গ্রামের নাম নবগ্রাম।
গ্রামের মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে একটি সরু নদী। বর্ষায় নদী ফুলে-ফেঁপে ওঠে, আর শীতকালে তার বুকের অনেকটা অংশ জেগে থাকে।
নদীর ওপর ছিল একটি পুরোনো কাঠের সেতু।
সেতুটি এতটাই পুরোনো যে, হাঁটতে গেলে কাঠের পাটাতন থেকে কড়কড় শব্দ উঠত।
গ্রামের মানুষ অবশ্য অভ্যস্ত।
কারও বাজারে যেতে হলে সেতু পার হতে হয়।
স্কুলে যেতে হলে সেতু পার হতে হয়।
হাসপাতালে যেতে হলেও সেতু পার হতে হয়।
আর সেতুর ওপারেই ছিল নবগ্রামের প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র।
এই সেতুটির সঙ্গে জড়িয়ে ছিল গ্রামের মানুষের অসংখ্য গল্প।
কিন্তু একদিন সেতুটি বিপজ্জনক হয়ে উঠল।
সেই গ্রামেরই ছেলে নীলয়।
বয়স চব্বিশ।
কলেজে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়েছিল। পড়াশোনা শেষ করে শহরে চাকরি করার সুযোগও পেয়েছিল।
কিন্তু বাবার অসুস্থতার কারণে তাকে গ্রামে ফিরে আসতে হয়।
একদিন সকালে বাজারে যাওয়ার সময় সে দেখল, সেতুর একটি কাঠের পাটাতন ভেঙে গেছে।
নীলয় নিচে তাকিয়ে দেখল নদীর জল।
তারপর চারপাশে তাকাল।
একজন বৃদ্ধা খুব সাবধানে সেতু পার হচ্ছেন।
একটি স্কুলছেলে ভয়ে পা বাড়াচ্ছে।
নীলয় দৌড়ে গিয়ে ছেলেটির হাত ধরল।
—“ধীরে।”
ছেলেটি বলল,
—“দাদা, সেতুটা কি ভেঙে যাবে?”
নীলয় উত্তর দিল না।
সে শুধু বলল,
—“তুমি আমার সঙ্গে এসো।”
সেদিনই নীলয় পঞ্চায়েত অফিসে গেল।
বলল,
—“সেতুটার অবস্থা খুব খারাপ।”
কর্তব্যরত কর্মী বললেন,
—“জানি।”
—“তাহলে মেরামত হচ্ছে না কেন?”
—“প্রক্রিয়া আছে।”
—“কতদিন লাগবে?”
—“বলতে পারব না।”
নীলয় ফিরে এল।
বাড়িতে বসে সে সেতুটার ছবি দেখল।
তার মাথায় একটা চিন্তা এল।
যদি বড় সেতু বানানো এখনই সম্ভব না হয়, তাহলে অন্তত সাময়িকভাবে নিরাপদ একটা পথ তৈরি করা যায়।
পরদিন সে গ্রামের কয়েকজন যুবককে ডাকল।
বলল,
—“আমরা নদীর ওপর একটা অস্থায়ী পথ তৈরি করতে পারি।”
একজন বলল,
—“সরকারের কাজ আমরা করব?”
নীলয় বলল,
—“সরকারি কাজ নয়। মানুষের নিরাপত্তার জন্য যা এখনই করা দরকার, সেটা করব।”
কেউ রাজি হল।
কেউ হাসল।
কেউ বলল,
—“এতে কী হবে?”
নীলয় বলল,
—“একটা দুর্ঘটনা ঠেকলেও হবে।”
কাজ শুরু হল।
পুরোনো কাঠ সরানো হল।
নতুন শক্ত কাঠ আনা হল।
লোহার রেলিং বসানো হল।
বাঁশ দিয়ে পাশের অংশ সুরক্ষিত করা হল।
নীলয় নিজে প্রতিটি অংশ পরীক্ষা করল।
গ্রামের মানুষও সাহায্য করল।
কেউ শ্রম দিল।
কেউ কাঠ দিল।
কেউ দড়ি দিল।
তিন দিনের মধ্যে সেতুর বিপজ্জনক অংশটা অনেকটা নিরাপদ হয়ে গেল।
কিন্তু নীলয় জানত, এটা স্থায়ী সমাধান নয়।
সে সেতুর একটি নকশা তৈরি করল।
পুরোনো কাঠের বদলে কংক্রিটের ছোট সেতু।
খরচের আনুমানিক হিসাব করল।
তারপর গ্রামের মানুষের স্বাক্ষর সংগ্রহ করল।
পঞ্চায়েত, ব্লক অফিস, জেলা প্রশাসন—সব জায়গায় আবেদন পাঠাল।
অনেকে বলল,
—“এতে কিছু হবে না।”
নীলয় বলল,
—“হবে কি না জানি না। কিন্তু চেষ্টা না করলে কিছুই হবে না।”
মাস কেটে গেল।
কোনও উত্তর এল না।
এর মধ্যে এক বর্ষার রাতে নদীর জল হঠাৎ বেড়ে গেল।
সেতুর নিচের কাঠের অংশ ভেসে যাওয়ার উপক্রম হল।
নীলয় খবর পেয়ে রাতেই ছুটে গেল।
দেখল, সেতুর মাঝখানে আবার ফাটল।
সে গ্রামের মানুষকে নিয়ে রাস্তা বন্ধ করে দিল।
পরদিন কেউ সেতু ব্যবহার করতে পারল না।
মানুষ সমস্যায় পড়ল।
স্কুলের শিশুরা যেতে পারল না।
হাসপাতালে যাওয়ার পথও দীর্ঘ হয়ে গেল।
গ্রামের লোকজন এবার বুঝল, নীলয় এতদিন যা বলছিল, সেটা সত্যি।
এক সপ্তাহ পর প্রশাসনের একটি দল এল।
তারা সেতু পরিদর্শন করল।
নীলয় তার নকশা দেখাল।
একজন ইঞ্জিনিয়ার অবাক হয়ে বললেন,
—“এটা তুমি তৈরি করেছ?”
—“হ্যাঁ।”
—“তুমি ইঞ্জিনিয়ার?”
—“হ্যাঁ।”
অফিসার কিছুক্ষণ নকশা দেখলেন।
তারপর বললেন,
—“তোমার প্রস্তাবটা খারাপ নয়।”
নীলয় বলল,
—“আমি শুধু চাই, কাজটা দ্রুত শুরু হোক।”
কাজ শুরু হতে আরও কয়েক মাস সময় লাগল।
এর মধ্যে গ্রামবাসী অস্থায়ী পথ ব্যবহার করল।
নীলয় প্রতি সপ্তাহে সেতু পরীক্ষা করত।
কেউ তাকে বলেছিল,
—“তুই চাকরি করতে শহরে চলে গেলে তো ভালো থাকতে পারতিস।”
নীলয় হাসত।
—“ভালো থাকা শুধু নিজের জন্য হয় নাকি?”
অবশেষে এক সকালে নদীর ধারে বড় বড় ট্রাক এল।
সিমেন্ট।
লোহার রড।
বালি।
ইট।
নতুন সেতুর কাজ শুরু হল।
গ্রামের মানুষ রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে দেখল।
কারও চোখে আনন্দ।
কারও মুখে অবিশ্বাস।
এক বৃদ্ধ বললেন,
—“আমরা তো ভাবিনি জীবনে এই সেতু দেখব।”
নীলয় বলল,
—“আপনাদের জন্যই হয়েছে।”
বৃদ্ধ মাথা নাড়লেন।
—“না বাবা। তুই প্রথমে বিশ্বাস করেছিলি বলেই হয়েছে।”
এক বছর পর নতুন সেতু তৈরি হল।
সেতুটি খুব বড় নয়।
কিন্তু শক্ত।
নিরাপদ।
দুই পাশে রেলিং।
রাতে আলো।
উদ্বোধনের দিন গ্রামের স্কুলের শিশুরা সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।
প্রথমে সেতু পার হলেন গ্রামের প্রবীণতম মানুষটি।
তারপর স্কুলের বাচ্চারা।
নীলয় একটু দূরে দাঁড়িয়ে দেখছিল।
তার পাশে বাবা।
বাবা বললেন,
—“তুই শহরে থাকলে হয়তো বড় বাড়ি বানাতিস।”
নীলয় হাসল।
—“সেতুও তো একটা বাড়ির মতো।”
বাবা অবাক।
—“কীভাবে?”
নীলয় বলল,
—“বাড়ি মানুষকে আশ্রয় দেয়। সেতু মানুষকে পথ দেয়।”
সন্ধ্যায় সবাই চলে যাওয়ার পর নীলয় একা সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে ছিল।
নদীর জলে অস্ত যাওয়া সূর্যের আলো পড়েছে।
হঠাৎ তার মনে হল, এই সেতু শুধু দুই পাড়কে যুক্ত করেনি।
এটা যুক্ত করেছে—
স্কুল আর বাড়িকে।
হাসপাতাল আর রোগীকে।
বাজার আর কৃষককে।
এক পরিবারকে আরেক পরিবারের সঙ্গে।
এক প্রজন্মকে আরেক প্রজন্মের সঙ্গে।
দূর থেকে সেই স্কুলছেলেটি দৌড়ে এল, যে একদিন ভাঙা সেতু দেখে ভয় পেয়েছিল।
সে বলল,
—“দাদা!”
নীলয় ঘুরে দাঁড়াল।
—“কী?”
ছেলেটি বলল,
—“এখন আর ভয় লাগে না।”
নীলয় তার মাথায় হাত রাখল।
—“ভয় লাগলে কী করবে?”
ছেলেটি একটু ভেবে বলল,
—“সেতু পার হব।”
নীলয় হেসে ফেলল।
ছেলেটি দৌড়ে চলে গেল।
নদীর ওপর তখন সন্ধ্যার বাতাস বইছে।
নীলয় সেতুর রেলিংয়ে হাত রেখে ভাবল—
জীবনে অনেক সময় আমরা ভাবি, ওপারে যেতে হলে বড় কোনো অলৌকিক ঘটনা দরকার। অথচ কখনও কখনও দরকার শুধু একজন মানুষ, যে প্রথম কাঠের টুকরোটা হাতে তুলে নিয়ে বলে—‘চলো, পথটা বানাই।’
নতুন সেতুর ওপর দিয়ে তখন একের পর এক মানুষ বাড়ি ফিরছে।
আর নদী চুপচাপ বয়ে চলেছে।
দুই পাড়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে নতুন সেতুটি যেন বলছে—
পথ কখনও নিজে থেকে তৈরি হয় না। কেউ না কেউ একদিন প্রথম পা বাড়ায়।













Leave a Reply