শেষ শো-এর আলো।

গ্রামের নাম মাধবপুর।

একসময় এই গ্রামের সবচেয়ে ব্যস্ত জায়গা ছিল বাজার নয়, বাসস্ট্যান্ডও নয়—ছিল একটি ছোট্ট সিনেমা হল।

নাম প্রভাত টকিজ।

সিনেমা হলটি খুব বড় ছিল না। টিনের ছাউনি, সামনে ছোট্ট টিকিট কাউন্টার, কাঠের বেঞ্চ আর দেওয়ালে হাতে আঁকা সিনেমার পোস্টার।

কিন্তু গ্রামের মানুষের কাছে প্রভাত টকিজ ছিল শুধু সিনেমা দেখার জায়গা নয়।

কারও প্রথম সিনেমা দেখা হয়েছিল এখানে।

কেউ বিয়ের আগে শেষবার বন্ধুদের সঙ্গে এখানে এসেছিল।

কেউ আবার পরীক্ষায় ভালো ফল করার পর বাবার সঙ্গে সিনেমা দেখতে এসেছিল।

কিন্তু সময় বদলাল।

গ্রামে মোবাইল এল।

ইন্টারনেট এল।

স্মার্টফোনে সিনেমা দেখা শুরু হল।

প্রভাত টকিজে দর্শক কমতে কমতে একসময় প্রায় শূন্য হয়ে গেল।

অবশেষে মালিক ঘোষণা করলেন—

“এই মাসের শেষে হল বন্ধ হয়ে যাবে।”


খবরটা শুনে সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেল অর্ক।

বয়স উনিশ।

সে ছোটবেলা থেকেই প্রভাত টকিজে সিনেমা দেখত।

তার বাবা ছিলেন হলের পুরোনো কর্মচারী।

প্রজেক্টর চালাতেন।

অর্কের বাবা বিমল বলতেন,

—“সিনেমা শুধু গল্প দেখায় না। মানুষকে অন্য মানুষের জীবন বুঝতে শেখায়।”

অর্ক ছোটবেলায় বাবার কথা বুঝত না।

এখন বুঝত।


শেষ সপ্তাহে হলের সামনে বড় করে লেখা হল—

“শেষ প্রদর্শনী—শনিবার রাত।”

অর্ক পোস্টারটা দেখে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।

তার মাথায় একটা প্রশ্ন ঘুরতে লাগল—

একটা জায়গা কি সত্যিই শুধু দর্শক না থাকায় শেষ হয়ে যায়?


অর্ক বন্ধুদের ডাকল।

রাহুল, সায়ন, মিতা, ঝিলিক—সবাই এল।

অর্ক বলল,

—“শেষ শোটা আমরা বড় করে করব।”

রাহুল হেসে বলল,

—“লোক আসবে?”

—“জানি না।”

—“টাকা?”

—“কম।”

—“তাহলে?”

অর্ক বলল,

—“চেষ্টা।”


তারা গ্রামের বাড়ি বাড়ি গেল।

বলল,

—“শনিবার শেষ শো। সবাই আসুন।”

এক বৃদ্ধ বললেন,

—“আমার হাঁটতে কষ্ট হয় বাবা।”

অর্ক বলল,

—“আমি আপনাকে নিয়ে আসব।”

এক মহিলা বললেন,

—“বাচ্চাদের নিয়ে আসতে পারব?”

—“অবশ্যই।”

এক দোকানদার বললেন,

—“এখন তো সবাই মোবাইলে সিনেমা দেখে।”

অর্ক বলল,

—“মোবাইলে সিনেমা দেখা যায়। কিন্তু একসঙ্গে সবাই বসে স্মৃতি তৈরি করা যায়?”

দোকানদার কিছু বললেন না।


অর্করা সিদ্ধান্ত নিল, শেষ শোতে শুধু সিনেমা দেখানো হবে না।

প্রথমে গ্রামের প্রবীণ মানুষদের কথা রেকর্ড করা হবে।

তারা বলবেন—প্রভাত টকিজের সঙ্গে তাদের স্মৃতি।

কেউ বলবেন প্রথম প্রেমের কথা।

কেউ বলবেন প্রথম চাকরির পর সিনেমা দেখার কথা।

কেউ বলবেন স্বামীর সঙ্গে প্রথম সিনেমা দেখার কথা।

কেউ আবার বলবেন বাবার হাত ধরে হলে ঢোকার কথা।


শনিবার সকাল থেকেই প্রস্তুতি শুরু হল।

হলের পুরোনো বেঞ্চ পরিষ্কার করা হল।

দেয়ালের ধুলো ঝাড়া হল।

ভাঙা পোস্টার সরিয়ে নতুন কাগজে লেখা হল—

“আজ শুধু শেষ শো নয়—স্মৃতির রাত।”

বিমল প্রজেক্টরটি খুলে পরিষ্কার করলেন।

অর্ক জিজ্ঞেস করল,

—“বাবা, এটা এখনও চলবে?”

বিমল বললেন,

—“যন্ত্র পুরোনো হয়েছে। ইচ্ছেটা নয়।”


সন্ধ্যা নামতেই মানুষ আসতে শুরু করল।

প্রথমে দশজন।

তারপর পঞ্চাশজন।

তারপর আরও।

হলের সামনে লাইন পড়ে গেল।

যে হল কয়েক মাস ধরে খালি পড়ে ছিল, সেদিন তার বাইরে মানুষের ভিড়।

মালিক অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

তিনি অর্ককে বললেন,

—“তুমি কী করেছ?”

অর্ক বলল,

—“কিছু না। মানুষকে শুধু মনে করিয়ে দিয়েছি, এই জায়গাটা একদিন তাদের ছিল।”


সিনেমা শুরু হওয়ার আগে বড় পর্দায় একটি ভিডিও দেখানো হল।

সাদা-কালো পুরোনো ছবি।

প্রভাত টকিজের পুরোনো পোস্টার।

প্রথম দিনের ছবি।

তারপর গ্রামের মানুষদের স্মৃতি।

এক বৃদ্ধ পর্দায় বললেন,

—“আমি প্রথম সিনেমা দেখতে এসেছিলাম ১৯৭৮ সালে।”

হলের মধ্যে হাততালি পড়ল।

আরেকজন বললেন,

—“আমার স্ত্রীকে নিয়ে প্রথম যে সিনেমাটা দেখেছিলাম, সেটা এখানেই।”

পাশে বসে থাকা তাঁর স্ত্রী চোখ মুছলেন।

একজন বৃদ্ধা বললেন,

—“আমার ছেলে শহরে চলে গেছে। কিন্তু ওর ছোটবেলার হাসিটা এখনও এই হলের মধ্যে শুনতে পাই।”

হলের মধ্যে নীরবতা নেমে এল।


তারপর সিনেমা শুরু হল।

প্রজেক্টরের আলো অন্ধকার হলের পেছন থেকে পর্দায় পড়ল।

বিমল প্রজেক্টরের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

অর্ক বারবার বাবার দিকে তাকাচ্ছিল।

বিমলের চোখে জল।

অর্ক বলল,

—“বাবা?”

বিমল মৃদু হেসে বললেন,

—“কিছু আলো বন্ধ হতে নেই।”


সিনেমা শেষ হল রাত সাড়ে দশটায়।

মানুষ বেরোতে চাইছিল না।

কেউ ছবি তুলছে।

কেউ পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলছে।

কেউ হলের দেওয়ালে হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছে।

তখন হলের মালিক মঞ্চে উঠলেন।

তিনি বললেন,

—“আমি ঠিক করেছিলাম আজকের পর হল বন্ধ করে দেব।”

সবাই চুপ।

তিনি বললেন,

—“কিন্তু আজ বুঝলাম, প্রভাত টকিজ শুধু আমার সম্পত্তি নয়। এটা এই গ্রামের স্মৃতি।”

একটু থেমে বললেন,

—“হল বন্ধ করছি না।”

চারদিক থেকে হাততালি উঠল।


কিন্তু প্রশ্ন ছিল—

হল চলবে কীভাবে?

অর্ক বলল,

—“শুধু সিনেমা দেখিয়ে নয়।”

তার পরিকল্পনা ছিল নতুন।

সপ্তাহে দুদিন সিনেমা।

একদিন শিশুদের জন্য শিক্ষামূলক চলচ্চিত্র।

মাসে একদিন পুরোনো সিনেমার বিশেষ প্রদর্শনী।

স্থানীয় শিল্পীদের অনুষ্ঠান।

গ্রামের ছাত্রদের বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি নিয়ে অনুষ্ঠান।

পুরোনো সিনেমার পোস্টার সংরক্ষণ।

এমনকি স্থানীয় ইতিহাস নিয়ে ছোট প্রদর্শনী।

হলটি ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করল।

নামও বদলাল না।

প্রভাত টকিজই রইল।

কারণ অর্ক বলেছিল,

—“পুরোনো নামের মধ্যেও ইতিহাস থাকে।”


এক বছর পর প্রভাত টকিজ আর শুধু সিনেমা হল নয়।

এটি হয়ে উঠেছে গ্রামের সাংস্কৃতিক কেন্দ্র।

শিশুরা সেখানে সিনেমা দেখে।

বৃদ্ধরা পুরোনো দিনের কথা বলেন।

তরুণরা নাটক করে।

স্থানীয় শিল্পীরা গান গায়।

দেয়ালে ঝুলছে পুরোনো পোস্টার।

আর একটি কাঁচের বাক্সে রাখা আছে সেই পুরোনো প্রজেক্টর।

নিচে লেখা—

“এই যন্ত্র একদিন আমাদের গল্প দেখিয়েছিল।”


একদিন অর্ক বাবাকে জিজ্ঞেস করল,

—“বাবা, তুমি জানো সেদিন হলটা কেন বাঁচল?”

বিমল বললেন,

—“কারণ মানুষ বুঝেছিল, তারা শুধু সিনেমা দেখতে আসত না।”

—“তাহলে?”

—“তারা নিজেদের দেখতে আসত।”

অর্ক চুপ করে রইল।

বিমল বললেন,

—“মানুষ গল্প ভুলে যায় না। শুধু কখনও কখনও তাকে গল্পটার কথা মনে করিয়ে দিতে হয়।”


অনেক বছর পর অর্ক শহরে চাকরি পেল।

যাওয়ার আগে সে প্রভাত টকিজে শেষবারের মতো ঢুকল।

প্রজেক্টরের আলো তখনও জ্বলছে।

হলের ভেতরে কয়েকজন শিশু বসে সিনেমা দেখছে।

পর্দায় আলো।

অন্ধকার ঘরে শিশুদের মুখ উজ্জ্বল।

অর্ক দরজায় দাঁড়িয়ে হাসল।

তার মনে হল—

একদিন যে জায়গাকে সবাই মৃত ভেবেছিল, সেখানে আবার আলো জ্বলছে।

হয়তো সিনেমার আলো।

হয়তো স্মৃতির আলো।

হয়তো মানুষের একসঙ্গে থাকার আলো।

অর্ক বেরিয়ে আসার সময় দরজার ওপর চোখ পড়ল।

পুরোনো কাঠের ফলকে লেখা—

“প্রভাত টকিজ।”

তার নিচে নতুন একটি লাইন—

“গল্প শেষ হয় না, শুধু পর্দা বদলায়।”

অর্ক শেষবারের মতো পেছনে তাকাল।

ভেতর থেকে ভেসে আসছে শিশুদের হাসি।

আর প্রজেক্টরের আলো অন্ধকার ভেদ করে পর্দায় একের পর এক নতুন গল্প আঁকছে।

সমাপ্ত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *