ঘড়ির কাঁটার বাইরে।

ছোট্ট শহর বেলতলা।

শহরের বাজারের একেবারে শেষ মাথায় ছিল একটি ছোট দোকান।

দোকানের নাম—

“সময়ের সাথী”

দোকানের মালিক নির্মলবাবু।

বয়স প্রায় সত্তর।

গত পঞ্চাশ বছর ধরে তিনি ঘড়ি সারাই করেন।

দোকানের চারদিকে দেয়ালে ঝুলত নানা ধরনের ঘড়ি।

কেউ গোল, কেউ চৌকো।

কোনওটার কাঁটা থেমে আছে বারোটায়, কোনওটা পাঁচটায়, কোনওটা আবার ছয়টা বাজতেই আটকে গেছে।

দোকানে ঢুকলেই শোনা যেত—

টিক… টিক… টিক…

মনে হত, দোকানের ভেতর যেন সময়ের নিজস্ব একটা শব্দ আছে।


একদিন দুপুরে দোকানে এল একটি ছেলে।

নাম সায়ন।

বয়স ষোলো।

হাতে একটি পুরোনো পকেট ঘড়ি।

সে ঘড়িটা কাউন্টারের ওপর রেখে বলল,

—“কাকু, এটা সারিয়ে দেবেন?”

নির্মলবাবু চশমা পরে ঘড়িটা হাতে নিলেন।

কিছুক্ষণ পরীক্ষা করে বললেন,

—“পুরোনো ঘড়ি। কোথায় পেয়েছিস?”

—“বাবার।”

—“তোর বাবা কী করেন?”

সায়ন একটু চুপ করে বলল,

—“করতেন।”

নির্মলবাবু আর কিছু জিজ্ঞেস করলেন না।

ঘড়িটা খুলতে খুলতে বললেন,

—“কাল আসিস।”

সায়ন চলে গেল।


পরদিন সায়ন আবার এল।

নির্মলবাবু ঘড়িটা হাতে দিয়ে বললেন,

—“চলছে।”

সায়ন ঘড়িটা কানে নিয়ে শুনল।

টিক… টিক… টিক…

তার মুখে হাসি ফুটে উঠল।

—“কত টাকা?”

নির্মলবাবু বললেন,

—“কিছু না।”

সায়ন অবাক।

—“কেন?”

—“কারণ এটা শুধু ঘড়ি নয়। কারও স্মৃতি।”

সায়ন ঘড়িটা মুঠোয় ধরে বলল,

—“বাবা এটা আমাকে দিয়েছিলেন।”

নির্মলবাবু এবার বুঝলেন, ছেলেটির গলায় কেন এত ভার।


সায়নের বাবা ছিলেন রেলকর্মী।

তিন বছর আগে একটি দুর্ঘটনায় মারা যান।

বাবার মৃত্যুর পর সংসারের অবস্থা খারাপ হয়ে যায়।

মা সেলাই করে সংসার চালাতেন।

সায়ন পড়াশোনায় ভালো হলেও মাঝে মাঝে স্কুল কামাই করত।

নির্মলবাবু একদিন তাকে দোকানের সামনে বসে থাকতে দেখে বললেন,

—“স্কুলে যাচ্ছিস না?”

সায়ন বলল,

—“সবদিন পারি না।”

—“কেন?”

—“মাকে কাজে সাহায্য করতে হয়।”

নির্মলবাবু কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।

তারপর বললেন,

—“আমার দোকানে বিকেলে আসবি?”

—“কেন?”

—“ঘড়ি সারাই শিখবি।”

সায়ন অবাক হয়ে গেল।

—“আমি পারব?”

—“ঘড়ির ভেতরটা বুঝতে পারলে নিজের ভেতরটাও একটু বুঝতে শিখবি।”

সায়ন হেসে ফেলল।


সেদিন থেকেই তার নতুন জীবন শুরু হল।

স্কুল শেষে সে নির্মলবাবুর দোকানে আসত।

প্রথমে শুধু দেখত।

ছোট স্ক্রু খুলতে শিখল।

পিন বসাতে শিখল।

স্প্রিং বদলাতে শিখল।

কোনও ঘড়ি কেন পিছিয়ে যায়, কেন এগিয়ে যায়, কেন হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়—এসব জানতে শুরু করল।

নির্মলবাবু বলতেন,

—“ঘড়ি যত পুরোনো হয়, তত সাবধানে ধরতে হয়।”

সায়ন জিজ্ঞেস করত,

—“মানুষের ক্ষেত্রেও?”

নির্মলবাবু হাসতেন।

—“মানুষের ক্ষেত্রে আরও বেশি।”


একদিন সায়ন একটি ঘড়ি খুলতে গিয়ে ভুল করল।

একটি ক্ষুদ্র চাকা মেঝেতে পড়ে গেল।

সে ভয় পেয়ে গেল।

—“কাকু, নষ্ট হয়ে গেল!”

নির্মলবাবু বললেন,

—“কিছু নষ্ট হয়নি। খুঁজে বের কর।”

দুজন মিলে মেঝেতে খুঁজতে লাগলেন।

অনেকক্ষণ পর সায়ন চাকার টুকরোটি পেল।

নির্মলবাবু বললেন,

—“দেখলি?”

—“কী?”

—“ছোট জিনিস হারালে পুরো ঘড়ি থেমে যায়।”

সায়ন চুপ করে রইল।

সেদিন বাড়ি ফেরার পথে সে কথাটা বারবার ভাবল।

তার নিজের জীবনেও তো একটা ছোট্ট জিনিস হারিয়ে গিয়েছিল—

তার বাবা।

তারপর যেন সবকিছু থেমে গিয়েছিল।


সময়ের সঙ্গে সায়নের পরিবর্তন হতে লাগল।

সে স্কুলে নিয়মিত যেতে শুরু করল।

পরীক্ষায় ভালো ফল করল।

অবসরে নির্মলবাবুর দোকানে কাজ করত।

একদিন সে বলল,

—“কাকু, আমি ইঞ্জিনিয়ার হতে চাই।”

নির্মলবাবু বললেন,

—“হবি।”

—“কিন্তু টাকা?”

—“টাকার কথা পরে ভাবিস। আগে জ্ঞানটা অর্জন কর।”

সায়ন পড়তে লাগল।

বছর কেটে গেল।


সায়ন উচ্চমাধ্যমিকে ভালো ফল করল।

ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি হল।

শহরে চলে গেল।

দোকানটা আগের মতোই রইল।

শুধু বিকেলের সেই ছেলেটি আর এল না।

নির্মলবাবু মাঝে মাঝে দোকানের দরজার দিকে তাকিয়ে থাকতেন।

কেউ পুরোনো ঘড়ি নিয়ে এলে তিনি ভাবতেন,

“সায়ন থাকলে এখন এটা কত তাড়াতাড়ি সারিয়ে ফেলত!”


পাঁচ বছর পর এক বর্ষার দুপুরে দোকানের সামনে একটি গাড়ি এসে থামল।

একজন যুবক নেমে এল।

হাতে ব্যাগ।

চোখে চশমা।

দোকানে ঢুকে বলল,

—“কাকু।”

নির্মলবাবু তাকিয়ে রইলেন।

কয়েক সেকেন্ড পর চিনতে পারলেন।

—“সায়ন!”

দুজনের মুখে হাসি ফুটে উঠল।

সায়ন বলল,

—“আপনাকে একটা জিনিস দেখাতে এসেছি।”

ব্যাগ থেকে সে একটি আধুনিক ঘড়ির যন্ত্র বের করল।

নির্মলবাবু অবাক।

—“এটা কী?”

—“আমি বানিয়েছি।”

—“তুই?”

—“হ্যাঁ।”

সায়ন বলল,

—“কলেজে পড়ার সময় একটা প্রকল্প করেছিলাম। পুরোনো যান্ত্রিক ঘড়ির নকশা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে আধুনিক একটি মেকানিজম তৈরি করেছি।”

নির্মলবাবু ধীরে ধীরে যন্ত্রটা হাতে নিলেন।

তার চোখে গর্ব।

—“আমি তোকে ঘড়ি সারাতে শিখিয়েছিলাম। তুই ঘড়ি বানাতে শিখে ফেলেছিস!”

সায়ন হাসল।

—“আপনি একটা কথা শিখিয়েছিলেন।”

—“কী?”

—“সময় থেমে গেলেও মানুষকে থেমে থাকতে নেই।”

নির্মলবাবু চুপ করে গেলেন।


কিন্তু সায়নের আসার আসল কারণ তখনও বলা হয়নি।

সে বলল,

—“কাকু, আপনার দোকানটা আমি বদলাতে চাই।”

নির্মলবাবু ভ্রু কুঁচকে বললেন,

—“কেন?”

—“দোকান থাকবে। কিন্তু এর সঙ্গে একটা ছোট প্রশিক্ষণকেন্দ্র হবে।”

—“কীসের?”

—“ঘড়ি, ছোট যন্ত্রপাতি আর ইলেকট্রনিক্স শেখানোর।”

নির্মলবাবু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

—“এখনকার ছেলেমেয়েরা এসব শিখবে?”

সায়ন বলল,

—“আমার মতো কেউ না কেউ আসবে।”


কয়েক মাস পর “সময়ের সাথী” দোকানের পাশের ঘরটি নতুন করে সাজানো হল।

দশটি টেবিল।

কিছু পুরোনো ঘড়ি।

ছোট যন্ত্রপাতি।

ইলেকট্রনিক সার্কিট।

দেয়ালে একটি লেখা—

“যন্ত্রকে বুঝতে শিখুন, সময়কে নয়—সময় নিজের পথেই চলবে।”

প্রথম ব্যাচে এল আটজন ছাত্রছাত্রী।

তার মধ্যে একজন ছিল দরিদ্র পরিবারের ছেলে।

আরেকজন স্কুল ছেড়ে দেওয়ার পথে ছিল।

আরেকজন শুধু মোবাইল নিয়ে খেলত।

সায়ন তাদের হাতে যন্ত্র তুলে দিল।

বলল,

—“কিছু ভাঙবে। ভাঙতে দাও। ভুল না করলে শেখা যায় না।”

দূরে বসে নির্মলবাবু হাসছিলেন।


এক সন্ধ্যায় সায়ন পুরোনো পকেট ঘড়িটা বের করল।

যেটা তার বাবা তাকে দিয়েছিলেন।

ঘড়িটা এখনও চলছে।

টিক… টিক… টিক…

নির্মলবাবু বললেন,

—“এটা এখনও রেখে দিয়েছিস?”

সায়ন বলল,

—“এটা আমার কাছে সময়ের চেয়েও বেশি কিছু।”

—“কী?”

সায়ন একটু ভেবে বলল,

—“আমাকে মনে করিয়ে দেয়, কিছু মানুষ চলে গেলেও তাদের দেওয়া সময় আমাদের সঙ্গে থেকে যায়।”

নির্মলবাবু জানালার বাইরে তাকালেন।

বৃষ্টি থেমেছে।

রাস্তার আলো জ্বলেছে।

দোকানের ভেতরে দেয়ালে ঝোলানো ঘড়িগুলো একসঙ্গে টিকটিক করছে।

তিনি ধীরে বললেন,

—“জীবনও একটা ঘড়ির মতো। সব কাঁটা একসঙ্গে চলে না। কেউ আগে পৌঁছয়, কেউ পরে। কিন্তু যার সময় এখনও চলছে, তার থেমে থাকার অধিকার নেই।”

সায়ন মাথা নাড়ল।

তারপর দোকানের দরজাটা খুলে দিল।

বাইরে সন্ধ্যার বাতাস ঢুকে পড়ল।

ভেতরে চলতে থাকল অসংখ্য ঘড়ির শব্দ—

টিক… টিক… টিক…

সময়ের মতোই।

নিরন্তর।

অবিরাম।

আর সেই শব্দের মধ্যে সায়ন বুঝতে পারল—

জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়টা ঘড়ির কাঁটার মধ্যে নয়; সেটা লুকিয়ে থাকে আমরা সেই সময়টাকে কীভাবে ব্যবহার করছি তার মধ্যে।

সমাপ্ত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *