গ্রামের নাম ছিল চাঁদপুর।
নামটা শুনলেই মনে হতে পারে, গ্রামের আকাশে বুঝি সবসময় চাঁদ ঝুলে থাকে। আসলে গ্রামের নামের সঙ্গে চাঁদের কোনো সম্পর্ক ছিল না। বহু বছর আগে গ্রামের মাঝখানে একটি বড় পুকুর ছিল। পূর্ণিমার রাতে সেই পুকুরে চাঁদের প্রতিবিম্ব এত সুন্দর দেখাত যে গ্রামের মানুষ পুকুরটির নাম দিয়েছিল “চাঁদের পুকুর”। সেখান থেকেই গ্রামের নাম—চাঁদপুর।
এই গ্রামেই থাকত ঈশিতা।
বয়স সতেরো।
মাধ্যমিকের পর সে বিজ্ঞান নিয়ে পড়ছিল। কিন্তু তার সবচেয়ে প্রিয় বিষয় ছিল বইয়ের বিজ্ঞান নয়—আকাশের বিজ্ঞান।
রাত হলেই সে বাড়ির ছাদে উঠে যেত।
তার হাতে থাকত একটা পুরোনো খাতা।
খাতার পাতায় সে লিখত—
“আজ উত্তর-পশ্চিম আকাশে খুব উজ্জ্বল একটা তারা দেখা গেল।”
“আজ চাঁদের অর্ধেকটা দেখা যাচ্ছে।”
“আজ আকাশে মেঘ বেশি।”
কখনও কখনও সে আকাশের ছবি আঁকত।
তার মা বলতেন,
—“এত রাতে ছাদে বসে কী করিস?”
ঈশিতা বলত,
—“আকাশ দেখি।”
মা হাসতেন।
—“আকাশ দেখে আবার কী হবে?”
ঈশিতা উত্তর দিত,
—“জানি না। কিন্তু আকাশ না দেখলে মনে হয় কিছু একটা বাদ পড়ে যাচ্ছে।”
ঈশিতার বাবা ছিলেন ছোট ব্যবসায়ী।
সংসারে খুব বেশি টাকা ছিল না।
একদিন ঈশিতা বাবাকে বলল,
—“বাবা, আমি একটা টেলিস্কোপ চাই।”
বাবা হেসে বললেন,
—“কত টাকা?”
ঈশিতা একটা কাগজে দাম লিখে দিল।
বাবা কাগজটা দেখে চুপ করে গেলেন।
তারপর বললেন,
—“এখন সম্ভব নয় মা।”
ঈশিতা মাথা নাড়ল।
—“ঠিক আছে।”
সে আর কিছু বলল না।
কিন্তু স্বপ্নটা ছাড়ল না।
একদিন স্কুলে বিজ্ঞান প্রদর্শনী ছিল।
ঈশিতা সেখানে একটি ছোট মডেল বানাল—সৌরজগত।
কার্ডবোর্ডের গোল বল, সুতো আর রঙ দিয়ে সে সূর্য, পৃথিবী, মঙ্গল, বৃহস্পতি বানিয়েছিল।
বিচারক এসে জিজ্ঞেস করলেন,
—“তোমার সবচেয়ে পছন্দের গ্রহ কোনটা?”
ঈশিতা বলল,
—“পৃথিবী।”
—“কেন?”
সে বলল,
—“কারণ আমরা এখানে থাকি। দূরের গ্রহ নিয়ে সবাই জানতে চায়, কিন্তু নিজের গ্রহটাকে ভালোভাবে চিনতে ভুলে যায়।”
শিক্ষক অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
সেই অনুষ্ঠানে স্কুলের এক বিজ্ঞান শিক্ষক ঈশিতাকে একটি পুরোনো বই দিলেন।
বইটির নাম—“রাতের আকাশ চিনে নাও”।
তিনি বললেন,
—“টেলিস্কোপ না থাকলেও আকাশকে চেনা যায়।”
ঈশিতা বইটি বুকে জড়িয়ে ধরল।
সেই দিন থেকে তার পড়াশোনার সঙ্গে নতুন একটা কাজ শুরু হল।
সে গ্রামের আকাশকে চিনতে লাগল।
কোন তারা কখন ওঠে।
কোন নক্ষত্রমণ্ডল কোন দিকে।
চাঁদের কলা কীভাবে বদলায়।
কেন কিছু তারা ঝিকমিক করে।
কেন কিছু গ্রহকে তারা বলে মনে হলেও তারা নয়।
তার খাতা ধীরে ধীরে ভরে উঠল।
এক রাতে ঈশিতা দেখল, গ্রামের কয়েকজন ছোট ছেলে-মেয়ে মাঠে বসে আকাশ দেখছে।
সে তাদের কাছে গেল।
একটি ছেলে জিজ্ঞেস করল,
—“দিদি, ওই যে আলোটা, ওটা কী?”
ঈশিতা আকাশের দিকে তাকাল।
—“ওটা একটা তারা।”
—“ওখানে কি মানুষ থাকে?”
ঈশিতা হেসে বলল,
—“ওটা এত দূরে যে, সেখানে মানুষ আছে কি না আমরা জানি না। তবে জানার চেষ্টা করতে পারি।”
ছেলেটি বলল,
—“আমরাও জানতে পারব?”
—“অবশ্যই।”
সেই কথাটাই ঈশিতার মাথায় নতুন চিন্তা আনল।
শুধু সে একা আকাশ দেখবে কেন?
পরের রবিবার সে গ্রামের কয়েকটি শিশুকে নিয়ে একটি ছোট দল তৈরি করল।
নাম দিল—
“তারাদল”।
কোনও সদস্য ফি নেই।
কোনও বড় ঘর নেই।
কোনও দামি যন্ত্র নেই।
শুধু খোলা আকাশ আর কৌতূহল।
প্রতি সপ্তাহে তারা মাঠে বসত।
ঈশিতা তাদের নক্ষত্র চিনতে শেখাত।
কেউ খাতায় আঁকত।
কেউ প্রশ্ন করত।
কেউ শুধু চুপ করে আকাশ দেখত।
কিন্তু গ্রামের সবাই বিষয়টি ভালোভাবে নিল না।
একজন বললেন,
—“রাতে মাঠে বসে আকাশ দেখলে কী হবে?”
আরেকজন বললেন,
—“এসব পড়াশোনার কাজে লাগে?”
ঈশিতা কিছু বলল না।
তার শিক্ষক বলেছিলেন,
কোনও স্বপ্নকে বোঝাতে গেলে আগে তাকে একটু বড় হতে দিতে হয়।
একদিন স্কুলের বিজ্ঞান শিক্ষক ঈশিতাকে বললেন,
—“তুমি যদি সত্যিই টেলিস্কোপ চাও, তাহলে নিজের হাতে একটা বানানোর চেষ্টা করো।”
ঈশিতা অবাক।
—“নিজে?”
—“হ্যাঁ। সবকিছু কিনে নিতে হয় না।”
শিক্ষক তাকে কয়েকটি পুরোনো লেন্স, কিছু কার্ডবোর্ডের নল এবং একটি পুরোনো ট্রাইপড দিলেন।
ঈশিতা শুরু করল।
প্রথম দিন কিছুই হল না।
দ্বিতীয় দিনও না।
তৃতীয় দিনে লেন্স বসাতে গিয়ে সব খুলে পড়ল।
ছোট ভাই হাসতে হাসতে বলল,
—“দিদির টেলিস্কোপ ভেঙে গেল!”
ঈশিতা রাগ করল না।
বলল,
—“ভাঙলে আবার বানাব।”
দুই মাস ধরে চেষ্টা চলল।
অবশেষে এক রাতে ঈশিতা টেলিস্কোপটি আকাশের দিকে তাক করল।
সে প্রথমে চাঁদের দিকে তাকাল।
চাঁদের গায়ে ছোট ছোট গর্ত দেখা গেল।
ঈশিতা কিছুক্ষণ কথা বলতে পারল না।
তারপর ছুটে বাবাকে ডাকল।
—“বাবা! দেখো!”
বাবা এসে চোখ রাখলেন।
কিছুক্ষণ পর বললেন,
—“ওগুলো সত্যি দেখা যাচ্ছে?”
ঈশিতা হেসে বলল,
—“হ্যাঁ।”
বাবা মেয়ের মাথায় হাত রাখলেন।
—“তুই তো সত্যিই আকাশটা ধরে ফেলেছিস।”
পরের সপ্তাহে তারাদলের সবাই সেই টেলিস্কোপে চাঁদ দেখল।
একটি ছোট মেয়ে চোখ সরিয়ে বলল,
—“দিদি, চাঁদটা এত কাছে!”
ঈশিতা বলল,
—“আসলে কাছে নয়। আমরা শুধু একটু ভালো করে দেখতে পেরেছি।”
খবর ছড়িয়ে পড়ল।
পাশের গ্রামের শিশুরাও আসতে শুরু করল।
ঈশিতা সবাইকে একটা নিয়ম শেখাল—
প্রশ্ন করতে লজ্জা নেই।
একদিন এক ছেলে জিজ্ঞেস করল,
—“আকাশের শেষ কোথায়?”
ঈশিতা বলল,
—“আমরা এখনও জানি না।”
ছেলেটি বলল,
—“তাহলে একদিন আমি খুঁজে দেখব।”
ঈশিতা হেসে বলল,
—“এই জন্যই তো আমরা আকাশ দেখি।”
কয়েক বছর পর ঈশিতা শহরে পড়তে গেল।
গ্রাম ছাড়ার আগে সে তার টেলিস্কোপটি তারাদলের হাতে তুলে দিল।
সবচেয়ে ছোট ছেলেটিকে বলল,
—“এটা যত্ন করে রেখো।”
ছেলেটি জিজ্ঞেস করল,
—“তুমি আর আসবে না?”
ঈশিতা বলল,
—“আসব। আর না এলেও তোমরা আকাশ দেখা বন্ধ করবে না।”
ছেলেটি মাথা নাড়ল।
শহরে পড়াশোনা করার সময় ঈশিতা অনেক দূরে চলে গেলেও চাঁদপুরের তারাদল চলতে থাকল।
প্রতি শনিবার রাতে গ্রামের মাঠে শিশুরা জড়ো হত।
কেউ চাঁদ দেখত।
কেউ তারা গুনত।
কেউ নতুন প্রশ্ন লিখে রাখত।
আর মাঠের একপাশে রাখা থাকত সেই পুরোনো হাতে বানানো টেলিস্কোপ।
বহু বছর পর ঈশিতা আবার গ্রামে ফিরল।
এবার সে একজন গবেষক।
গ্রামের শিশুরা তাকে ঘিরে ধরল।
একটি ছেলে বলল,
—“দিদি, আমরা এবার একটা নতুন তারা সম্পর্কে পড়েছি।”
ঈশিতা অবাক হয়ে বলল,
—“সত্যি?”
ছেলেটি খাতা খুলে বলল,
—“হ্যাঁ। আমরা নিজেরা হিসাব করেছি।”
ঈশিতার চোখে জল এসে গেল।
সে আকাশের দিকে তাকাল।
একসময় যে মেয়েটি একা ছাদে বসে আকাশ দেখত, আজ তার স্বপ্ন অনেকগুলো শিশুর চোখে জ্বলছে।
তার পাশে দাঁড়ানো বাবা বললেন,
—“তুই তো শুধু তারা দেখতে শিখিসনি। অন্যদেরও দেখতে শিখিয়েছিস।”
ঈশিতা মৃদু হেসে বলল,
—“বাবা, আকাশ তো সবার।”
সেদিন রাতে চাঁদের আলোয় গ্রামের মাঠে আবার তারাদল বসেছিল।
একটি শিশু টেলিস্কোপে চোখ রাখল।
তারপর বিস্ময়ে বলল,
—“দিদি! আমি দেখেছি!”
ঈশিতা জিজ্ঞেস করল,
—“কী দেখেছ?”
ছেলেটি বলল,
—“আমাদের পৃথিবীর বাইরে একটা বিশাল জগৎ।”
ঈশিতা বলল,
—“মনে রেখো, পৃথিবী ছোট হতে পারে। কিন্তু মানুষের কৌতূহল কখনও ছোট নয়।”
আকাশ তখন অসংখ্য তারায় ভরা।
আর চাঁদপুরের সেই ছোট্ট গ্রামের শিশুরা প্রথমবার বুঝতে শিখেছিল—
স্বপ্নের কোনো ঠিকানা নেই। কখনও কখনও তার ঠিকানা থাকে আকাশে।













Leave a Reply