গল্প : বীজের বাক্স।

নদিয়ার এক প্রত্যন্ত গ্রামের নাম ছিল শিউলিপাড়া।

গ্রামটি খুব সাধারণ।

ধানখেত, পুকুর, কাঁচা রাস্তা আর মাটির বাড়ি—এই নিয়েই মানুষের জীবন।

গ্রামের শেষ প্রান্তে ছিল একটি পুরোনো টিনের ঘর।

ঘরটির দরজায় তালা পড়ে থাকত প্রায় সারাবছর।

লোকজন বলত,

—“ওটা তো বহুদিনের পরিত্যক্ত ঘর।”

কিন্তু সেই ঘরটির দিকে প্রতিদিন তাকিয়ে থাকত অদিতি।

অদিতির বয়স পঁচিশ।

বিয়ের পর সে স্বামীর সঙ্গে এই গ্রামেই থাকত।

তার শ্বশুর ছিলেন কৃষক।

বাড়ির উঠোনে নানা ধরনের সবজি চাষ করতেন।

লাউ, কুমড়ো, ঝিঙে, বেগুন, পটল—সবই হত।

কিন্তু অদিতির সবচেয়ে বেশি আগ্রহ ছিল অন্য জায়গায়।

বীজ।


একদিন শ্বশুরমশাই পুরোনো একটি বাক্স খুললেন।

ভেতরে ছোট ছোট কাগজের প্যাকেট।

অদিতি জিজ্ঞেস করল,

—“এগুলো কী?”

তিনি বললেন,

—“বীজ।”

—“কীসের?”

—“পুরোনো জাতের ধান, লাউ, বেগুন, শিম… অনেক কিছু।”

অদিতি অবাক।

—“এগুলো এখনও আছে?”

শ্বশুর বললেন,

—“আমার বাবার সময়ের। এখন আর কেউ এসব রাখে না।”

অদিতি একটি ছোট প্যাকেট হাতে নিল।

তার মনে হল, এত ছোট একটা জিনিসের মধ্যে যেন একটা পুরো সময় লুকিয়ে আছে।


কয়েকদিন পর অদিতি জানতে পারল, গ্রামের অনেক বাড়িতেই এমন পুরোনো বীজ রয়েছে।

কেউ কাচের বোতলে রাখে।

কেউ কাপড়ে বেঁধে রাখে।

কেউ মাটির হাঁড়িতে।

কেউ আবার জানেই না, সেগুলো কীসের বীজ।

অদিতির মাথায় একটা চিন্তা এল।

সে গ্রামের কয়েকজন মহিলাকে নিয়ে কথা বলল।

বলল,

—“আমরা যদি সবাই নিজেদের বীজ জমিয়ে রাখি?”

একজন বললেন,

—“কেন?”

—“প্রয়োজনের সময় যেন অন্যের কাছ থেকে বীজ নিতে না হয়।”

আরেকজন হাসলেন,

—“বীজের আবার ব্যাংক হয় নাকি?”

অদিতি বলল,

—“ব্যাংক না হোক, বীজের ঘর তো হতে পারে।”


পরদিন অদিতি সেই পুরোনো টিনের ঘরটির সামনে গেল।

দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল।

ধুলো।

মাকড়সার জাল।

ভাঙা টেবিল।

কয়েকটি পুরোনো কাঠের তাক।

ঘরটা পরিষ্কার করতে করতে সে ভাবল—

এই ঘরটাই হবে বীজের ঘর।


কাজ শুরু হল।

অদিতি প্রথমে নিজের বাড়ির বীজ নিয়ে এল।

তারপর পাশের বাড়ির কাকিমা দিলেন পুরোনো লাল শিমের বীজ।

আরেকজন দিলেন দেশি লাউ।

এক বৃদ্ধ কৃষক দিলেন এক ধরনের ধানের বীজ।

তিনি বললেন,

—“এটা আমার বাবার কাছ থেকে পেয়েছিলাম।”

অদিতি সাবধানে প্যাকেটটি রাখল।

প্রতিটি বীজের নাম লিখল।

কোন ঋতুতে বোনা হয়।

কীভাবে সংরক্ষণ করতে হয়।

কতদিনের মধ্যে অঙ্কুর বেরোয়।

সব লিখে রাখল।


কিছুদিনের মধ্যেই তাকগুলো ভরে উঠল।

ঘরের দরজার ওপর অদিতি লিখল—

“বীজের বাক্স”

নিচে ছোট করে লিখল—

“নাও, বুনো, ফলাও, আবার ফিরিয়ে দাও।”


গ্রামের মানুষ প্রথমে বিষয়টি মজা হিসেবে নিল।

কেউ বলল,

—“দেখি কতদিন চলে।”

কিন্তু অদিতি থামল না।

সে নিয়ম করল—

যে কেউ বিনামূল্যে বীজ নিতে পারবে।

তবে ফসল হলে সেই গাছ থেকে কিছু ভালো বীজ আবার বীজের বাক্সে জমা দিতে হবে।

কোনও টাকা নেই।

কোনও লাভ নেই।

শুধু বিনিময়।


প্রথম বছর ফলন খুব ভালো হল না।

কিছু বীজ নষ্ট হয়ে গেল।

কিছু গাছ রোগে আক্রান্ত হল।

কিছু বীজ অঙ্কুরই দিল না।

অদিতির মন খারাপ হয়ে গেল।

সে ভাবল, হয়তো গ্রামের মানুষ ঠিকই বলেছিল।

কিন্তু শ্বশুর বললেন,

—“বীজকে সময় দিতে হয়।”

অদিতি বলল,

—“মানুষকেও?”

তিনি হেসে বললেন,

—“সবচেয়ে বেশি।”


পরের বছর অদিতি আবার শুরু করল।

এবার সে কৃষি বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে সংরক্ষণ পদ্ধতি শিখল।

বীজ শুকিয়ে রাখল।

আর্দ্রতা থেকে বাঁচানোর ব্যবস্থা করল।

প্যাকেটের ওপর তারিখ লিখল।

পুরোনো বীজের পাশাপাশি নতুন বীজও সংগ্রহ করতে লাগল।

গ্রামের স্কুলের কয়েকজন ছাত্র-ছাত্রীকে নিয়ে সে ছোট্ট বাগান তৈরি করল।

শিশুরা সেখানে বীজ বুনত।

গাছের বৃদ্ধি মাপত।

খাতায় লিখত।


একদিন স্কুলের এক ছাত্র অদিতিকে বলল,

—“দিদি, একটা বীজ এত ছোট। কিন্তু এর মধ্যে এত বড় গাছ কীভাবে থাকে?”

অদিতি বলল,

—“গাছটা পুরোপুরি থাকে না। সম্ভাবনাটা থাকে।”

ছেলেটি বলল,

—“মানে?”

অদিতি মাটিতে একটি বীজ রেখে বলল,

—“এটা এখন কিছুই মনে হচ্ছে না। কিন্তু ঠিক জায়গা, জল আর যত্ন পেলে এটা বদলে যাবে।”

ছেলেটি বীজটির দিকে তাকিয়ে রইল।

অদিতি মনে মনে ভাবল—

মানুষের স্বপ্নও বোধহয় এমনই।


তৃতীয় বছর এল খরা।

বৃষ্টি কম হল।

অনেক কৃষকের ফসল নষ্ট হয়ে গেল।

বাজারে সবজির দাম বেড়ে গেল।

কিন্তু শিউলিপাড়ার কয়েকটি পরিবার তাদের পুরোনো খরা-সহনশীল দেশি বীজ ব্যবহার করে কিছুটা ফসল তুলতে পারল।

তারা সেই বীজ অন্যদেরও দিল।

বীজের বাক্স তখন সত্যিকারের কাজে লাগল।


একদিন গ্রামের বৃদ্ধ কৃষক হরনাথ অদিতির কাছে এসে বললেন,

—“মা, আমার বাবার বীজটা মনে আছে?”

—“হ্যাঁ।”

—“এবার সেটা দিয়ে ধান করেছি।”

অদিতি হাসল।

—“ফসল কেমন হয়েছে?”

বৃদ্ধের চোখ চকচক করে উঠল।

—“খারাপ না। আর একটা কথা বলব?”

—“বলুন।”

—“আমার বাবা মারা যাওয়ার আগে বলেছিলেন, ‘বীজ কাউকে আটকে রাখিস না।’ তখন বুঝিনি।”

অদিতি চুপ করে রইল।

বৃদ্ধ বললেন,

—“এখন বুঝছি।”


বছর পাঁচেক পর শিউলিপাড়ার বীজের বাক্সের কথা আশেপাশের গ্রামেও ছড়িয়ে পড়ল।

পাশের গ্রামের মানুষ বীজ নিতে আসত।

তারাও নিজেদের বীজ জমা দিত।

অদিতি এবার একটি বড় খাতা খুলল।

নাম দিল—

“বীজের ইতিহাস”।

কোন বীজ কার কাছ থেকে এসেছে।

কত বছর ধরে আছে।

কোথায় ফলেছে।

কীভাবে সংরক্ষণ করা হয়।

সব লেখা হতে লাগল।


একদিন অদিতির ছোট মেয়ে তাকে জিজ্ঞেস করল,

—“মা, তুমি বীজ জমাও কেন?”

অদিতি তাকে একটি বীজ হাতে দিয়ে বলল,

—“কারণ ভবিষ্যৎ সবসময় বড় জিনিস দিয়ে তৈরি হয় না।”

মেয়েটি বলল,

—“তাহলে?”

অদিতি বলল,

—“কখনও কখনও একটা ছোট্ট বীজ দিয়েই।”


অনেক বছর পরে সেই টিনের ঘর আর টিনের ঘর রইল না।

দেওয়াল পাকা হল।

তাক বেড়ে গেল।

বীজের সংখ্যা বাড়ল।

শুধু শিউলিপাড়া নয়, আশেপাশের বহু গ্রামের কৃষকেরাও সেখানে বীজ জমা দিতে লাগলেন।

ঘরের সামনে একটি ছোট বাগান তৈরি হল।

সেখানে একটি ফলক বসানো হল—

“বীজের বাক্স—কারও সম্পত্তি নয়, সবার ভবিষ্যৎ।”

উদ্বোধনের দিন অদিতিকে সবাই সামনে দাঁড় করাল।

সে কিছু বলতে চাইছিল না।

শেষ পর্যন্ত বলল,

—“আমি কিছুই তৈরি করিনি। আমি শুধু মানুষের কাছে থাকা জিনিসগুলোকে এক জায়গায় এনেছি।”

একজন কৃষক বললেন,

—“না মা। তুমি আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছ—যা ছোট, তা অমূল্য নয়।”


সন্ধ্যায় সবাই চলে গেলে অদিতি একা বীজের ঘরে ঢুকল।

একটি তাক থেকে পুরোনো প্যাকেট বের করল।

সেটাই ছিল তার শ্বশুরের বাবার রেখে যাওয়া প্রথম বীজ।

প্যাকেটটি হাতে নিয়ে অদিতি মৃদু হাসল।

তারপর পাশে রাখা নতুন প্যাকেটের দিকে তাকাল।

পুরোনো বীজ।

নতুন বীজ।

পুরোনো মানুষের স্মৃতি।

নতুন প্রজন্মের স্বপ্ন।

সব একসঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে।

বাইরে তখন বৃষ্টির শব্দ।

মাটির গন্ধ চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে।

অদিতি দরজা বন্ধ করার আগে শেষবারের মতো ঘরের দিকে তাকাল।

হাজার হাজার বীজ নিঃশব্দে অপেক্ষা করছে।

তাদের মধ্যে কেউ আগামীকাল মাটিতে যাবে।

কেউ এক বছর পর।

কেউ হয়তো দশ বছর পর।

কিন্তু তারা অপেক্ষা করবে।

কারণ বীজের কাজ শুধু আজকের ফসল দেওয়া নয়—

আগামী দিনের সম্ভাবনাকে বাঁচিয়ে রাখা।

সমাপ্ত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *