যে ছবিতে একজন মানুষ কম ছিল।

 

ঋদ্ধি পুরোনো জিনিস সংগ্রহ করতে ভালোবাসত। পুরোনো ঘড়ি, ডাকটিকিট, পিতলের বাসন, সাদা-কালো ছবি—যে জিনিসের সঙ্গে কোনো গল্প জড়িয়ে আছে, সেটাই তার কাছে মূল্যবান।

একদিন শহরের এক পুরোনো বইয়ের দোকানে সে একটি কাঠের বাক্স কিনল। দোকানদার বলেছিল, বাক্সটি বহু বছর ধরে তার গুদামে পড়েছিল।

বাড়িতে ফিরে বাক্স খুলতেই ঋদ্ধি পেল বেশ কিছু পুরোনো ছবি।

একটি ছবিতে তার চোখ আটকে গেল।

ছবিতে একটি পরিবারের পাঁচজন সদস্য দাঁড়িয়ে আছে। বাবা, মা, দুই মেয়ে এবং এক কিশোর ছেলে।

কিন্তু ছবির পেছনে লেখা—

“আমরা ছয়জন—১৯৮৭”

ঋদ্ধি অবাক হলো।

ছবিতে তো পাঁচজন!

সে ছবিটা আলোয় ধরে ভালো করে দেখল। ডানদিকে দাঁড়ানো মেয়েটির পাশে যেন আরেকজনের জন্য জায়গা ছিল। কিন্তু সেখানে শুধু ফাঁকা দেওয়াল।

ছবির পেছনে আরও লেখা ছিল—

“ওকে বাদ দিয়ে ছবি তুলেছিলাম। পরে বুঝেছিলাম, ও-ই ছিল ছবির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ।”

ঋদ্ধির কৌতূহল বাড়ল।

পরদিন সে ছবিটি নিয়ে সেই পুরোনো বইয়ের দোকানে গেল।

দোকানদার ছবিটা দেখে দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইলেন।

— এই ছবিটা কোথায় পেলেন?

— আপনার দোকানের বাক্সে।

— বাক্সটা আপনি কত টাকায় কিনেছেন?

ঋদ্ধি অবাক হয়ে বলল,

— কেন?

দোকানদার উত্তর দিলেন,

— কারণ এই ছবির পরিবারটাকে আমি চিনি।

তিনি জানালেন, ছবির পরিবারটি একসময় ওই এলাকারই বাসিন্দা ছিল। তাদের এক ছেলে ছিল—নাম অরুণ। কিন্তু অরুণ ছোটবেলায় নিখোঁজ হয়ে যায়।

ঋদ্ধি বলল,

— তাহলে ছবির পেছনে ছয়জন কেন লেখা?

দোকানদার বললেন,

— পরিবারের লোকেরা বিশ্বাস করত, অরুণ মারা যায়নি। সে কোথাও আছে।

ঋদ্ধি বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করল।

পুরোনো খবরের কাগজ ঘেঁটে সে অরুণের নিখোঁজ হওয়ার খবর পেল। বয়স ছিল তেরো বছর।

কিন্তু খবরের নিচে একটি অদ্ভুত তথ্য ছিল।

অরুণ নিখোঁজ হওয়ার তিন মাস পর কাছের একটি অনাথ আশ্রমে এক কিশোরকে পাওয়া যায়। সে নিজের নাম বলতে পারত না। শুধু একটি শব্দ বারবার বলত—

“অরু…”

কয়েক বছর পর সেই আশ্রমের নথি হারিয়ে যায়।

ঋদ্ধি আশ্রমটির বর্তমান ঠিকানা খুঁজে বের করল।

সেখানে পুরোনো রেজিস্টার ঘাঁটতে গিয়ে একটি নাম পেল—

অরুণ দে।

কিন্তু তার পাশে লেখা ছিল—“পরবর্তীতে দত্তক।”

ঋদ্ধি আরও অনুসন্ধান করে জানতে পারল, অরুণকে দত্তক নিয়েছিলেন এক দূর শহরের দম্পতি।

অরুণ বড় হয়ে অন্য নামে জীবন কাটিয়েছে।

কিন্তু গল্পের সবচেয়ে আশ্চর্য অংশ তখনও বাকি।

ঋদ্ধি সেই শহরে গিয়ে অনেক খোঁজাখুঁজির পর এক বৃদ্ধের সন্ধান পেল।

নাম—অরিন্দম সেন।

বৃদ্ধ দরজা খুলতেই ঋদ্ধি ছবিটা তাঁর সামনে ধরল।

বৃদ্ধ ছবির দিকে তাকিয়ে হঠাৎ কেঁপে উঠলেন।

— এটা কোথায় পেলে?

ঋদ্ধি বলল,

— আপনার ছোটবেলার ছবি বলে মনে হচ্ছে।

বৃদ্ধ চুপ করে গেলেন।

তারপর ধীরে ধীরে বললেন,

— আমি অরুণ।

ঋদ্ধির শরীরে যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল।

অরুণ জানালেন, ছোটবেলায় এক দুর্ঘটনার পর তিনি স্মৃতির অনেকটা অংশ হারিয়েছিলেন। নিজের বাড়ির ঠিকানা মনে করতে পারতেন না। অনাথ আশ্রমে যাওয়ার পরও তিনি নিজের পরিচয় স্পষ্টভাবে বলতে পারেননি।

পরে এক দম্পতি তাঁকে দত্তক নেন।

বছর কেটে যায়।

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর স্মৃতির কিছু অংশ ফিরতে শুরু করে। কিন্তু তখন তিনি জানতে পারেন, তাঁর আসল বাবা-মা আর বেঁচে নেই।

— আপনি কি কখনো তাঁদের খুঁজেছিলেন? ঋদ্ধি জিজ্ঞেস করল।

অরুণ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

— হ্যাঁ। কিন্তু পুরো ঠিকানা কখনো মনে পড়েনি।

ঋদ্ধি তখন ছবিটা তাঁর হাতে দিয়ে বলল,

— আপনার পরিবার ছবির পেছনে লিখেছিল, “আমরা ছয়জন।”

অরুণ ছবির দিকে তাকিয়ে চোখ মুছলেন।

— তারা আমাকে ভুলে যায়নি।

ঋদ্ধি মাথা নাড়ল।

— না। বরং পুরো ছবিটাই আপনাকে খুঁজছিল।

অরুণ অনেকক্ষণ ছবিটা বুকে ধরে রাখলেন।

তারপর মৃদু হেসে বললেন,

— জানো, এত বছর আমি ভাবতাম, আমার পরিবার আমাকে হারিয়ে ফেলেছিল।

ঋদ্ধি বলল,

— হয়তো পরিবার আপনাকে হারায়নি। শুধু সময় আপনাদের আলাদা করে দিয়েছিল।

অরুণ জানালার বাইরে তাকালেন।

বাইরে তখন বিকেলের আলো।

তিনি ধীরে বললেন,

— মানুষ হারিয়ে গেলে তার স্মৃতিও কি হারিয়ে যায়?

ঋদ্ধি উত্তর দিল,

— সবসময় নয়। কখনো একটা পুরোনো ছবি, একটা নাম, কিংবা একটা বাক্য মানুষকে আবার তার নিজের কাছে ফিরিয়ে দেয়।

বিদায় নেওয়ার সময় অরুণ ছবিটা ঋদ্ধিকে ফেরত দিতে চাইলেন।

ঋদ্ধি বলল,

— এটা আপনার।

অরুণ মাথা নাড়লেন।

— না। এত বছর এটা তোমার কাছে ছিল। তুমি আমাকে ফিরিয়ে দিয়েছ। এবার এটা তোমার কাছেই থাকুক।

ঋদ্ধি অবাক হয়ে ছবিটা নিল।

বাড়ি ফিরে সে ছবিটা আবার আলোয় ধরল।

এবার তার চোখে যেন অদ্ভুত কিছু ধরা পড়ল।

ছবির ফাঁকা জায়গাটায় আলো পড়েছে।

মনে হচ্ছে, সেখানে সত্যিই একজন দাঁড়িয়ে আছে।

অস্পষ্ট।

কিন্তু মুখে হাসি।

ঋদ্ধি জানত, সেটা হয়তো আলোর খেলা।

তবু সে ছবিটা যত্ন করে রেখে দিল।

কারণ সে বুঝেছিল—

কিছু মানুষ ছবিতে না থাকলেও, একটি পরিবারের গল্পে তাদের জায়গা কখনো ফাঁকা থাকে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *