শেষ মাটির কলস।

নদীর ধারে ছোট্ট একটি গ্রাম—শিউলিপাড়া। গ্রামের শেষ প্রান্তে ছিল একটি পুরোনো কুমোরপাড়া। একসময় সেখানে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মাটির হাঁড়ি, কলসি, প্রদীপ আর পুতুল তৈরির শব্দ শোনা যেত। এখন সেই শব্দ অনেকটাই কমে গেছে।

প্লাস্টিকের বোতল, অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি আর নানা রকম আধুনিক জিনিসের ভিড়ে মাটির জিনিসের চাহিদা কমেছে।

সেই কুমোরপাড়ায় থাকতেন হরনাথ পাল।

বয়স প্রায় সত্তর। সারাজীবন মাটির সঙ্গে কাটিয়েছেন তিনি।

তাঁর হাতের তৈরি কলসি একসময় আশপাশের দশটা গ্রামের মানুষ কিনে নিয়ে যেত।

কিন্তু এখন?

দিনের পর দিন চাকা ঘুরলেও বিক্রি হয় না।

হরনাথের ছেলে অনুপ অন্য শহরে কাজ করে। সে বাবাকে বহুবার বলেছে,

—“বাবা, আর কতদিন এই মাটি নিয়ে বসে থাকবে? দোকানটা বন্ধ করে আমার কাছে চলে এসো।”

হরনাথ প্রতিবারই হেসে বলতেন,

—“মাটি ছেড়ে আমি কোথায় যাব রে?”

অনুপ বিরক্ত হয়ে বলত,

—“মাটি কি তোমাকে খাওয়াবে?”

হরনাথ কোনো উত্তর দিতেন না।

একদিন সকালে তিনি চাকার সামনে বসে একটি কলসি বানাচ্ছিলেন। পাশে বসেছিল তাঁর বারো বছরের নাতনি মেঘলা।

মেঘলা খুব মন দিয়ে দাদুর হাতের কাজ দেখছিল।

সে জিজ্ঞেস করল,

—“দাদু, মাটি দিয়ে এত সুন্দর জিনিস কীভাবে বানাও?”

হরনাথ হাসলেন।

—“মাটি নিজেই সুন্দর। আমরা শুধু তার ভেতরের সৌন্দর্যটা বের করে আনি।”

মেঘলা বলল,

—“আমাকেও শেখাবে?”

—“শেখাব।”

সেদিন থেকেই মেঘলার হাতে মাটি উঠল।

প্রথম দিন তার তৈরি পাত্রটা চাকার ওপর দাঁড়াতেই চাইল না।

দ্বিতীয় দিনেও ভেঙে গেল।

তৃতীয় দিনেও একই অবস্থা।

মেঘলা রাগ করে বলল,

—“আমি পারব না।”

হরনাথ বললেন,

—“মাটি কখনও প্রথম চেষ্টায় কথা শোনে না।”

—“তাহলে?”

—“বারবার হাত দিতে হয়।”

মেঘলা আবার চেষ্টা করল।

দিন যেতে লাগল।

ধীরে ধীরে তার হাত মাটির সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে শিখল।

একদিন সে একটি ছোট্ট কলসি বানিয়ে দাদুর সামনে রাখল।

হরনাথ অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন,

—“এটা তুই বানিয়েছিস?”

মেঘলা গর্ব করে মাথা নাড়ল।

—“হ্যাঁ।”

—“তাহলে আজ থেকে তুই শুধু আমার নাতনি নয়, আমার সহকারীও।”

মেঘলা হেসে উঠল।

কিন্তু ঠিক সেই সময়েই একটি সমস্যা দেখা দিল।

গ্রামের পঞ্চায়েত থেকে ঘোষণা হল, পুরোনো কুমোরপাড়ার জায়গায় নতুন বাজার তৈরি হবে। কয়েকটি পরিবারকে অন্যত্র সরে যেতে হবে।

হরনাথের বাড়িও সেই তালিকায়।

অনুপ খবর শুনে শহর থেকে ফিরে এল।

সে বলল,

—“এই তো ভালোই হয়েছে। এবার জায়গাটা ছেড়ে দাও। আমার সঙ্গে শহরে চলে চলো।”

হরনাথ চুপ করে রইলেন।

মেঘলা বলল,

—“বাবা, দাদুর চাকা যাবে কোথায়?”

অনুপ বলল,

—“চাকা দিয়ে কী হবে? এখন আর কেউ মাটির জিনিস কেনে না।”

মেঘলা প্রতিবাদ করল,

—“কিন্তু আমি কিনব!”

অনুপ হেসে বলল,

—“তুই একা কিনলে তো সংসার চলবে না।”

মেঘলা আর কিছু বলল না।

সেদিন রাতে সে দাদুর ঘরে বসে অনেকক্ষণ চিন্তা করল।

পরদিন স্কুলে গিয়ে সে শিক্ষিকা সুদেষ্ণা ম্যাডামকে সব বলল।

ম্যাডাম মন দিয়ে শুনে বললেন,

—“মেঘলা, তোমাদের গ্রামের মাটির কাজ শুধু একটা পেশা নয়। এটা তোমাদের এলাকার ঐতিহ্য।”

—“কিন্তু মানুষ তো আর কিনতে চায় না।”

—“মানুষকে নতুন করে দেখাতে হয়।”

মেঘলা বুঝতে পারল না।

ম্যাডাম বললেন,

—“তুমি কি ছবি তুলতে পারো?”

—“হ্যাঁ।”

—“তাহলে তোমার দাদুর কাজের ছবি তোলো। ভিডিও করো। মানুষকে দেখাও কীভাবে মাটি থেকে একটা কলসি তৈরি হয়।”

মেঘলা সেই কাজ শুরু করল।

সে দাদুর মাটির চাকা ঘোরানোর ভিডিও করল।

মাটি মাখার ভিডিও করল।

কলসি বানানোর ভিডিও করল।

তারপর স্কুলের বন্ধুদের সাহায্যে একটি ছোট্ট প্রদর্শনীর আয়োজন করল।

নাম দিল—

“মাটির গল্প”।

প্রথম দিন খুব বেশি মানুষ এল না।

কিন্তু যারা এল, তারা অবাক হয়ে গেল।

একজন শহর থেকে আসা মহিলা একটি মাটির প্রদীপ হাতে নিয়ে বললেন,

—“এত সুন্দর! এগুলো কোথায় পাওয়া যায়?”

মেঘলা দাদুর দিকে তাকিয়ে বলল,

—“এখানেই।”

মহিলাটি কয়েকটি প্রদীপ কিনে নিলেন।

তারপর আরও কয়েকজন এলেন।

কেউ কলসি কিনলেন।

কেউ মাটির কাপ।

কেউ ছোট্ট পুতুল।

হরনাথের চোখে জল চলে এল।

সন্ধ্যায় তিনি মেঘলাকে বললেন,

—“আজ অনেকদিন পর মনে হলো, আমার চাকা আবার কথা বলছে।”

মেঘলা বলল,

—“দাদু, আমরা যদি আরও মানুষকে দেখাই?”

—“কী দেখাবি?”

—“মাটির গল্প।”

তারপর মেঘলা গ্রামের আরও কয়েকজন কুমোর পরিবারের সঙ্গে কথা বলল।

সবাই মিলে একটি ছোট্ট দল তৈরি করল।

তারা ঠিক করল, সপ্তাহে একদিন গ্রামের মাঠে মাটির জিনিসের হাট বসবে।

শুধু জিনিস বিক্রি নয়—সেখানে মানুষ চাইলে নিজের হাতে মাটির পাত্রও বানাতে পারবে।

প্রথম সপ্তাহে পঞ্চাশজন মানুষ এল।

দ্বিতীয় সপ্তাহে একশো।

তারপর আশপাশের গ্রাম থেকেও মানুষ আসতে শুরু করল।

অনুপ দূর থেকে সবকিছু দেখছিল।

এক সন্ধ্যায় সে বাবার কাছে এসে চুপ করে বসে রইল।

হরনাথ জিজ্ঞেস করলেন,

—“কী বলবি?”

অনুপ ধীরে বলল,

—“বাবা, আমি ভুল বুঝেছিলাম।”

হরনাথ হেসে বললেন,

—“কোন ব্যাপারে?”

—“ভাবতাম, মাটির কাজ শেষ হয়ে গেছে।”

হরনাথ বললেন,

—“কোনও কাজ শেষ হয় না। মানুষ যদি নতুন করে তাকে দেখতে শেখে, সে আবার বাঁচতে পারে।”

অনুপ বাবার হাত ধরে বলল,

—“আমিও থাকব তোমার সঙ্গে।”

সেদিন রাতে মেঘলা দাদুর চাকার পাশে বসেছিল।

চাকা ঘুরছিল।

মাটির দলা ধীরে ধীরে কলসির আকার নিচ্ছিল।

হরনাথ বললেন,

—“জানিস মেঘলা, এই কলসিটা কী?”

মেঘলা বলল,

—“কলসি।”

দাদু মাথা নাড়লেন।

—“না। এটা একটা গল্প।”

—“কী গল্প?”

—“যে গল্পে মাটি মানুষকে মনে করিয়ে দেয়—শিকড় ভুলে গেলে কোনও ভবিষ্যৎ সম্পূর্ণ হয় না।”

মেঘলা চুপ করে শুনল।

কয়েকদিন পর পুরোনো কুমোরপাড়ার জায়গায় বাজার তৈরি হলেও কুমোরদের জন্য আলাদা একটি অংশ রাখা হল। সেখানে একটি বড় সাইনবোর্ড লাগানো হলো—

“শিউলিপাড়ার মাটির হাট”।

সাইনবোর্ডের নিচে ছোট করে লেখা ছিল—

“মাটি থেকে তৈরি, মানুষের হাতে গড়া।”

হরনাথ সেই বোর্ডের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে মেঘলা বলল,

—“দাদু, এবার আর তোমার চাকা থামবে না।”

হরনাথ মৃদু হেসে বললেন,

—“চাকা তখনই থামে, যখন মানুষ আশা করা বন্ধ করে।”

আর সেই দিন থেকে শিউলিপাড়ায় মাটির চাকা শুধু ঘুরতে থাকেনি—একটি পুরোনো ঐতিহ্যও নতুন জীবনের পথে হাঁটতে শুরু করেছিল।

সমাপ্ত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *