গিয়েছিল।

কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই।

অর্ক বহু বছর ধরে ভেবেছিল, মীরা তাকে ভালোবাসেনি।

সেই অভিমান সে কখনো কাউকে বলেনি।

চা বানাতে বানাতে অর্ক জিজ্ঞেস করল,

— এত বছর পর হঠাৎ কেন?

মীরা জানালার দিকে তাকিয়ে বলল,

— একটা কাজ ছিল।

— কী কাজ?

মীরা ব্যাগ থেকে একটি পুরোনো খাম বের করল।

— এটা তোমার জন্য।

অর্ক খামটি হাতে নিল।

ভেতরে একটি হাসপাতালের কাগজ।

তারিখ বারো বছর আগের।

অর্ক কাগজটা পড়ে স্তব্ধ হয়ে গেল।

মীরার বাবার জরুরি অস্ত্রোপচার দরকার ছিল। প্রচুর টাকা লাগত। সেই সময় মীরা অর্কের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে একটি অন্য শহরে চলে গিয়েছিল।

অর্ক ধীরে বলল,

— তুমি আমাকে কিছু বলোনি কেন?

মীরা চোখ নামিয়ে বলল,

— তোমার কাছে সাহায্য চাইলে তুমি নিজের জীবনটা নষ্ট করতে। আমি সেটা চাইনি।

— কিন্তু তুমি আমাকে একটা সুযোগও দিলে না!

মীরা চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

— তোমার বাবা তখন অসুস্থ ছিলেন। তোমার নিজের পরিবারই তোমার ওপর নির্ভর করছিল। আমি জানতাম, তুমি আমাকে সাহায্য করতে গিয়ে নিজের সবকিছু বিক্রি করে দিতে পারো।

অর্কের চোখ ভিজে উঠল।

— তুমি কীভাবে জানলে?

মীরা মৃদু হেসে বলল,

— কারণ তুমি আমাকে ভালোবাসতে।

বাইরে তখন বৃষ্টি আরও জোরে পড়ছিল।

অর্ক বলল,

— তোমার বাবা?

— বেঁচে ছিলেন আরও কয়েক বছর। তারপর চলে গেলেন।

কিছুক্ষণ নীরবতা।

অর্ক জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,

— তুমি কি কখনো আমাকে মনে করেছ?

মীরা উত্তর দিল না।

তার বদলে ব্যাগ থেকে একটি পুরোনো ছবি বের করল।

ছবিতে অর্ক আর মীরা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে।

ছবির পেছনে লেখা—

“যদি কখনো আলাদা হয়ে যাই, তবুও এই দিনটা যেন হারিয়ে না যায়।”

অর্ক ছবিটা হাতে নিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

— তুমি এতদিন এটা রেখেছিলে?

— হ্যাঁ।

— তাহলে বিয়ে করোনি কেন?

মীরা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

— সবাই বিয়ে করে সংসার করার জন্য। আমি পারিনি।

অর্ক মৃদু হেসে বলল,

— আমিও না।

দু’জনেই হেসে ফেলল।

কিন্তু সেই হাসির মধ্যে বহু বছরের কষ্ট মিশে ছিল।

রাত বাড়তে লাগল।

মীরা বলল,

— আমাকে কাল ভোরে চলে যেতে হবে।

অর্ক জানত, এবারও সে তাকে আটকে রাখতে পারবে না।

তবু সে বলল,

— এবার অন্তত যাওয়ার আগে একটা কথা বলো।

— কী?

— তুমি কি সত্যিই আমাকে ভালোবাসতে?

মীরা তার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর ধীরে বলল,

— ভালোবাসতাম না।

অর্কের মুখ ম্লান হয়ে গেল।

মীরা একটু থেমে বলল,

— ভালোবাসি।

অর্ক চোখ তুলে তাকাল।

মীরা হেসে বলল,

— অতীতের কথা বলতে গেলে “ভালোবাসতাম” হয়। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে সেটা শেষ হয়নি।

ভোর হওয়ার আগেই মীরা চলে গেল।

অর্ক দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রইল।

বারান্দায় তখনও বৃষ্টির জল জমে আছে।

মেঝেতে মীরার পায়ের ছোট ছোট ছাপ।

অর্ক জানত না তারা আবার কখনো দেখা করবে কি না।

কিন্তু এবার তার মনে কোনো অভিমান ছিল না।

শুধু একটা উপলব্ধি—

কখনো কখনো মানুষ দূরে চলে যায় ভালোবাসা শেষ হয়ে যাওয়ার কারণে নয়।

বরং এত বেশি ভালোবাসে বলেই নিজের কষ্টটুকু একা বহন করে।

সেদিন সকালে অর্ক বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখল, বৃষ্টি থেমে গেছে।

রোদ উঠছে।

আর বারান্দার কোণে মীরা একটি ছোট কাগজ রেখে গেছে।

তাতে লেখা—

“এবার যদি আবার দেখা হয়, কোনো কথা লুকিয়ে রেখো না।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *