
ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ফোটেনি।
স্টেশনের সামনে নিজের রিকশাটা নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল রহিম।
প্রতিদিনের মতো আজও তার লক্ষ্য ছিল—দিন শেষে অন্তত পাঁচশো টাকা নিয়ে বাড়ি ফেরা।
সংসারে স্ত্রী, এক ছেলে আর বৃদ্ধ মা।
ছেলেটা এবার মাধ্যমিকে উঠেছে।
রহিমের একটা স্বপ্ন আছে—ছেলেটাকে সে পড়াশোনা করাবে।
নিজে বেশি পড়তে পারেনি।
তাই ছেলের বইয়ের পাতায় সে নিজের স্বপ্ন খুঁজে পায়।
সকাল আটটার দিকে একজন ভদ্রলোক স্টেশন থেকে রিকশায় উঠলেন।
হাতে অফিসের ব্যাগ, চোখে চশমা।
তিনি তাড়াহুড়ো করে বললেন,
“দাদা, একটু তাড়াতাড়ি যাবেন? ট্রেন ধরতে হবে।”
রহিম যতটা সম্ভব দ্রুত রিকশা চালাল।
গন্তব্যে পৌঁছে ভদ্রলোক ভাড়া দিয়ে চলে গেলেন।
রহিমও পরের যাত্রীর অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে রইল।
প্রায় আধঘণ্টা পর রিকশার সিটের নিচে কিছু একটা ঠেকে গেল।
সে নিচে হাত ঢুকিয়ে বের করল একটি কালো ব্যাগ।
ব্যাগটা বেশ ভারী।
রহিম চারদিকে তাকাল।
কেউ নেই।
ব্যাগ খুলতেই সে স্তব্ধ হয়ে গেল।
ভেতরে বান্ডিল বান্ডিল টাকা।
সঙ্গে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাগজ।
রহিম জীবনে এত টাকা একসঙ্গে কখনও দেখেনি।
তার মাথায় প্রথমেই ছেলের কথা এল।
স্কুলের বেতন বাকি।
বই কিনতে হবে।
মায়ের ওষুধ শেষ হয়ে এসেছে।
ঘরের চালও প্রায় ফুরিয়ে গেছে।
এই টাকা দিয়ে সব সমস্যাই যেন এক মুহূর্তে মিটে যেতে পারে।
সে ব্যাগটা বন্ধ করল।
কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল।
তারপর নিজেকেই বলল,
“না। এটা আমার টাকা নয়।”
কিন্তু কোথায় ফিরিয়ে দেবে?
ভদ্রলোকের নামও জানে না।
ঠিক তখন ব্যাগের ভেতর থেকে একটা কাগজ পেল।
একটি হাসপাতালের রিপোর্ট।
রোগীর নাম—
সুবর্ণা দত্ত।
আর একটি মোবাইল নম্বর।
রহিম সঙ্গে সঙ্গে ফোন করল।
ওপাশ থেকে উদ্বিগ্ন গলা—
“হ্যালো?”
রহিম বলল,
“আপনার একটা ব্যাগ আমার রিকশায় পড়ে গেছে।”
কিছুক্ষণ কোনও উত্তর নেই।
তারপর লোকটি বলল,
“আপনি কোথায়?”
“স্টেশনের সামনে।”
“দাদা, আপনি ব্যাগটা খুলেছেন?”
রহিম সত্যি কথাই বলল,
“হ্যাঁ। ভেতরে টাকা দেখেছি।”
ওপাশ থেকে কান্নার শব্দ শোনা গেল।
“দাদা, ওটা আমার মেয়ের চিকিৎসার টাকা। আজই অপারেশন। টাকা না পেলে…”
লোকটির গলা আটকে গেল।
রহিম বলল,
“আপনি আসুন।”
প্রায় চল্লিশ মিনিট পর ভদ্রলোক ছুটে এলেন।
হাতে কোনও ছাতা নেই।
চোখ লাল।
তিনি রহিমের সামনে এসে দাঁড়িয়ে বললেন,
“আমার মেয়েকে বাঁচানোর টাকা ছিল ওখানে।”
রহিম ব্যাগটা এগিয়ে দিল।
ভদ্রলোক ব্যাগ খুলে সব টাকা দেখে যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন।
তিনি রহিমের হাত ধরে বললেন,
“আপনি না থাকলে আজ আমার মেয়েকে বাঁচাতে পারতাম না।”
রহিম বলল,
“আমি শুধু আপনার জিনিসটা ফিরিয়ে দিয়েছি।”
ভদ্রলোক পকেট থেকে পাঁচ হাজার টাকা বের করে বললেন,
“এটা রাখুন।”
রহিম মাথা নাড়ল।
“না।”
“কেন?”
“আপনার মেয়ের চিকিৎসায় লাগবে।”
ভদ্রলোক কিছু বলতে পারলেন না।
রহিম রিকশায় উঠে চলে গেল।
সেদিন রাতে বাড়ি ফিরে রহিম ছেলের বইয়ের সামনে বসে ছিল।
ছেলে জিজ্ঞেস করল,
“বাবা, আজ এত চুপচাপ কেন?”
রহিম সব ঘটনা বলল।
ছেলে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
“বাবা, তুমি টাকা নিয়ে নিলে আমাদের অনেক সুবিধা হতো।”
রহিম মাথা নাড়ল।
“হতো।”
“তবুও নিলে না?”
রহিম ছেলের মাথায় হাত রেখে বলল,
“আমাদের বাড়িতে হয়তো আজও অভাব আছে। কিন্তু আমি চাই না, তুই কোনওদিন বলিস—তোর বাবা অন্যের বিপদের টাকা নিয়ে নিজের সংসার চালিয়েছিল।”
ছেলে বাবার দিকে তাকিয়ে রইল।
পরদিন সকালে রহিম রিকশা নিয়ে বেরোতেই দেখল, তার বাড়ির সামনে একটি গাড়ি দাঁড়িয়ে।
সেই ভদ্রলোক নেমে এলেন।
সঙ্গে একজন মহিলা।
মহিলার হাতে একটি ছোট বাক্স।
তিনি বললেন,
“আমার মেয়ের অপারেশন সফল হয়েছে।”
রহিম হাসল।
“আলহামদুলিল্লাহ।”
ভদ্রলোক বললেন,
“আমরা আপনার জন্য কিছু এনেছি।”
বাক্স খুলে দেখা গেল একটি নতুন স্কুলব্যাগ।
সঙ্গে কয়েকটি বই।
আর একটি খাম।
রহিম খাম খুলে দেখল—তার ছেলের নামে একটি শিক্ষাবৃত্তির কাগজ।
ভদ্রলোক বললেন,
“আপনার ছেলে যতদিন পড়তে চায়, আমরা ওর পড়াশোনার খরচে সাহায্য করব।”
রহিম কিছু বলতে পারল না।
শুধু চোখ মুছে বলল,
“আমি তো কিছু চাইনি।”
ভদ্রলোক হেসে বললেন,
“আপনি চাননি বলেই তো দিতে ইচ্ছে করছে।”
সেদিন রহিম রিকশা নিয়ে যখন বেরোল, তার ছেলে দরজায় দাঁড়িয়ে ছিল।
ছেলে বলল,
“বাবা!”
রহিম ফিরে তাকাল।
“আজ রিকশার সিটের নিচে আবার কিছু পেলে?”
রহিম হেসে বলল,
“পেলে কী করব?”
ছেলে বলল,
“যার, তাকে দিয়ে দেব।”
রহিম বলল,
“তাহলেই তো আমার ছেলে বড় হয়েছে।”
রিকশাটা ধীরে ধীরে রাস্তা দিয়ে এগিয়ে গেল।
সকালের রোদ তখন চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে।
রহিমের পকেটে টাকা খুব বেশি ছিল না।
কিন্তু বুকের ভেতর একটা জিনিস ছিল—
নিজের সততার ওপর অটুট বিশ্বাস।
আর কখনও কখনও মানুষের জীবনে সেটাই সবচেয়ে বড় সম্পদ।
সমাপ্ত।












Leave a Reply