বৃষ্টির রাতে বন্ধ রেডিও।

অভ্রর বাড়িতে একটি পুরোনো রেডিও ছিল। ছোটবেলায় তার দাদু সেটি ব্যবহার করতেন। বহু বছর ধরে রেডিওটি নষ্ট হয়ে পড়েছিল। ব্যাটারি নেই, অ্যান্টেনা ভাঙা, সুইচও কাজ করে না।

তবু এক বর্ষার রাতে সেটি হঠাৎ বেজে উঠল।

রাত তখন ১টা ১৩ মিনিট।

অভ্র ঘুম থেকে উঠে শুনল—

“…যে শুনছেন, তিনি যেন আজ রাতেই ঘরের উত্তর দিকের জানালাটা বন্ধ করেন…”

অভ্র বিছানায় উঠে বসল।

রেডিওটা নিজে থেকেই চলছে!

সে কাছে গিয়ে সুইচ ঘোরাল। কোনো কাজ হলো না।

আবার রেডিও থেকে আওয়াজ এল—

“অভ্র…”

তার বুক কেঁপে উঠল।

কণ্ঠটা তাকে নাম ধরে ডাকছে।

— কে?

রেডিও কিছুক্ষণ নীরব।

তারপর ভেসে এল,

“কাল সকাল হওয়ার আগেই সত্যিটা খুঁজে বের করো।”

হঠাৎ রেডিও বন্ধ হয়ে গেল।

পরদিন সকালে অভ্র ভেবেছিল, সবটাই হয়তো স্বপ্ন।

কিন্তু রেডিওর পাশে একটি পুরোনো কাগজ পড়ে ছিল।

কাগজে শুধু লেখা—

“১৯৯৮—উত্তর জানালা।”

অভ্রর কৌতূহল হলো।

সে বাড়ির পুরোনো নথি ঘাঁটতে শুরু করল। জানতে পারল, ১৯৯৮ সালে তার দাদুর ছোট ভাই সমীর হঠাৎ নিখোঁজ হয়েছিলেন।

পরিবারে বলা হতো, তিনি বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন।

কিন্তু কেন?

কেউ জানত না।

অভ্রর দিদা তখনও বেঁচে ছিলেন। তিনি পুরোনো কথাটা শুনে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

— সমীর চলে যায়নি।

— তাহলে?

— ওকে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল।

অভ্র অবাক হয়ে গেল।

দিদা জানালেন, সমীর বাড়ির জমি বিক্রির বিরুদ্ধে ছিলেন। পরিবারের কয়েকজন সদস্য গোপনে জমি বিক্রি করতে চেয়েছিল। সমীর বিষয়টি জানতে পেরে বাধা দিয়েছিলেন।

তারপর এক রাতে তিনি নিখোঁজ হন।

অভ্র জিজ্ঞেস করল,

— কেউ পুলিশে খবর দেয়নি?

— দিয়েছিল। কিন্তু কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

অভ্র সেই রাতের কথা ভাবতে লাগল।

“উত্তর জানালা।”

বাড়ির উত্তর দিকে একটি পুরোনো ঘর ছিল, যা বহু বছর ধরে বন্ধ।

সে তালা খুলে ঘরে ঢুকল।

ধুলোয় ঢাকা আসবাবের মধ্যে একটি কাঠের আলমারি দেখতে পেল।

আলমারির পেছনে দেয়ালের সঙ্গে একটি ছোট ফাঁক।

সেখানে হাত ঢোকাতেই একটি টিনের বাক্স বেরিয়ে এল।

বাক্সে ছিল কিছু দলিল, একটি পুরোনো ক্যাসেট এবং সমীরের হাতের লেখা ডায়েরির কয়েকটি পৃষ্ঠা।

ডায়েরিতে লেখা ছিল—

“আজ বুঝলাম, আমার নিজের মানুষদেরই বিশ্বাস করা উচিত নয়। জমির দলিল বদলানো হচ্ছে। আমি প্রমাণ রেখে যাচ্ছি।”

শেষ পাতায় লেখা—

“যদি আমি আর ফিরে না আসি, উত্তর জানালার পেছনে খুঁজবে।”

অভ্র স্তব্ধ হয়ে গেল।

ঠিক তখনই বাইরে বজ্রপাত হলো।

আর ঘরের পুরোনো রেডিওটি আবার বেজে উঠল।

এই ঘরে তো রেডিও থাকার কথাই নয়!

অভ্র ধীরে ধীরে রেডিওটির কাছে গেল।

ভেসে এল সমীরের কণ্ঠ—

“ডায়েরি পেয়েছ?”

অভ্র কাঁপা গলায় বলল,

— হ্যাঁ।

“তাহলে এবার ক্যাসেটটা শোনো।”

রেডিও বন্ধ হয়ে গেল।

অভ্র ক্যাসেটটি পুরোনো প্লেয়ারে চালাল।

প্রথমে শুধু শোঁ শোঁ শব্দ।

তারপর দু’জন মানুষের কথোপকথন।

একজন বলছে,

— তুমি যদি কাউকে বলো, তাহলে সব শেষ।

সমীরের কণ্ঠ—

— সত্য লুকিয়ে রাখা যাবে না।

তারপর ধস্তাধস্তির শব্দ।

ক্যাসেট হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল।

অভ্র সঙ্গে সঙ্গে পুলিশকে খবর দিল।

পুরোনো মামলার নথি খোলা হলো। ক্যাসেটের শব্দ পরীক্ষা করে কয়েকজন পুরোনো আত্মীয়ের পরিচয় শনাক্ত করা গেল।

বহু বছর পর সত্য প্রকাশ পেল।

সমীরকে হত্যা করা হয়েছিল। তাঁর দেহ বাড়ির কাছের একটি পরিত্যক্ত কূপে ফেলে দেওয়া হয়েছিল।

পুলিশ সেখানে অনুসন্ধান চালিয়ে মানুষের দেহাবশেষ উদ্ধার করল।

পরিবারের বহু পুরোনো রহস্যের অবসান হলো।

সেদিন রাতে অভ্র আবার সেই ঘরে গেল।

রেডিওটা টেবিলের ওপর রাখা।

সে বলল,

— সমীরকাকা?

কোনো উত্তর নেই।

অভ্র আবার বলল,

— আপনি যা চেয়েছিলেন, সত্যিটা প্রকাশ হয়েছে।

কয়েক সেকেন্ড নীরবতার পর রেডিও থেকে খুব ক্ষীণ শব্দ এল—

“ধন্যবাদ।”

তারপর রেডিওটি চিরদিনের মতো নিস্তব্ধ হয়ে গেল।

অভ্র পরদিন সেটি যত্ন করে একটি বাক্সে তুলে রাখল।

রেডিওটি আর কখনো চালু হয়নি।

তবে উত্তর জানালার পাশে দাঁড়ালে এখনও মাঝে মাঝে বৃষ্টির রাতে অভ্রর মনে হয়, কেউ যেন খুব ধীরে বলছে—

“সত্যি কথা বলতে কখনো দেরি হয় না।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *