শূন্য ঘরের দরজায় যে নামটি লেখা ছিল।

শহর থেকে বেশ দূরে একটি ছোট পাহাড়ি শহরে সরকারি কাজের জন্য গিয়েছিল অদিতি। থাকার জন্য সে উঠেছিল একটি পুরোনো অতিথিশালায়। বাড়িটি খুব বড় নয়—দোতলায় পাঁচটি ঘর, নিচে খাবার ঘর ও অফিস।

অদিতির ঘর ছিল ২০৪ নম্বর।

প্রথম রাতেই সে একটা অদ্ভুত বিষয় লক্ষ্য করল।

দোতলার করিডরে ২০৫ নম্বর ঘরের পাশে আরেকটি দরজা আছে। দরজায় কোনো নম্বর নেই।

শুধু সাদা রঙের ওপর কালো অক্ষরে লেখা—

“সৌম্য”

অদিতি অতিথিশালার কর্মচারীকে জিজ্ঞেস করল,

— সৌম্য কে?

লোকটি একটু থেমে বলল,

— ওই ঘরের কথা কাউকে জিজ্ঞেস করবেন না ম্যাডাম।

— কেন?

— ঘরটা খালি।

— তাহলে নাম লেখা কেন?

লোকটি কোনো উত্তর দিল না।

সেদিন রাত দুটো নাগাদ অদিতির ঘুম ভেঙে গেল।

করিডর থেকে কারও হাঁটার শব্দ আসছে।

ধীরে ধীরে…

টুপ… টুপ… টুপ…

তারপর শব্দটা থামল ২০৫-এর দরজার সামনে।

অদিতি দরজা খুলে বাইরে তাকাল।

করিডর ফাঁকা।

কিন্তু ২০৫-এর পাশের সেই নামহীন দরজার নিচ দিয়ে হালকা আলো বেরোচ্ছে।

অদিতি সাহস করে দরজার কাছে গেল।

ভেতর থেকে একজন পুরুষের গলা শোনা গেল,

— অদিতি… আপনি এসেছেন?

সে পিছিয়ে গেল।

লোকটি তার নাম জানল কীভাবে?

পরদিন সকালে অদিতি ম্যানেজারকে সব বলল।

ম্যানেজার কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,

— প্রায় দশ বছর আগে এখানে সৌম্য নামে একজন অতিথি ছিলেন। পাহাড়ে কাজ করতেন। এক রাতে নিখোঁজ হয়ে যান।

— তাঁর কী হয়েছিল?

— কেউ জানে না।

— পুলিশ?

— তদন্ত হয়েছিল। কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

অদিতি জিজ্ঞেস করল,

— তাহলে ঘরটা বন্ধ কেন?

ম্যানেজার বললেন,

— সৌম্য নিখোঁজ হওয়ার পর থেকেই।

সেদিন সন্ধ্যায় অদিতি আবার করিডরে গেল।

দরজায় হাত রাখতেই ভেতর থেকে খুব ক্ষীণ শব্দ হলো।

— আমাকে খুঁজবেন না…

অদিতি হাত সরিয়ে নিল।

কিন্তু তার কৌতূহল এবার ভয়কে হারিয়ে দিল।

সে অতিথিশালার পুরোনো রেজিস্টার দেখতে চাইল।

রেজিস্টারে সৌম্যের নাম পাওয়া গেল।

তারপর অদিতি একটি পুরোনো নোট দেখতে পেল।

সেখানে লেখা ছিল—

“সৌম্য পাহাড়ের উত্তর ঢালে একটি অবৈধ খনিজ উত্তোলনের প্রমাণ পেয়েছিল।”

অদিতির বুক ধক করে উঠল।

তাহলে সৌম্যের নিখোঁজ হওয়ার সঙ্গে ওই ঘটনার সম্পর্ক থাকতে পারে?

সে স্থানীয় এক বৃদ্ধ কর্মচারী বিমলদার সঙ্গে কথা বলল।

বিমলদা বললেন,

— সৌম্য খুব জেদি ছেলে ছিল। পাহাড় কেটে পাথর তোলার বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল। যাওয়ার আগের রাতে আমাকে বলেছিল, “কাল সব প্রমাণ নিয়ে শহরে যাব।”

— তারপর?

— আর ফেরেনি।

অদিতি বুঝল, বিষয়টি শুধু ভৌতিক রহস্য নয়।

পরদিন সে উত্তর ঢালের দিকে গেল।

পাথুরে পথ পেরিয়ে একটি পরিত্যক্ত খনির কাছে পৌঁছতেই সে মাটির নিচে একটি ধাতব বাক্স দেখতে পেল।

বাক্সের ভেতরে ছিল কিছু ছবি, নথি এবং একটি মেমোরি কার্ড।

অদিতি মেমোরি কার্ডটি নিয়ে অতিথিশালায় ফিরল।

ভিডিওতে দেখা গেল, সৌম্য গোপনে পাহাড়ের ভেতরে চলা অবৈধ কাজের ছবি তুলছে।

শেষ ভিডিওতে তার মুখ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল।

সে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে বলেছিল,

— যদি আমার কিছু হয়, এই ভিডিও যেন বাইরে যায়।

অদিতি সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসন ও পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করল।

তদন্ত শুরু হলো।

কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম সামনে এল। পুরোনো ঘটনাটিও নতুন করে তদন্ত করা হলো।

কয়েকদিন পর পাহাড়ের একটি গুহার কাছে মানুষের কিছু হাড় পাওয়া গেল।

পরীক্ষায় জানা গেল, সেগুলো সৌম্যেরই।

অদিতির বুক ভার হয়ে গেল।

যে মানুষটি সত্য প্রকাশ করতে চেয়েছিল, সে আর বেঁচে নেই।

সেই রাতে অদিতি নিজের ঘরে বসে ছিল।

হঠাৎ দরজায় টোকা।

ঠক… ঠক…

সে দরজা খুলল।

কেউ নেই।

করিডরের শেষ প্রান্তে সেই নামহীন দরজা।

দরজার ওপর লেখা “সৌম্য” নামটাও নেই।

তার জায়গায় নতুন করে লেখা—

“ধন্যবাদ।”

অদিতি কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল।

তারপর ঘরে ফিরে এল।

পরদিন সকালে অতিথিশালার ম্যানেজার বললেন,

— ম্যাডাম, একটা অদ্ভুত ব্যাপার হয়েছে।

— কী?

— যে ঘরটা দশ বছর ধরে তালাবন্ধ ছিল, তার দরজা আজ ভোরে নিজে থেকেই খুলে গেছে।

অদিতি আর কিছু বলল না।

সে শুধু করিডরের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।

কিছু রহস্যের উত্তর আদালতের নথিতে পাওয়া যায়।

কিছু উত্তর পাওয়া যায় পুরোনো স্মৃতিতে।

আর কিছু উত্তর হয়তো মানুষের চোখে কখনো ধরা পড়ে না।

কিন্তু সেদিন অদিতি বুঝেছিল—

সত্যকে যতদিনই আটকে রাখা হোক, একদিন না একদিন তার দরজা খুলবেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *