
পুরোনো পাড়ার সরু রাস্তায় প্রতিদিন বিকেলে একটি নীল সাইকেল দেখা যেত।
সাইকেল চালাত মেয়েটি—নন্দিনী।
আর রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে তাকে দেখত অয়ন।
তাদের পরিচয় হয়েছিল একেবারে সাধারণভাবে।
একদিন নন্দিনীর সাইকেলের চেন খুলে গিয়েছিল। অয়ন কাছে গিয়ে বলেছিল,
— দাঁড়ান, ঠিক করে দিচ্ছি।
নন্দিনী অবাক হয়ে বলেছিল,
— আপনি সাইকেল সারাতে পারেন?
— না।
— তাহলে?
— চেষ্টা করতে পারি।
শেষ পর্যন্ত চেন ঠিক হয়েছিল।
সেদিন থেকেই বন্ধুত্ব।
তারপর সেই বন্ধুত্ব ধীরে ধীরে ভালোবাসায় বদলে গেল।
নন্দিনী সাইকেল চালিয়ে আসত, অয়ন রাস্তার মোড়ে অপেক্ষা করত।
কখনো তারা পাশাপাশি হাঁটত। কখনো পাড়ার ছোট মাঠে বসে গল্প করত।
তাদের ভালোবাসায় বড় কোনো প্রতিশ্রুতি ছিল না।
ছিল শুধু ছোট ছোট অভ্যাস।
নন্দিনী বলত,
— আমি যদি কোনোদিন খুব দূরে চলে যাই?
অয়ন হাসত,
— তোমার নীল সাইকেলটা তো আমাকে খুঁজে নেবে।
নন্দিনী হেসে বলত,
— পাগল!
কিন্তু একদিন সত্যিই নন্দিনী চলে গেল।
তার বাবার চাকরির বদলির কারণে পরিবারসহ অন্য শহরে যেতে হলো।
যাওয়ার দিন নন্দিনী অয়নকে একটি ছোট কাগজে ঠিকানা লিখে দিয়েছিল।
— চিঠি লিখবে?
অয়ন বলেছিল,
— প্রতিদিন।
প্রথম কয়েক মাস সত্যিই চিঠি গেল।
তারপর ধীরে ধীরে চিঠির সংখ্যা কমল।
একসময় পুরোপুরি বন্ধ।
অয়ন ভেবেছিল, নন্দিনী হয়তো তাকে ভুলে গেছে।
বছর কেটে গেল।
অয়ন পড়াশোনা শেষ করে চাকরি পেল। বিয়ে করেনি।
তার জীবনে অনেক মানুষ এসেছে, কিন্তু নন্দিনীর মতো করে কেউ জায়গা নিতে পারেনি।
একদিন পুরোনো বাড়ির জিনিসপত্র গোছাতে গিয়ে সে একটি কাঠের বাক্স পেল।
বাক্সের মধ্যে ছিল নন্দিনীর দেওয়া সেই পুরোনো কাগজ।
ঠিকানাটা এখনও অক্ষত।
অয়নের হঠাৎ মনে হলো, এত বছর পরও কি ঠিকানাটা একই আছে?
পরদিন সে সেই শহরে গেল।
পুরোনো বাড়িটি নেই।
সেখানে নতুন বহুতল ভবন।
অয়ন পাশের দোকানের এক বৃদ্ধকে নন্দিনীর নাম বলল।
বৃদ্ধ কিছুক্ষণ ভেবে বললেন,
— নন্দিনী? ওদের বাড়ি তো বহু বছর আগে বিক্রি হয়ে গেছে।
অয়নের বুকটা খালি হয়ে গেল।
— জানেন, তারা কোথায় গেছে?
বৃদ্ধ বললেন,
— ঠিক জানি না। তবে মেয়েটা নাকি স্কুলে পড়াত।
অয়ন ফিরে আসছিল।
হঠাৎ রাস্তার ওপারে চোখ পড়তেই সে থেমে গেল।
একটি নীল সাইকেল।
সাইকেলের পাশে দাঁড়িয়ে একজন নারী।
অয়নের মনে হলো, পৃথিবী যেন কয়েক সেকেন্ডের জন্য থেমে গেছে।
নারীটি ঘুরে তাকাল।
নন্দিনী।
চোখে আগের মতোই শান্ত হাসি।
দু’জন কিছুক্ষণ শুধু একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর নন্দিনী বলল,
— তুমি সত্যিই এসেছ?
অয়ন অবাক হয়ে বলল,
— তুমি জানলে কীভাবে?
নন্দিনী মৃদু হেসে বলল,
— কারণ আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করছিলাম।
অয়নের চোখে বিস্ময়।
— তাহলে এত বছর চিঠি লিখলে না কেন?
নন্দিনী মাথা নিচু করল।
— লিখেছিলাম।
— কিন্তু আমি তো পাইনি।
— বাবা চিঠিগুলো পাঠাতে দেননি।
অয়ন স্তব্ধ।
নন্দিনী বলল,
— বাবা বলেছিলেন, আমাদের সম্পর্ক টিকবে না। তাই তোমার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছিলেন।
— তুমি প্রতিবাদ করোনি?
— করেছিলাম। কিন্তু তখন আমি খুব ছোট ছিলাম।
কিছুক্ষণ দু’জনই চুপ করে রইল।
অয়ন ধীরে বলল,
— এখন?
নন্দিনী হাসল।
— এখন আমি নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নিই।
অয়ন নীল সাইকেলটার দিকে তাকিয়ে বলল,
— এটা এখনও রেখেছ?
— হ্যাঁ।
— এত বছর?
— তুমি বলেছিলে না, এটা তোমাকে খুঁজে নেবে?
অয়ন হেসে ফেলল।
বছরের জমে থাকা অভিমান যেন এক মুহূর্তে হালকা হয়ে গেল।
তারা সেদিন অনেক কথা বলল।
জীবনের কথা।
হারিয়ে যাওয়া সময়ের কথা।
ভুল বোঝাবুঝির কথা।
তবে তারা পুরোনো সম্পর্ককে হুবহু ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করল না।
কারণ দু’জনেই বুঝেছিল, পনেরো বছর আগের মানুষ তারা আর নেই।
কিন্তু ভালোবাসার কিছু অংশ সময়ের সঙ্গে বদলায় না।
বিদায়ের সময় নন্দিনী বলল,
— এবার তুমি কোথায় যাবে?
অয়ন বলল,
— জানি না।
নন্দিনী সাইকেলে উঠে বলল,
— তাহলে আমার সঙ্গে চলো।
অয়ন হেসে বলল,
— কোথায়?
— যেখানে রাস্তা শেষ হয়নি।
সেদিন তারা পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে শহরের পুরোনো রাস্তা পেরিয়ে গেল।
নীল সাইকেলটি ধীরে ধীরে এগিয়ে চলল।
অয়ন জানত না তাদের ভবিষ্যৎ কী হবে।
নন্দিনীও জানত না।
কিন্তু এবার তাদের মধ্যে কোনো অসমাপ্ত চিঠি ছিল না।
ছিল না কোনো না-বলা প্রশ্ন।
শুধু ছিল একটি সুযোগ—
হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসাকে নতুন করে চিনে নেওয়ার।
আর সেই নীল সাইকেল?
সেটি আজও নন্দিনীর কাছে আছে।
কারণ কিছু জিনিস পুরোনো হয়ে যায় না।
তারা শুধু অপেক্ষা করে—
কোনো একদিন আবার কেউ তাদের সঙ্গে পথ চলবে বলে।












Leave a Reply